kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

অস্পষ্ট নির্দেশনায় চামড়া মজুদে অনিশ্চয়তা

ফারজানা লাবনী   

২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অস্পষ্ট নির্দেশনায় চামড়া মজুদে অনিশ্চয়তা

সম্প্রতি প্রজ্ঞাপন জারি করে ঈদুল আজহার এক দিন পর থেকে টানা ১৪ দিনের কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ লকডাউনের মধ্যে প্রক্রিয়াকরণ কারখানা খোলা রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যেসব ট্যানারিতে শুধু কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে লবণ মাখিয়ে বিক্রি করা হয় এবং চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করা হয়, সেসব কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চামড়া খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, শুধু চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানাই ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে না, চামড়া খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কারখানাও কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে। সরকার এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ না দেওয়ায় কাঁচা চামড়া কিনে কোথায় মজুদ রাখা হবে তা নিয়ে অনেক ট্যানারির মালিক পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। অন্যদিকে অনেকে তিন দিন পর্যন্ত পশু কোরবানি করে থাকে। এসব পশু কোরবানিতে আট-দশজন মানুষ একসঙ্গে হয়ে থাকে। লকডাউনের মধ্যে এ সুযোগ রাখা হয়েছে কি না তা নিয়েও প্রজ্ঞাপনে কিছু নেই। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ঈদুল আজহার এক দিন পর থেকে ১৪ দিনের কঠোর লকডাউন হবে। এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করতে ঈদুল আজহার শেষ সময়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও চামড়া খাতের কোন কোন কারখানা খোলা থাকবে তা নিয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। সব শিল্প-কারখানা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। শুধু চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানা খোলা রাখা হলো, কিন্তু অন্য সব ট্যনারি যদি বন্ধ থাকে তবে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে কোথায় রাখব?

ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, ‘কোরবানির পশুর চামড়া মজুদের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা চেয়ে সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। সরকারকে এ বিষয় স্পষ্ট করতে হবে। না হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অনেক চামড়া খাতের কারখানাকে হয়রানির করার সুযোগ থাকবে।    

প্রসঙ্গত, ঈদুল আজহার দিন পাড়া-মহল্লা ঘুরে ঘুরে চামড়া সংগ্রহকারীরা কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে লবণ মাখিয়ে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে। আড়তদাররা এসব চামড়ায় লবণ মাখিয়ে দু-এক দিন রেখে তা ট্রাকে বা পিকআপে করে চামড়া খাতের কারখানা এবং ট্যানারির মালিকদের কাছে বিক্রি করে থাকেন। কাঁচা চামড়া কিনে কারখানার মালিকরা তা কারখানায় মজুদ করে রাখেন। এসব কারখানার বেশির ভাগ বন্ধ থাকলে চামড়া কোথায় রাখবেন তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রতিবছর দেশে গড়ে দুই কোটি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই করা হয়। এর অর্ধেকের বেশি জবাই হয় কোরবানির ঈদের সময়।

জুতা তৈরিতে দেশের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা রোধে সরকার লকডাউন দেবে, এটা আমরাও সমর্থন করি। পশু কোরবানির পর সংগৃহীত চামড়া কয়েক ধাপে হাতবদল হয়ে আমাদের কাছে আসে। চামড়া খাতের সব ধরনের কারখানা খোলা রাখার বিষয়টি সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট নির্দেশ থাকতে হবে। ট্যানারিতে উৎপাদন বন্ধ রাখা হলেও খোলা রাখতে হবে। এতে সংগৃহীত চামড়া মজুদ করা সম্ভব হবে।’ 

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে ১৫৫টি ট্যানারি রয়েছে। এর মধ্যে ১১০টি ওয়েট ব্লু এবং ২০টি ক্রাস্ট উৎপাদন করছে। বাকিগুলো এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। এসব কারখানা বন্ধ থাকলে পশুর চামড়া কোথায় রাখবেন ব্যবসায়ীরা?

চামড়া খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ছয় লাখ এবং পরোক্ষভাবে আরো তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অবদান ৪ শতাংশ, যা দেশের মোট জিডিপির ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করে পাঁচ বিলিয়ন ডলার এবং জিডিপির ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, লকডাউনে পরিবহনসংকটে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে অর্থনীতিতে চামড়া খাতের এ হিসাব পাল্টে যাবে।

চামড়া সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে না পারলে চোরাই পথে ভারতে চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা। ভারতের বামতলা, কানপুর, চেন্নাই ও পাঞ্জাবে কয়েক হাজার ট্যানারি আছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর গরু জবাইয়ে কঠোরতা আরোপ করে। এ কারণে ভারতের ট্যানারিগুলো বাংলাদেশ থেকে কোরবানির ঈদে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে থাকে। প্রতিবছরই  ঈদুল আজহার পর এ দেশ থেকে চামড়া পাচার হয়ে যায়। চলতি সপ্তাহে শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে এবং এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চামড়া ব্যবসায়ীরা চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।



সাতদিনের সেরা