kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

সতর্ক চোখ সড়কে গলিতে ঢিলেঢালা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সতর্ক চোখ সড়কে গলিতে ঢিলেঢালা

বাইরে বের হওয়ার উপযুক্ত কারণ দেখাতে না পারায় অনেককেই জরিমানা গুনতে হয়েছে। গতকাল যাত্রাবাড়ী থেকে তোলা। ছবি : শেখ হাসান

সড়কের মোড়ে মোড়ে পুলিশের সতর্ক চোখ। রাস্তায় রাস্তায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল। যানবাহন দেখলেই থামিয়ে কড়া জিজ্ঞাসা। কোথাও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আদালত। হাতকড়া, জরিমানা কিংবা মুচলেকা। তালা ঝুলছে বড় বড় শপিং মল, মার্কেট, দোকানপাটে। কখনো কানে ভাসছিল অ্যাম্বুল্যান্সের সাইরেন। রাজধানীর ফাঁকা সড়কে জরুরি প্রয়োজনের গাড়ি চলছিল শাঁ শাঁ করে। ব্যক্তিগত কিছু গাড়ির ঠিকানা হয়েছে পুলিশের রেকারে। আর লকডাউনের আওতামুক্ত ত্রিচক্রযান রিকশা বীরদর্পে ওঠে ভিআইপি সড়কে। প্রধান প্রধান সড়কে এমন কড়াকড়ি দেখা গেলেও রাজধানীসহ সারা দেশের পাড়া-মহল্লার ছবি ছিল একেবারেই উল্টো। অলিগলিতে বেশ জমেছিল চায়ের কাপের আড্ডা। কোনো কোনো গলিতে হয়েছে পুলিশ-মহল্লাবাসীর ইঁদুর-বিড়াল খেলা! স্বাস্থ্যবিধি না মেনে পাড়ার কাঁচাবাজারে ছিল মানুষের ঠাসাঠাসি। মাছের বাজার করছিল গমগম। করোনা সংক্রমণ বাগে রাখতে সরকারের সাত দিনের কঠোর লকডাউনের প্রথম দিন গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের চেহারা ছিল এমনই।

গতকাল অপ্রয়োজনে রাজধানীর রাস্তায় বের হয়েছে, এমন এক হাজার ১৫৩ জনকে আটক করেছিল পুলিশ। এর মধ্যে ৫৫০ জনকে দেখানো হয়েছে গ্রেপ্তার। অন্যদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এর মধ্যে ২১২ জনকে করা হয়েছে আর্থিক জরিমানা। অপ্রয়োজনে সড়কে বের হওয়ায় ২৭৪টি গাড়ি খেয়েছে মামলা। জব্দ করা হয়েছে ৭৭টি গাড়ি।

এদিকে কঠোর লকডাউনেও পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন কলকারখানা খোলা থাকায় কর্মস্থলে যেতে ভোগান্তিতে পড়েন শ্রমিকরা। বেশির ভাগ কারখানাই তাঁদের যাতায়াতের জন্য কোনো পরিবহনের ব্যবস্থা করেনি।

সরেজমিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, শংকর, জিগাতলা, সিটি কলেজ মোড়, রাসেল স্কয়ার, শাহবাগ, মতিঝিল, গাবতলী, মিরপুর, হাতিরঝিল, আজিমপুর, লালবাগ, কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়কগুলোতে কিছু পণ্যবাহী ট্রাক, অ্যাম্বুল্যান্স, পোশাক প্রস্তুতকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মী আনা-নেওয়ার গাড়ি, বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকদের গাড়ি ও সংবাদমাধ্যমের গাড়ি চলছে। চেকপোস্টগুলোতে আইডি কার্ড, বিদেশগামীদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ দেখাতে হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাছে নিশ্চিত করতে হচ্ছে। তবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপও দেখা গেছে। তারা প্রায় প্রতিটি গাড়ি তল্লাশি করার চেষ্টা করেছে।

গাবতলী ও মিরপুর সড়কে তেমন কোনো যানবাহন চলতে দেখা যায়নি। তবে মাস্ক ছাড়া এলাকার সড়কে বহু মানুষকে আড্ডাবাজিতে দেখা গেছে। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পল্লবীর কালশী সড়কের পশ্চিম প্রান্তে রফিক নামের এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পুলিশ। তখন তিনি নিজেকে পোশাক শ্রমিক পরিচয় দিলে পুলিশ তাঁকে যেতে দেয়। পুলিশের চেকপোস্ট থেকে সামান্য এগিয়ে ওই যুবক দৌড়ে একটি গলির মধ্যে ঢোকেন। দৌড় দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘আসলে আমি পোশাক কারখানায় কাজ করি না, মিথ্যা বলে পার হয়ে এলাম।’

সকালে মিরপুরের কাঁচাবাজারে দেখা যায় বেজায় ভিড়। মুদি দোকান বাদে অন্য কোনো দোকান খুলতে দেখা যায়নি। সড়কে দেখা গেছে পুলিশের তৎপরতা। অনেককেই রিকশা দাঁড় করিয়ে গন্তব্য জানতে চেয়েছে পুলিশ। ফুটপাতে বসেনি কোনো দোকান। মিরপুর ৬০ ফুট সড়কের পাশে বন্ধ দোকানের সামনে বসে ১০-১৫ জনকে দেখা যায় লুডু খেলতে। সড়কে কেন—জানতে চাইলে বলে, ‘বাসায় অনেক লোক; কী করব, এখানে বসে সময় পার করছি।’

হাতিরঝিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিরতি দিয়ে দিয়ে একটি-দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি চলছে। টহলে রয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। মাঝে মঝে কয়েকটি ত্রাণের গাড়িও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হলেও হাতিরঝিলজুড়েই ঘোরাফেরা এবং গল্প করতে দেখা গেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গাড়ি দেখলেই আবার দলছুট হয়ে ঢুকে পড়ছে বাড়ির ভেতরে।

প্রগতি সরণিতে ছিল না গাড়ির চাপ। গণমাধ্যম, বর্জ্য, ওষুধসহ নানা জরুরি সেবার গাড়ি দেখা যায় সড়কটিতে। তবে নদ্দা এলাকায় মানুষের জটলা ছিল বেশ। বিশেষ করে রিকশাচালকদের। নদ্দা ফুট ওভারব্রিজের নিচে বেশ কিছু মানুষকে দেখা গেছে গল্প করতে। তাদের একজন বিল্লাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার ঘর এইহানেই। করোনায় কাজকাম নাই। তাই একটু বাইর হইছি। আবার চইল্যা যাব।’ যানবাহন বন্ধ থাকায় রিকশাচালকদের বেশ লাভ হচ্ছে বলে জানান আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, ‘আয়-রোজগার ভালোই হইতাছে। বাস বন্ধ থাহার লাইগ্গা ভাড়া এট্টু বেশি পাই। আবার যাইতেও বেশি সময় লাগে না। তয় যাত্রী কম।’

বিকেল ৩টার দিকে শাহবাগ মোড়ে একটি প্রাইভেট কার দাঁড় করিয়ে বের হওয়ার কারণ জানতে চান পুলিশ সদস্যরা। এ সময় গাড়িতে থাকা তাসলিমা আক্তার নামের এক নারী জানান, তাঁর বাবা আসলাম চৌধুরীকে ডাক্তার দেখাতে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। চেকপোস্টে আটকানোর বিষয়ে তাসলিমা বলেন, ‘ধানমণ্ডি থেকে বের হয়ে অন্তত চার জায়গায় পুলিশ জানতে চেয়েছে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ও পরীক্ষার কাগজপত্র দেখিয়ে বুঝিয়ে বলার পর আবার ছেড়েও দিয়েছে।’

মতিঝিল শাপলা চত্বরে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট সাগর সরকার বলেন, ‘আমরা নিয়মিত দায়িত্বে আছি। এ ছাড়া বিভিন্ন মোড়ে পুলিশের চেকপোস্টে জরুরি গাড়ি ছাড়া বিভিন্ন প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল আটকানো হচ্ছে।’

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মতিঝিল ও কমলাপুরের বিভিন্ন সড়কে পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের গাড়ি সারিবদ্ধভাবে টহল দিতে দেখা যায়।

মামলা-জরিমানা : গত রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ঢাকায় ২৭৪টি গাড়িকে মামলা দেওয়া হয়েছে। এতে জরিমানা করা হয় চার লাখ ৬৩ হাজার ৫০ টাকা। রেকারিং করা হয়েছে ৭৭টি গাড়ি। এ ছাড়া বিধি-নিষেধ অমান্য করায় ৫৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি  গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে ওয়ারীতে, ১১৭ জন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৮১ জনকে দেওয়া হয়েছে সাজা। ২৬ দোকান গুনেছে ৪৫ হাজার ৫৫৭ টাকা জরিমানা।

এদিকে র‌্যাব জানিয়েছে, সারা দেশে তারা ১৫৭টি টহলদল এবং ১০৮টি তল্লাশিচকি পরিচালনা করেছে। এ ছাড়া ৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৮২ জনকে এক লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

সমন্বয় সেল : এদিকে লকডাউন পরিস্থিতি তদারক করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে। তদারকদলের নেতৃত্বে আছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন) শেখ রফিকুল ইসলাম। জননিরাপত্তা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একজন করে যুগ্ম সচিব এবং সশস্ত্র বাহিনীর একজন কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে ওই দলে রয়েছেন। এই দলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সরকার যেভাবে চেয়েছিল, প্রথম দিনের লকডাউনে তার প্রতিফলন ঘটেছে। আগামী দুই দিন সরকারি ছুটি। সব মিলিয়ে পুরো সপ্তাহ এভাবে চালানোর ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। তবে প্রথম দিনের পরিস্থিতিতে সরকার সন্তুষ্ট।’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সর্বাত্মক লকডাউনের বিষয়ে কোনো জায়গায় যাতে ছাড় না দেওয়া হয় সে ব্যাপারে গত বুধবারই সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর পরও যেসব এলাকায় সমস্যা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে—বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পঘন এলাকায় বেশি নজর রাখা হচ্ছে। এর বাইরের এলাকাগুলোতে যেকোনো ধরনের সমস্যা ঠাণ্ডা মাথায় সমাধান করতে বলা হয়েছে। কড়াকড়িভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের বিষয়ে বুঝে-শুনে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

রাজধানীর বাইরের ছবি : চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় লকডাউন বাস্তবায়নে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের কড়াকড়ি অবস্থান নিতে দেখা গেছে। দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর ব্যস্ততম নিউ মার্কেট এলাকায় পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়েছে অনেকেই। অকারণে গাড়ি নিয়ে বের হওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। চকবাজার এলাকায় দেখা গেছে, সেনা সদস্যরা ঘর থেকে বের হওয়া মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। অভিযানের সময় কঠোরতা দেখালেও মাস্ক বিতরণে উদারতা দেখিয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।]ং



সাতদিনের সেরা