kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

অর্ধেক মৃত্যুই চার মাসে

দেশে করোনায় মৃত্যু ২০ হাজার ছাড়াল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




অর্ধেক মৃত্যুই চার মাসে

সরকারি হিসাবে গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গত বছর ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর পর ১৬ মাস ১০ দিনের মাথায় এসে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১৬-তে।

এ পর্যন্ত মোট মৃত্যুর মধ্যে প্রথম এক বছরে (চলতি বছরের ১৮ মার্চ পর্যন্ত) মারা গেছে আট হাজার ৬২৪ জন। পরের চার মাস ১০ দিনে মারা গেছে ১১ হাজার ৩৯২ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫৬.৯ শতাংশ।

গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ২৩৭ জন। এ সময় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে রেকর্ড ১৬ হাজার ২৩০ জন, দৈনিক শনাক্তের হিসাবে যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। আর সুস্থ হয়েছে ১৩ হাজার ৪৭০ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে গত এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত যত করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে তার ৯০ শতাংশেরই বেশি ডেল্টা ভেরিয়েন্টের কারণে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় শুরু থেকে উপযুক্তভাবে সংক্রমণ ঠেকাতে না পারায় তা পর্যায়ক্রমে দেশের সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে মানুষের মধ্যে অসতর্ক থাকার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া, বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে দেরি করা, গ্রামাঞ্চলে পরীক্ষায় অনীহা ও সময়মতো হাসপাতালে না আসায় মৃত্যু দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, প্রতিদিনই শনাক্তকৃত রোগীর বাইরে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুও বাড়ছে। সব মিলিয়ে দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে আরো বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট মৃতদের মধ্যে পুরুষ ১৩ হাজার ৬২৬ জন (৬৮%) ও নারী ছয় হাজার ৩৮৯ জন (৩২%)। সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ঢাকা বিভাগে, ৯ হাজার ২৭৩ জন আর জেলা হিসেবে কুমিল্লায় এক হাজার আটজন। সর্বোচ্চ ছয় হাজার ২৩০ জন মারা গেছে ৬১-৭০ বছর বয়সী। অন্যদিকে বৈশ্বিক হিসাবে মৃত্যুর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১১তম। গত এপ্রিলের আগে বেশির ভাগ সময়ই ৩০ নম্বরের উপরে ছিল। গত মঙ্গলবার দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ ২৫৮ জন খবর আসে। আর চলতি মাসের গত ২৮ দিনেই মারা গেছে পাঁচ হাজার ৩৭০ জন।

জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, এ বছর দুই দফায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ মাঠ পর্যায়ে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো যায়নি। বড় সমস্যাটি হয়েছে দুই ঈদে মানুষের চলাচল ও অসতর্ক থাকার প্রবণতা। এর পাশাপাশি কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন ও আক্রান্তদের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল এবং এখনো আছে। বিশেষ করে যারা পজিটিভ হয়ে বাসায় থাকছে তাদের ঠিকমতো মনিটর করা হচ্ছে না। কম উপসর্গধারীরা বাইরে ঘুরে বেড়ায়, যাদের মাধ্যমে সংক্রমণ বিস্তার ঘটছে।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, পরীক্ষা না করেও উপসর্গ নিয়ে অনেকেই বাড়িতে থাকছে। জটিল অবস্থায় শেষ সময়ে হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করছে। এটাও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সরকারের উচিত যত পজিটিভ রোগী হয় প্রত্যেককে মনিটর করা। এর মাধ্যমেই বোঝা যাবে কাকে কখন হাসপাতালে যেতে হবে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, মৃত্যু কমাতে হলে সবার আগে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর টিকা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানেই বয়স্কদের টিকা আগে নিশ্চিত হয়েছে সেখানেই মৃত্যু কমেছে। এ জন্য শহরে কিংবা গ্রামে সব বয়স্ক মানুষের উচিত কোনো ধরনের বিভ্রান্তি-অপপ্রচারে কান না দিয়ে দ্রুত টিকা নিয়ে নেওয়া। টিকা দেওয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হলেও মৃত্যুর ঝুঁকি কমবে—এটা প্রমাণিত।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন দেখা যাচ্ছে, এক পরিবারে একজন আক্রান্ত হলে সবাই আক্রান্ত হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে পারিবারিকভাবে আইসোলেশনের ব্যাপারে মানুষ সতর্ক নয়। শহরের শিক্ষিত-সচেতন মানুষের মধ্যেও এ বিষয়ে সতর্কতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ঘরে কারো জ্বর-সর্দি-কাশি হলেও আগে আইসোলেশনে যেতে হবে, তারপর পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া যে পরিবারে বয়স্ক ও আগে থেকে কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত কেউ আছে সেই পরিবারের অন্যদের অতি সতর্ক থাকতেই হবে। কারণ এখন পর্যন্ত যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের বেশির ভাগই আগে থেকে কোনো না কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল। করোনা আক্রান্ত হলে তাদের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ড. আলমগীর পরামর্শ দিয়ে বলেন, যারাই পজিটিভ হয় সবাইকেই আইসোলেশনের পাশাপাশি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া দরকার। এ ছাড়া বয়স্ক ও যাদের আগে থেকে কোনো রকম জটিলতা আছে তাদের পজিটিভ হলেই হাসপাতালে যেতে হবে। সময়মতো হাসপাতালে গেলে স্বল্প মাত্রার অক্সিজেন সাপোর্টেই অনেকে সুস্থ হতে পারে, আইসিইউ লাগে না। সিলিন্ডার অক্সিজেন ও হাইফ্লোতেই অনেকে ভালো হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে দেশে সর্বোচ্চ ৫৩ হাজার ৮৭৭টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার আগের দুই দিনের তুলনায় বেড়ে ৩০.১২ শতাংশ হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট শনাক্ত ১২ লাখ ১০ হাজার ৯৮২। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৮৮৪ জন।

ওই তথ্য অনুসারে ২৪ ঘণ্টায় মৃত ২৩৭ জনের মধ্যে পুরুষ ১৪৯ জন ও নারী ৮৮ জন। সর্বোচ্চ ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এর পরই ৬২ জন চট্টগ্রামে, ৩৪ জন খুলনায়, ২১ জন রাজশাহীতে, ১৮ জন সিলেটে, ১৬ জন রংপুরে, ৯ জন বরিশালে ও সাতজন ময়মনসিংহে মারা গেছে। এর মধ্যে ১৬৭ জন সরকারি হাসপাতালে, ৫৭ জন বেসরকারি হাসপাতালে ও ১৩ জন বাসায় মারা গেছে। বয়স বিবেচনায় সর্বোচ্চ ৭৮ জন মারা গেছে ৬১-৭০ বছর বয়সী। এ ছাড়া ২১-৩০ বছরের ৯ জন, ৩১-৪০ বছরের ১১ জন, ৪১-৫০ বছরের ৩৪ জন, ৫১-৬০ বছরের ৪৪ জন, ৭১-৮০ বছরের ৪৫ জন, ৮১-৯০ বছরের ১৫ জন ও ৯১-১০০ বছরের একজন।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের খবর দেয় সরকার। সংক্রমণ মোকাবেলায় কয়েক দফা লকডাউন জারি করা হয়। এখন চলছে ১৪ দিনের কঠোর লকডাউন। এ ছাড়া চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে গণটিকাদান কার্যক্রম চলছে।



সাতদিনের সেরা