kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

কারখানা বন্ধ রেখে লকডাউন অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী

মো. জসিম উদ্দিন সভাপতি, এফবিসিসিআই

১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কারখানা বন্ধ রেখে লকডাউন অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী

স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলা রাখার সরকারি সিদ্ধান্তে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় সরকার ঈদ-পরবর্তী দুই সপ্তাহ লকডাউন ঘোষণা করেছে। এ সময় শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকবে। এতে দেশের উদ্যোক্তাদের দেউলিয়া হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। এফবিসিসিআই কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এম সায়েম টিপু।

 

কালের কণ্ঠ : সরকারের নানা উদ্যোগের পরও দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়ে চলার বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

জসিম উদ্দিন : বিভিন্ন দেশেই সংক্রমণের হার বাড়ছে। আমরা প্রথম ধাক্কাটা সামলে উঠে ভালোই ছিলাম। কিন্তু ডেল্টা ভেরিয়েন্টের কারণে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, লকডাউনে দেশের শিল্প-কারখানা খোলা রাখায় মানুষকে করোনা স্বাস্থ্যবিধি মানানো যাচ্ছে না। কারখানার মালিকদেরও উদাসীনতা আছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

জসিম উদ্দিন : এটা ঠিক সাধারণ মানুষসহ কিছু কিছু কারখানার মালিকের উদাসীনতার কারণে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা যায়নি। তারা জীবনের চেয়ে জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তবে সরকারের প্রণোদনা এবং শিল্প-কারখানা খোলা না রাখলেও জীবিকার সংকটে মানুষকে আরো বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো। ফলে আমি মনে করি কারখানা খোলা রাখাটা প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। এটা সংকট মোকাবেলা করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাহস জুগিয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলো টিকে থাকার একটি অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে। অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : কিন্তু দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলো প্রণোদনা না পাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের জীবন বাঁচাতে হিমশিম খেতে হয়েছে।

জসিম উদ্দিন : হ্যাঁ, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতসহ বিশেষ করে গণপরিবহন, দোকান, ক্ষুদ্রশিল্প, পর্যটন ও কনভেনশন সেন্টার সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আশার কথা, সরকার আবারও তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এতে পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুররা সুবিধা পাবেন। তবে এখানে দোকান ও পর্যটনের সঙ্গে জড়িত অনেকে বাদও পড়েছেন।  তাঁদেরও এই  প্যাকেজের আওতায় এনে একই প্যাকেজকে আরো বড় করা যেতে পারে বলে আমি মনে করি।

 

প্রশ্ন : টিকা কার্যক্রমের দুর্বলতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানায় উদাসীনতা নিয়ে দোকান ও গণপরিবহন খোলার সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক মনে করেন?

জসিম উদ্দিন : সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ, অতিদরিদ্র মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনাসহ অনেক ভালো ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত সময়ের রোষানলে পড়েছে। তবে তাদের পাশে দাঁড়াতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকলেও সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি নেই। 

 

কালের কণ্ঠ : লকডাউন শিথিল করায় আসন্ন ঈদ ঘিরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের ক্ষতি কাঠিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে করেন কি?

জসিম উদ্দিন : দুই ঈদ ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতির সঞ্চার হয়। গত রমজানের ঈদে ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসাসংশ্লিষ্টরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী একটি প্রণোদনা দিয়েছিলেন। এটা এখনো ৩০ শতাংশ বিতরণ সম্ভব হয়নি। বিতরণ জটিলতা কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : ঈদের পর আসন্ন লকডাউন নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী? 

জসিম উদ্দিন : আগামী ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নতুন করে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এর আগে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে জীবন ও জীবিকার কথা চিন্তা করেই লকডাউন। এবারের লকডাউনে শিল্প-কারখানাসহ সব বন্ধ থাকবে। এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সরকারের আমলারা। ওই বৈঠকে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি ছিলেন না।

 

কালের কণ্ঠ : দেশের অর্থনীতিতে এটা কী ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?

জসিম উদ্দিন : ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের সব বাজার খুলতে শুরু করেছে। রপ্তানিকারকদের হাতে প্রচুর কার্যাদেশ। এ অবস্থায় ঈদের ছুটিসহ ১৮ থেকে ২০ দিন কারখানা বন্ধ থাকলে উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তায় মধ্যে পড়ে যাবেন। এ ছাড়া লেট সামার, ক্রিসমাস, বড়দিন এবং আগামী শীতের কার্যাদেশ হাতছাড়া হবে। এর ফলে দেশের রপ্তানি খাতকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। দেউলিয়া হয়ে পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : এ অবস্থায় সরকার কী করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

জসিম উদ্দিন : আমি মনে করি লকডাউনে আগের মতো কারখানাগুলো খোলা রাখা দরকার। তা না হলে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য এখন বড় মৌসুম। এই সময় সরকারের এমন সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে।

 

কালের কণ্ঠ :  ক্ষতি সামলে উঠতে আপনার পরামর্শ?

জসিম উদ্দিন : ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের আচরণ ঠিক করতে হবে। পুলিশ দেখলে মাস্ক পরবেন এটা নয়; নিজের জীবনের জন্যই আমাদের মাস্ক পরতে হবে। এ ছাড়া কারখানায় কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব ডরমিটরির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে সব পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনে প্রয়োজনে আরো কঠোর হতে হবে।