kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

লকডাউনের তৃতীয় দিন

ঘরবন্দি থাকতে চাইছে না মানুষ

৬২১ জন গ্রেপ্তার, ৩৪৬ জনকে জরিমানা ৮৫৫টি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘরবন্দি থাকতে চাইছে না মানুষ

চলমান কঠোর লকডাউনের তৃতীয় দিন গতকাল বিজিবির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ে অনেকে। উত্তরা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দুই দিন কঠোর লকডাউনের ওপর শাণিত চোখ রেখে আস্তে আস্তে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে রাজধানীর মানুষ। ফলে লকডাউনের তৃতীয় দিনে সড়কে বেড়েছে গাড়ির চলাচল। মানুষও ঘর থেকে বের হয়েছে বেশি। গেল দুই দিন বৃষ্টির বাড়াবাড়ি থাকলেও গতকাল শনিবার দিনভর ছিল ঝকঝকে রোদ্দুর। এ সুযোগে অনেকেই আড়মোড়া ভেঙে নানা প্রয়োজনে বের হয়ে আসে রাস্তায়। তবে রাজধানীর সড়কে সড়কে ভ্রাম্যমাণ আদালত, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের কড়াকড়ি একচুলও কমেনি।

লকডাউনের বিধি-নিষেধ অমান্য করার অভিযোগে গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ৬২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ৩৪৬ জন গোনেন এক লাখ ছয় হাজার ৪৫০ টাকার জরিমানা। এ ছাড়া রাজপথে গাড়ি বের করার বৈধ কোনো কারণ দেখাতে না পারায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ঠুকেছেন ৮৫৫টি মামলা। এ মামলাগুলো থেকে ১৯ লাখ ২২ হাজার ৫৫০ টাকা জরিমানাও আদায় করা হয়েছে।

গত দুই দিনের চেয়ে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে রিকশাও বেশি চলতে দেখা গেছে। মূল সড়কগুলোর মোড়ে মোড়ে বসানো ছিল তল্লাশি চৌকি। সড়কে চলাচলকারীদের কড়া জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েই পার হতে হয়েছে। অকারণে ঘর থেকে বের হয়েছে এমন অনেকেই ক্ষমা পায়নি। আবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আর্থিক জরিমানাও গুনেছে অনেকে। তবে পুলিশি নজরদারি ছিল শুধু মূল সড়কেই। পাড়া-মহল্লার দৃশ্যপটটা ছিল অনেকটা ‘স্বাভাবিক’ দিনের মতো। অলিগলির চেহারা দেখলে বোঝার উপায় ছিল না যে লকডাউন চলছে। যে যার মতো ঘর থেকে বের হয়ে আড্ডাবাজিতে মেতেছিল। অনেক স্থানে শিশুদের এলাকার মাঠে খেলতেও দেখা গেছে। গতকাল রাজধানীর লালবাগ, আজিমপুর, হাজারীবাগ, মিরপুর, গাবতলী, যাত্রবাড়ী, মতিঝিল, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে এমন ক্যানভাস চোখে ধরা দেয়।

শাহবাগ, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল যাতায়াত করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন গাড়ির সামনে চিকিৎসক, সাংবাদিক, জরুরি পানি, ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টিকার বা ব্যানার লাগিয়ে গাড়ি চলতে দেখা যায়। স্টিকার না থাকা প্রায় প্রতিটি গাড়ি দাঁড় করিয়ে বের হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়। এ সময় তাঁরা বিদেশ যাওয়ার যাত্রী, রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেনসহ বিভিন্ন কারণ দেখান।

দুপুর আড়াইটার দিকে শাহবাগ মোড়ে ফয়সাল মোর্শেদ নামে এক ব্যক্তির প্রাইভেট কার দাঁড় করানো হয়। পরে ভেতরে থাকা মাকে দেখিয়ে অসুস্থতার কাগজপত্র দেখালে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কারওয়ান বাজারে চেকপোস্টের কড়াকড়ি কম থাকলেও অপ্রয়োজনে কাউকে বের হতে দেখা যায়নি। বিকেল ৩টার দিকে ফার্মগেট মোড়ে দুজন নিয়ে চলা মোটরসাইকেল আটক করতে দেখা যায়। পরে সুনির্দিষ্ট কারণ দেখাতে না পারায় তাদের জরিমানা করা হয়।

ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকা সাব্বির রহমান বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর পর বিজিবি, সেনাবাহিনীর টহল গাড়ি ঘুরে যাচ্ছে। আমাদের নিয়মিত দায়িত্বে আছি। তবে অপ্রয়োজনে মানুষের চলাচল কম। সবাই জরুরি কাজেই বের হচ্ছে।’

পুরান ঢাকার পোস্তগোলা, সায়েদাবাদ, মানিকনগর ও বাড্ডা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রচুর রিকশা চলাচল করছে। সঙ্গে বেড়েছে মোটরসাইকেলও। কোনো কোনো মোটরসাইকেলে দুজন যাত্রীও দেখা গেছে। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে মানিকনগর এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের চেকপোস্ট বসিয়ে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে প্রতিটি যানবাহন ও রিকশা দাঁড় করিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হচ্ছে। এরপর যৌক্তিক কারণ থাকলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

মানিকনগরে দুটি চেকপোস্টে কড়াকড়ি অবস্থা দেখা গেলেও রামপুরা এলাকায় চেকপোস্টে কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না। চেকপোস্টের কিছুটা দূরে চেয়ার পেতে বসে আছেন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে খিলগাঁও খিদমাহ হাসপাতালের উল্টোদিকের পুলিশের চেকপোস্টে একই ছবি দেখা গেছে। 

মিরপুর ও গাবতলী এলাকায় দেখা গেছে, গলিতে মানুষ শুক্রবারের চেয়েও বেড়েছে। তবে অ্যাকশনে ছিল পুলিশ। দুপুর দেড়টার দিকে মিরপুর আল হেলাল হাসপাতালের সামনে এক ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশের টহলদল ১১ জনকে আটক করে গাড়িতে করে থানায় নিয়ে যায়। কী অপরাধে তাদের থানায় নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে টহলদলে থাকা মিরপুর থানা পুলিশের এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘কেন ঘর থেকে বের হয়েছে। এর উপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারায় আটক করে থানায় নিয়ে যাচ্ছি।’

সকাল ১১টার দিকে সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় গলিতে ঢোকে পুলিশ। পুলিশের আগমনের খবরে গলির সড়কে থাকা লোকজন দ্রুত ছুটে যার যার বাসায় ঢুকে পড়ে। মিরপুর মাজার রোড়ে সড়কে বসে আড্ডা দিচ্ছিল ১০-১৫ জন যুবক। পুলিশের গাড়ি এসে কাছাকাছি দাঁড়াতেই দৌড়ে পালিয়ে যায় তারা। মাজারের বন্ধ গেট পার হতে গিয়ে জখম হয় রকিবুল ইসলাম নামের এক যুবক। রকিবুল বলেন, ‘বাসায় ছিলাম, বন্ধুরা ডেকে এনেছে, এখন পুলিশ ধরলে তো বাবা রাগ করবেন, তাই পালানোর চেষ্টা করেছি। লকডাউন শেষ না হলে আর বেরোব না ভাই।’

এদিকে সরকারঘোষিত বিধি-নিষেধ লোকজনকে মানাতে পাড়া-মহল্লায়ও অভিযান চালানোর কথা জানিয়ে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যেও যারা বাইরে বের হচ্ছে তাদের অনেকেই ঠিকভাবে মাস্ক পরছে না। সচেতনতার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

খন্দকার আল মঈন আরো বলেন, ‘পাড়া-মহল্লায় টহল দেওয়ার সময় দেখেছি, অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। বিভিন্ন স্টলে-দোকানে গণজমায়েত দেখা যাচ্ছে। সবার প্রতি অনুরোধ, পরিবারের কথা বিবেচনা করে হলেও এই কয় দিন করোনার ঝুঁকিপূর্ণ সময়টাতে ঘরে থাকুন। অন্যথায় আমরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেব।’



সাতদিনের সেরা