kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

লকডাউনের পঞ্চম দিন

‘প্রয়োজন খতিয়ে দেখাই কঠিন হয়ে পড়ছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘প্রয়োজন খতিয়ে দেখাই কঠিন হয়ে পড়ছে’

সকাল সাড়ে ১০টা। রাজধানীর জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে তল্লাশি চৌকিতে একটি রিকশা থামায় পুলিশ। রিকশার দুই যাত্রীর একজন নুরুল ইসলাম। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নুরুল জানান, পপুলার হাসপাতালে গিয়েছিলেন তাঁর মায়ের মেডিক্যাল রিপোর্ট নিতে। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য রিপোর্টটি দেখতে চায় পুলিশ। রিপোর্টে দেখা যায়, নুরুলের মা করোনায় আক্রান্ত (পজিটিভ) হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নুরুল ও তাঁর সহযাত্রীকে দ্রুত বাসায় চলে যেতে বলে পুলিশ।

সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কালের কণ্ঠ’র কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এমন ঘটনা বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ওই ব্যক্তির মা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, সেই রিপোর্ট নিতে তিনি এসেছেন। আবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে হচ্ছে পুলিশকে। দিনশেষে পুলিশ সদস্যদেরও পরিবারের কাছে ফিরতে হয়। মনের মধ্যে কিছুটা ভয় তো থাকেই।

বিকেলে মোহাম্মদপুর এলাকায় মাহমুদ ইকবালের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জহুরি মহল্লার বাসিন্দা। সারা দিন বাসায় থাকতে ভালো লাগে না তাঁর। তাই বিকেলে বের হয়েছেন। চা খেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরবেন। মাহমুদের হাতে পলিথিন ব্যাগে ছয়টি ডিম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাতের এই ডিম হচ্ছে বাইরে বের হওয়ার লাইসেন্স। পুলিশ যেখানেই ধরে বলে দিই, সামনের গলিতে বাসা পেছনের গলিতে গেছিলাম ডিম আনতে।’

গতকাল মঙ্গলবার কঠোর বিধি-নিষেধের পঞ্চম দিন রাজধানীতে কারণে-অকারণে মানুষের বাইরে বের হওয়ার এমন প্রবণতা দেখা যায়।

পুলিশ বলছে, সবার কাছেই জরুরি কাজে বের হওয়ার যুক্তি আছে। এসব যুক্তির মধ্যে কোনটা অজুহাত তা খুঁজে বের করা কিছুটা কঠিন।

কিন্তু বিধি-নিষেধ মানার ব্যাপারে মানুষেরও যে উদাসীনতা রয়েছে সেটা দেখা যায় সন্ধ্যার পর। পাড়া-মহল্লার অলিগলি মানুষের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে ওঠে। ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, হাজারীবাগ ও লালবাগ ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ চায়ের দোকানই খোলা। সঙ্গে সেলুন, মুদি দোকান ও খাবারের দোকানগুলোও খোলা। সব দোকানেই এক শাটার তালা দেওয়া, অন্যটা অর্ধেক খোলা। দূর থেকে পুলিশের গাড়ি দেখলেই বন্ধ হয়ে যায় দোকানগুলো। পুলিশ চলে গেলে আবার খোলা হয়। এভাবেই চলে রাত ১টা পর্যন্ত।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার গত ২৩ জুলাই থেকে ১৪ দিনের কঠোর বিধি-নিষেধ জারি করেছে। মানুষকে বিধি-নিষেধ মানাতে গতকাল পঞ্চম দিনেও পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যদের সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। এর পরও গত কয়েক দিনের তুলনায় সড়কে যানবাহন চলাচল ছিল আগের চার দিনের তুলনায় বেশি। ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি মোটরসাইকেলের সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মতো। সকালের দিকে মূল সড়কে রিকশার সংখ্যা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিকশার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। কয়েক দিন দেখা না গেলেও এদিন সড়কে বেশ কিছু সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলতে দেখা যায়। সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি আটকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদও ছিল লক্ষণীয়। সে কারণে বিভিন্ন সিগন্যালে যানজট তৈরি হয়।

সকালে আজিমপুর, শংকর, জিগাতলা, সিটি কলেজ মোড়, রাসেল স্কয়ার মোড়, বিজয় সরণি, মহাখালী ও বনানী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ রয়েছে। সঙ্গে চলছে রিকশা, মোটরসাইকেল, অফিস বাস। তল্লাশি চৌকিগুলোতে গাড়ির জটলা সৃষ্টি হয়। পুলিশ প্রায় প্রতিটি গাড়ির যাত্রীর কাছে বাইরে বের হওয়ার কারণ জানতে চেয়েছে। যারা অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ।

অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ায় গতকাল ৫৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার ইফতেখারুল ইসলাম (মিডিয়া) বলেন, ‘গ্রেপ্তার ছাড়াও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২৩৬ জনকে চার লাখ ৮৩ হাজার ৯৭৫ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।’ আর ৪৯৭টি গাড়ির নামে মামলা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এসব মামলার বিপরীতে ১১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

সায়েন্স ল্যাব মোড়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জামাল উদ্দীনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় তো গাড়ি কম নাই। শুধু বাসটাই বন্ধ আছে। বাসে যদি কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা যেত, তাহলে ভালো হতো। নিরাপদে চলা যেত, সঙ্গে পকেটের টাকাও বাঁচত।’

পুলিশ বলছে, এই মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকলেও ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। ফলে সড়কে গাড়ির চাপ কিছুটা বেড়েছে। আবার অনেকেই প্রকৃতপক্ষে জরুরি কাজে বের হয়েছে। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করার ফলেই সিগন্যালে গাড়ির চাপ দেখা যাচ্ছে।

 



সাতদিনের সেরা