kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩০ জুলাই ২০২১। ১৯ জিলহজ ১৪৪২

চুয়াডাঙ্গা ও খুলনা

হাসপাতালে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’

মানিক আকবর, চুয়াডাঙ্গা ও কৌশিক দে, খুলনা   

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হাসপাতালে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’

সীমান্ত জেলা চুয়াডাঙ্গায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আক্রান্তদের পাশাপাশি উপসর্গ নিয়েও হাসপাতালে আসছে অনেকে। তবে হাসপাতালে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ অবস্থা। জটিল রোগীদের চুয়াডাঙ্গা থেকে রাজশাহী, খুলনা বা ঢাকায় পাঠানো ছাড়া কোনো উপায় থাকছে না। অন্যদিকে খুলনার অবস্থাও খুবই খারাপ। জেলা বা নগরই নয়, পুরো বিভাগেই প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুতে রেকর্ড হচ্ছে। কভিড চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে শয্যা খালি নেই বললেই চলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

গত বুধবার রাতে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৪১ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪১ জনই পজিটিভ রেজাল্ট এসেছে। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার শতভাগ। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার আগের রাতে তথ্য সংশোধন করে সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, সর্বশেষ ১১০ জনের নমুনার মধ্যে ৪১ জন আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালটি ২০০৩ সালে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বেড বাড়লেও লোকবল বাড়েনি। গত বছর করোনার সংক্রমণ দেখা দিলে হাসপাতালের পাশের নতুন ভবনটিকে ১৫০ শয্যার করোনা ইউনিট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগটি নিয়ে যাওয়া হয় নতুন ভবনে। করোনা ইউনিটের জন্য কয়েকজন চিকিৎসক নিয়োগ হলেও নার্স, আয়া এবং অন্য কর্মী বাড়ানো যায়নি; বরং ১০০ শয্যায় উন্নীত হওয়া মূল হাসপাতাল থেকে করোনা ইউনিটে পাঠাতে হয় অনেক নার্স ও কর্মীকে। এতে সংকট হয়ে পড়ে আরো তীব্র। করোনার কারণে হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাও ব্যাহত হচ্ছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া বেশির ভাগ রোগীর অভিযোগ, এ হাসপাতালে চিকিৎসার কোনো সুযোগ নেই। ভালো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। বেড পাওয়া যায় না। হাসপাতালের মেঝেতে থাকতে হয়।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা ফুলবাড়ী গ্রামের আক্কাস আলী বলেন, ‘আমার পেটে ব্যথা। সকালে এসেছি। এখনো ডাক্তার দেখাতে পারলাম না। আমার কোনো টাকা-পয়সা নেই। কোনো ক্লিনিকেও যেতে পারছি না।’

হাসপাতালের ভেতরে অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে অপেক্ষায় থাকা এক যুবক নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘এখানে কোনো চিকিৎসা হয় না। মাঝেমধ্যেই আমি এখান থেকে রোগী নিয়ে রাজশাহী কিংবা ঢাকায় যাই।’

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম বলেন, ‘হাসপাতালের ফ্লু কর্নারে রোগী বাড়ছে। সকাল থেকে ওখানে ভিড় লেগে থাকে। ওখানকার সব রোগীই সর্দি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আসছে।’

চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিক্যাল অফিসার ডা. আওলিয়ার রহমান বলেন, গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালের কভিড রোগীদের জন্য নির্ধারিত রেড জোনে ৬১ জন ভর্তি ছিল। এ ছাড়া ইয়েলো জোনে উপসর্গ নিয়ে আরো ৮৫-৯০ জন ভর্তি ছিল। এ পর্যন্ত আক্রান্ত দুই হাজার ৮৭৩ জন। বর্তমানে সক্রিয়  রোগী আছে ৬৯৭ জন। প্রতিদিন রোগী বাড়ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। 

নানা সংকটের কথা স্বীকার করেন সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান। তিনি বলেন, এমনিতেই ৫০ শয্যার লোকবল নিয়ে ১০০ শয্যায় উন্নীত হওয়া হাসপাতালের চিকিৎসাকাজ চালাতে হয়। তার ওপর করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় অনেককে করোনা ওয়ার্ডে পাঠাতে হয়েছে। দুদিক সামাল দিতে গিয়ে আসলে অসুবিধা হচ্ছে। করোনার জন্য ১০ জন চিকিৎসক পেয়েছিলাম। একজন বদলি হয়েছেন। এখন আছে ৯ জন। তা নিয়ে চলছি। তবে নার্স, আয়া ও কিছু কর্মী সংকট রয়েছে। এসব নিয়েই চিকিৎসাব্যবস্থা চালাতে হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, জেলায় করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। এরই মধ্যে দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলা, চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকা ও আলুকদিয়া ইউনিয়নে লকডাউন দেওয়া হয়েছে। দামুড়হুদা উপজেলা এলাকায় সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে।

খুলনায় তিন হাসপাতালেও ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই

গত প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে খুলনায়। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে বিভাগে করোনায় আরো ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে বিভাগে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৯১৭ জন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানা এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। এই সময়ে জেলার করোনা হাসপাতালে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১৩০ শয্যা করোনা ডেডিকেটেড ইউনিট রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। কম্পানির লোকদের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে ওষুধ ক্রয়, বাইরে থেকে পরীক্ষা করানো, রেডজোন-ইয়েলো জোন মিলিয়ে ফেলারও অভিযোগ তাদের। অবশ্য এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ কথা বলতে চাননি। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রোগীর স্বজন জানায়, হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে। রোগী ভর্তি এ ধরনের যুদ্ধ। কিন্তু তারপর নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। এখানে তেমন ওষুধ না থাকায় বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। কোনো কোনো পরীক্ষা বাইরে থেকেও কেউ কেউ করছে। এখানে প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। 

খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল (ইউনিট), খুলনা জেনারেল হাসপাতাল ও বেসরকারি গাজী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্ররা জানান, গেল ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আরো ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এরই মধ্যে ডেডিকেটেড হাসপাতালে একজন, জেনারেল হাসপাতালে দুজন ও গাজী মেডিক্যালে তিনজন মারা যায়।

খুলনা করোনা হাসপাতালের ফোকালপার্সন ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা হাসপাতালে রেডজোনে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৩২ জন, আবার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৭ জন। আর আইসিইউতে রয়েছে ১৯ জন। গতকাল সকাল পর্যন্ত খুলনার ১৩০ শয্যার করোনা হাসপাতালে ১৪৮ জন চিকিৎসাধীন।

খুলনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হলেন নড়াইল কালিয়ার দীন মোহাম্মদ (৮০) ও বাগেরহাটের গোয়ালখালীর সুলতান হাওলাদার (৬৫)। এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৬৫ জন, গত ২৪ ঘণ্টায় একজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। ডা. রাশেদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

অন্যদিকে বেসরকারি গাজী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. গাজী মিজানুর রহমান জানান, করোনা ইউনিটে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা ১০০ শয্যার মধ্যে ৯৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছে; এর মধ্যে আইসিইউতে পাঁচজন ও এইচডিইউতে রয়েছে ৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১১ জন, এ সময়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৩০ জন।

ওদিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ সাতজন, যশোরে পাঁচজন, ঝিনাইদহে তিনজন, চুয়াডাঙ্গায় দুজন, সাতক্ষীরায় দুজন এবং মেহেরপুরে একজন মারা গেছে।

খুলনা বিভাগের মধ্যে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় চুয়াডাঙ্গায় গত বছরের ১৯ মার্চ। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছে ৪৮ হাজার ৭৯৫ জন। আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১৬ জনে। এ সময় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৫ হাজার ৬৭৬ জন। বিভাগে গত বুধবার এক দিনে সর্বোচ্চ ৩২ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।