kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

দুই সিটির ‘কামান দাগা’র মাঝে ডেঙ্গুর দাপট

শম্পা বিশ্বাস   

২৮ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুই সিটির ‘কামান দাগা’র মাঝে ডেঙ্গুর দাপট

তৌসিফের বয়স ছয় মাস। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছয় দিন ধরে ভর্তি ধানমণ্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। স্বজনরা জানায়, গত ২১ জুলাই জ্বর আসে তার। জ্বর বাড়তে থাকায় পরদিন নেওয়া হয় হাসপাতালে। শুরুতে শরীরে প্লাটিলেট তিন লাখের মতো থাকলেও এখন কমে এসেছে এক লাখ ৯৫ হাজারে। সেই সঙ্গে তার পেট ফুলে গেছে। 

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় তৌসিফদের বাসা। তার মা-বাবার অভিযোগ, মাসে এক-দুইবার সেখানে মশার ওষুধ দেওয়া হয়, তা-ও আবার মূল সড়কের পাশ দিয়ে। একটু ভেতরের দিকের গলিতে ঢোকেন না সিটি করপোরেশনের মশার ওষুধ ছিটানোর কর্মীরা। 

বাসাবো এলাকার বাসার মালিক মনজুরুল হক। তাঁর ভবনে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১৫ জন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত দিন সিটি করপোরেশনের কর্মীরা আমার ভবনের ৪০০ গজের মধ্যে ওষুধ দিতে আসেনি। গত সোমবার আমি নিজে করপোরেশনে গিয়েছিলাম মশার ওষুধ চাইতে। পরে আজ (গতকাল) তারা এসে ওষুধ ছিটিয়ে গেছে।’

শুধু এই দুটি বাসায়ই নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় করোনা সংক্রমণের মধ্যেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত বছরের ডেঙ্গু আক্রান্তের রেকর্ড ভেঙেছে চলতি বছরের জুলাইয়ের ২৭ দিনে। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের মোট সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪৭৫। অথচ চলতি জুলাইয়ের ২৭ দিনেই সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৭৩। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১৪২ জন, যার মধ্যে ১৪১ জনই ঢাকার।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঢাকার দুই সিটি মশক নিধন অভিযান শুরু করেছে। গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) শুরু করেছে চিরুনি অভিযান। প্রথম দিনের অভিযানে রূপনগর আবাসিক এলাকার সমবায় সমিতির একটি নির্মাণাধীন ভবনকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে ডিএনসিসি। ভবনটির বেইসমেন্টে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রীতিমতো যেন চাষ হচ্ছে এডিসের লার্ভার। এই ভবনটির মালিকদের একজন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তোফাজ্জেল হোসেন। এর আগে ২০১৯ সালেও এই ভবনটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। এবার তার দ্বিগুণ জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল অভিযানে ১০ অঞ্চলে ১৫টি মামলায় ডিএনসিসি মোট জরিমানা আদায় করেছে চার লাখ ৪১ হাজার টাকা।

মাঠে ছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১১টি ভ্রাম্যমাণ আদালতও। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মশক নিধন অভিযানে সংস্থাটি ২৩টি ভবনকে মোট তিন লাখ ছয় হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে। তবে জনমনে প্রশ্ন একটাই, এত অভিযানের পরও কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এডিস। এ ক্ষেত্রে পরস্পরের ওপরে দায় চাপানোর প্রবণতা দেখা যায় দুই পক্ষেরই। সিটি করপোরেশন বলছে, সাধারণ মানুষ সচেতন নয়। এটাই এডিস বাড়ার মূল কারণ। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের দাবি, করপোরেশন সঠিবভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে না। লোক-দেখানো ওষুধ ছিটায়। সরু গলি কিংবা সব এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাতে যায় না তারা।

তবে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শের মধ্যে। তাঁদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে একটি সামাজিক আন্দোলন ঘটাতে হবে। প্রকৃতপক্ষে চিরুনি অভিযান বলতে যা বোঝায় সেটি করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডকে ১০টি ভাগে ভাগ করে সেখানে সিটি করপোরেশনের মশককর্মী, স্থানীয় সমাজসেবক এবং নতুন নেতৃত্বদের নিয়ে টিম গঠন করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ। এডিস খাল-বিল, ডোবা, নালা-নর্দমায় জন্মায় না। এটি পাত্রে জন্মায়। ফলে এই মুহূর্তে খাল-বিল, ডোবা-নালায় মনোযোগ দেওয়ার দরকার নেই, বরং স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করতে পারলেই এডিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার ঘনত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে ভৌগোলিক কোনো কারণ নেই। যদি ম্যানেজমেন্ট ঠিকমতো হয়, তাহলে মশা কমবে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার কালের কণ্ঠকে বলেন, ভয়ভীতি দেখানো বা জরিমানা করা নয়, বরং একসঙ্গে প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মানুষকে নিয়ে চিরুনি অভিযান করতে হবে। সিটি করপোরেশন কাজ করে, তবে যতটুকু করার কথা হয়তো ততটুকু হয় না। সিটি করপোরেশনের উচিত সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা কৌশলের মাধ্যমে বছরব্যাপী মশক নিধন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। হঠাৎ হঠাৎ অভিযান না করে নিয়মিত করতে হবে। কারণ মশার কীটনাশকের একটা মেয়াদকাল আছে। সেই সময়ের মধ্যে যদি ওষুধ দেওয়া না হয়, তাহলে মশা কমবে না। বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে সারা বছর ধরে এডিস ও কিউলেক্স মশা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই মুহূর্তে মশার কীটনাশক পরিবর্তনের কোনো দরকার নেই বলেও মনে করেন এই গবেষক।

এদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ কলের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কাজ করছি। নিয়মিত আমাদের টিম মাঠে কাজ করছে। তবে যত দিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সচেতন না হবে, তত দিন পর্যন্ত এটাকে আমরা সহনশীল পর্যায়ে আনতে সক্ষম হব না।’

এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই কাজে আমরা জনগণকে সম্পৃক্ত করছি।

প্রত্যেকে যদি তার জায়গা থেকে সঠিক দায়িত্ব পালন করে, তাহলে আমরা ফল ভালো পাব বলে আশা করছি।’

 



সাতদিনের সেরা