kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

ফিরতি পথে ভোগান্তি, ঢাকায় নেমে বিপাকে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফিরতি পথে ভোগান্তি, ঢাকায় নেমে বিপাকে

লকডাউনের প্রথম দিন গতকাল সড়কে যাত্রীবাহী যানবাহন চলেনি। ফলে যারা বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে তারা চরম বিপাকে পড়ে। হেঁটে, রিকশা-ভ্যান এমনকি ট্রাকে রাখা খালি ড্রামে করেও অভিনব পন্থায় গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। ছবিটি গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর চেকপোস্ট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

জানাই ছিল, ঈদের পর শুক্রবার থেকে শুরু হবে কঠোর লকডাউন। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের জারি করা ১৪ দিনের বিধি-নিষেধ শুরু হওয়ার আগে তাই রাজধানীতে ফেরার তাড়া ছিল। সেটা টের পাওয়া গেছে মহাসড়কে। বৃহস্পতিবার রাজধানীমুখী বিভিন্ন মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে জট লেগে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ে ফিরতি পথের যাত্রীরা। রাজধানীতে ঢুকেও গভীর রাতে যানজটে পড়তে হয়েছে। আর যারা গতকাল লকডাউন শুরুর দিন সকালে ঢাকায় নেমেছে তারা যানবাহন না পেয়ে বিপাকে পড়ে। বিধি-নিষেধের প্রথম দিনই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কঠোর অবস্থান দেখা গেছে। সেনা সদস্যদের টহলও ছিল।

অন্যান্য সময় ঈদের ছুটি শেষে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত কয়েক দিন ধরে চলতে থাকলেও এবার বিধি-নিষেধের ফলে সেই সুযোগ ছিল না। এতে বৃহস্পতিবার লঞ্চ ও বাসে যাত্রীর চাপ পড়ে। লঞ্চ ও বাসের সময়সূচির বিপর্যয় ঘটে। এ কারণে ঢাকায় ফিরতে ফিরতে সকাল হয়ে যায় অনেকের।

গতকাল সকাল ৬টা থেকে বিধি-নিষেধ শুরু হওয়ায় রাজধানীতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যারা সকালে এসে ঢাকায় নেমেছে তাদের ঘরে ফিরতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে মানুষের মিছিল দেখা যায়, যারা হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয়। সকালে ঢাকায় প্রবেশ করা বেশির ভাগ আন্ত জেলা বাসকে জরিমানা গুনতে হয়েছে। এর পর থেকে রাজধানীর মূল সড়কগুলো ফাঁকা হতে শুরু করে। দুপুরের পর থেকে সড়কে সামান্য কিছু রিকশা আর ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া তেমন কোনো যানবাহন দেখা যায়নি। সড়কের মোড়ে মোড়ে ছিল পুলিশের তল্লাশি চৌকি। যারা ঘর থেকে বের হয়েছে তাদের সবাইকেই কড়া জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ‘অপ্রয়োজনে’ ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য অনেককেই জরিমানা গুনতে হয়েছে। অনেককে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ।

ঈদ উপলক্ষে আট দিন শিথিলের পর করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গতকাল থেকে আবারও শুরু হয়েছে কঠোর বিধি-নিষেধ। চলবে আগামী ৫ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত।

ঢাকায় পৌঁছে দুর্ভোগের শিকার : বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আজাদ হোসেন। গতকাল সকাল পৌনে ৬টায় ঢাকার সদরঘাটে এসে পৌঁছান তিনি। লঞ্চঘাটে নেমে সেখান থেকে বাসায় ফেরার মতো কোনো যানবাহন পাচ্ছিলেন না। তারপর তিনি হাঁটা শুরু করেন। তাঁর মতো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে হাজারো মানুষ। গাবতলী বাস টার্মিনালেও একই চিত্র দেখা গেছে। গণপরিবহন না চলায় ৮০ টাকার রিকশা ভাড়া ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে যাত্রীদের।

সকালের দিকে এমন পরিস্থিতিতে পুলিশকেও ‘ছাড়’ দিতে দেখা যায়। পুলিশ বলছে, যারা ঢাকা পর্যন্ত এসে পড়েছে তাদের তো ঘরে যেতে দিতেই হবে।

বাসে ফেরা যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত ফেরি পার হতে গিয়েই তাদের ঢাকায় ঢুকতে দেরি হয়েছে। বিধি-নিষেধের বিষয়টি তারা জানত। সেই হিসাবেই বের হয়েছিল, যেন তারা ভোরের মধ্যে বাসায় চলে যেতে পারে। ট্রেন সঠিক সময়ে ছেড়ে এলেও লঞ্চ আর বাসের সময়সূচি বিপর্যয়ের কারণেই যাত্রীদের এমন ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মঞ্জুর যানজটের ভোগান্তির কথা জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলছিলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় প্রাইভেট কারে বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে রাজধানীর মিরপুরের বাসায় পৌঁছাতে রাত ২টা বেজে যায়। মহাসড়কের গৌরীপুরে প্রথম যানজটে পড়েন তিনি। এরপর মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা পেরোতে অনেক সময় লেগে যায়। ঢাকায় শনির আখড়ায় এসে আবার যানজটে পড়েন। এরপর হানিফ ফ্লাইওভারেও একই পরিস্থিতির শিকার হন। রাজধানীর কলেজগেটে এসে আবার যানজটের কবলে পড়েন।

কুষ্টিয়া থেকে এসবি পরিবহনে আসা যাত্রী রাজিউর রহমান সংবাদপত্রে কাজ করেন। গতকাল কাজে যোগ দিতে কুষ্টিয়া থেকে নাইট কোচে উঠেছিলেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পশ্চিম পার থেকেই শুরু হয় যানজট। আমিনবাজার আসার আগে বেশ কয়েকটি স্থানে পুলিশ গাড়ি আটকালেও তারা জরিমানা করেনি। তবে আমিনবাজার এসে চালক ঢাকায় প্রবেশ করতে চায়নি। বাধ্য হয়ে নেমে হেঁটে হেঁটে আসতে হয়েছে।

রাজধানীর সড়ক ফাঁকা : গতকাল রাজধানীর আজিমপুর, কলাবাগান, মহাখালী, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মিরপুর, মতিঝিল, বনানীসহ বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কে তেমন গাড়ির চাপ নেই। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ছিল পুলিশের তল্লাশিচৌকি। সেগুলোতে প্রায় প্রতিটি গাড়িকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়। তবে সকালে গাবতলীতে দূরপাল্লার বাস প্রবেশ করায় সেখানে গাড়ির কিছুটা চাপ দেখা যায়। জরিমানা গুনে টার্মিনালে প্রবেশ করতে পারলেও কোনো বাস বের হতে পারেনি।

রাজধানীর সব এলাকায় বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নে পুলিশের তৎপরতা কঠোর ছিল না। লালবাগ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীর চর এলাকায় পুলিশের টহল দেখা যায়নি। মেরুল বাড্ডা এলাকায় পুলিশের তল্লাশিচৌকিতেও ছিল ঢিলেঢালা ভাব। প্রগতি সরণির দুই পাশের রাস্তা দিয়ে রিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে অনেক মানুষ চলাচল করলেও পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়নি।

সকাল ৮টার দিকে ধানমণ্ডির রাসেল স্কয়ারে পাঁচটি বাস আটক করে পুলিশ। প্রতিটি বাসকে দুই হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। রাসেল স্কয়ারে দায়িত্বরত পুলিশ সার্জেন্ট রকিবুল ইসলাম বলেন, বিধি-নিষেধ ভঙ্গ করায় জরিমানা করা হয়েছে।

উত্তরবঙ্গ পরিবহনের বাসচালক সালামত হোসেন বলেন, ‘কুড়িগ্রাম থেকে যখন যাত্রা করেছি সে সময় অনুসারে রাত ১টার মধ্যে আমাদের সায়েদাবাদ পৌঁছানোর কথা, পথে যানজট থাকায় পৌঁছতে পারিনি। বাসে কোনো যাত্রীও নেই। যাত্রী নামিয়ে আমরা সায়েদাবাদ টার্মিনালে যাচ্ছিলাম বাস রাখতে।’

ঢাকায় মামলা ও জরিমানা : ‘অপ্রয়োজনে’ ঘর থেকে বের হওয়ায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪০৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার ছাড়াও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২০৩ জনের এক লাখ ২৭ হাজার ২৭০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর বাইরে ৪৪১টি গাড়ির নামে মামলা করেছে ট্রাফিক বিভাগ। এসব মামলায় ১০ লাখ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

সকালেও ফেরিতে গাড়ি পারাপার : দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে বিধি-নিষেধের প্রথম দিন সকালে আটকে পড়া শতাধিক যাত্রীবোঝাই মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও কয়েক হাজার মানুষ ফেরি পারাপার হয়েছে। আটকে থাকা ওই গাড়িগুলো বিশেষ বিবেচনায় গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে পার করা হয়।

গাজীপুরে মাছের ড্রাম থেকে ১০ জন আটক : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ট্রাকে মাছের ড্রামে ময়মনসিংহে ফেরার সময় গতকাল দুপুরে ১০ জনকে আটক করা হয়। ঢাকার কারওয়ান বাজারের আড়তে মাছ নামিয়ে দিয়ে ফিরছিল ট্রাকটি। ঢাকা ও গাজীপুরের কয়েকটি জায়গায় পুলিশের তল্লাশিচৌকি ফাঁকি দিলেও রাজেন্দ্রপুরে ধরা পড়ে তারা। পুলিশের সন্দেহ হলে ড্রাম তল্লাশি করে তাদের আটক করা হয়। এ ঘটনায় ট্রাকচালকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা