kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টায় ঢিলে ভাব

► দূরপাল্লার বাস ও ট্রেন বন্ধ থাকলেও চলছে ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যান
► মানুষের যাতায়াত থামছে না, রোগীর বেশে অ্যাম্বুল্যান্সে ঢুকছে ঢাকায়
► রাজধানীর প্রবেশমুখে জনস্রোত

কালের কণ্ঠ ডেস্কf   

২৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টায় ঢিলে ভাব

পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ গতকাল রাত ১২টা থেকে রাজধানীর সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ খবর অনেকের কাছেই ছিল অজানা। তাই কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে গতকাল ফিরে গেছে অনেকেই। ছবি : কালের কণ্ঠ

আশপাশের সাত জেলায় লকডাউন দিয়ে মূলত ঢাকা শহরকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করছে সরকার। এই লকডাউনের আওতায় দূরপাল্লার বাস ও ট্রেন বন্ধ। কিন্তু তাতে বিভিন্ন জেলা থেকে সড়কপথে লোকজনের আসা-যাওয়া বন্ধ হয়নি। সাত জেলার লকডাউন পরিস্থিতি গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দিনেও ছিল অনেকটা ঢিলেঢালা। রাস্তায় গণপরিবহন ছাড়া সব ধরনের যান চলেছে। গন্তব্যে যেতে হচ্ছে ভেঙে ভেঙে। এতে একদিকে সময় যেমন বেশি লাগছে, অন্যদিকে খরচও বেড়েছে কয়েক গুণ। অফিসগামী লোকজন ও পোশাককর্মীরা পড়েছেন ভোগান্তিতে। আষাঢ়ের হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি তাঁদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে।

করোনা সংক্রমণ বাড়ায় দেশের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকে লকডাউন চলছে। ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন রাখতে গত মঙ্গলবার থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আশপাশের সাত জেলায় লকডাউন দেওয়া হয়েছে।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

রাজধানীর প্রবেশমুখে জনস্রোত : ঢাকা জেলায় লকডাউন না থাকায় সাভারে বাস চলাচল করছে। সাভারের বাস আমিনবাজার সেতুর পশ্চিম প্রান্তে এবং ঢাকা মহানগরের বাস সেতুর পূর্ব প্রান্তে গাবতলীতে আটকে দিচ্ছে পুলিশ। যাত্রীদের সেতু হেঁটে পার হতে হচ্ছে।

মাগুরার শ্রীপুর থেকে ঢাকায় আসা যুবক মহিবুল হাসান তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্রীপুরের নাকোল বাজার থেকে ৫০০ টাকায় মোটরসাইকেলে এসেছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আরো অনেকের সঙ্গে ২০০ টাকা দিয়ে পদ্মা পার হয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে আসেন। সেখান থেকে আবার ৫০০ টাকায় মোটরসাইকেল ভাড়া করে এসেছেন সাভারের নবীনগর। পরে নবীনগর থেকে বাসে এসেছেন আমিনবাজার, ভাড়া নিয়েছে ১০০ টাকা। তিন বলছিলেন, স্বাভাবিক সময়ে যে পথ আসতে তাঁর ৩৫০ টাকা খরচ হতো, সেখানে তাঁর লেগেছে এক হাজার ৩০০ টাকা।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে তিনজনের পরিবার নিয়ে ঢাকার উত্তরায় এসেছেন সোলায়মান খান। সঙ্গে এক বস্তা আম ও কাঁঠাল। সারিয়াকান্দি থেকে বগুড়া শহরে এসেছেন স্থানীয় পরিবহন ভটভটিতে। বগুড়া থেকে বাসে এসেছেন গাজীপুরের চন্দ্রার মোড়ে। সেখানে পুলিশ বাস আটকে দিলে বাস ছেড়ে অটোরিকশায় করে আবদুল্লাহপুর স্লুইস গেট এলাকায় এসে নামেন।

মহাসড়কে মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুল্যান্স বেশি দেখা গেছে। অ্যাম্বুল্যান্সগুলোতে বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীবেশে যাত্রী প্রবেশ করছে ঢাকায়। আবার কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও ট্রাকে যাত্রী আসা-যাওয়া করেছে।

আবদুল্লাহপুরে কর্মরত পুলিশ সার্জেন্ট হাবিব আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাড়ি ধরলেই বলে রোগী। চিকিৎসাপত্রও দেখায়। হঠাৎ করে দেশে এত রোগী বেড়ে গেল কিভাবে তাই ভাবছি।’

টঙ্গী ব্রিজ প্রান্তে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন জামালপুরের সাবির হোসেন, ময়মনসিংহের ফুলপুরের আকলিমা বেগম ও তাঁর স্বামীসহ বেশ কয়েকজন। তাঁরা সবাই জানালেন, জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় এসে আটকা পড়েছেন। অনেকের কাছে ঢাকায় বাড়তি সময় থাকার মতো টাকা নেই। তাই যেকোনোভাবে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন।

রাজধানী থেকে গাজীপুর ও টঙ্গী পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করে যথাক্রমে ভিআইপি ২৭ ও ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের বাস। আজিমপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া ভিআইপি ২৭ পরিবহনের বাসগুলোকে পুলিশ আব্দুল্লাহপুর থেকেই ফিরিয়ে দিচ্ছিল। আর সরদরঘাট এলাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত যাতায়াত করা ভিক্টর ক্লাসিক বাসের চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এখন আব্দুল্লাহপুর পর্যন্তই যাত্রী তুলছেন।

তবে নারায়ণগঞ্জ রুটের মৌমিতাসহ অন্য বাসগুলো সাইনবোর্ড পর্যন্ত যাচ্ছে। ফুলবাড়িয়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখান থেকে সহজেই চিটাগাং রোড পর্যন্ত যাওয়া যাচ্ছে।

সাত জেলায় লকডাউন পরিস্থিতি : মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন প্রবেশমুখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চেকপোস্ট বসালেও অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে অবাধে চলছে সাধারণ মানুষ। শপিং মল, দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশনা থাকলেও নিয়ম মানছে না অনেকেই। সদরের ধলেশ্বরী নদীর ওপর মুক্তারপুর ব্রিজের মুখে পুলিশ ব্যারিকেড বসালেও হেঁটে ব্রিজ পার হয়ে লোকজন অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনে চড়ে গন্তব্যে যাচ্ছে। লৌহজং শিমুলিয়া ঘাট হয়ে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও মাঝিকান্দি নৌ রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকলেও সচল ছিল ফেরি। এতে শুধু কাঁচামাল, পণ্যবাহী গাড়ি ও জরুরি রোগীবাহী গাড়ি পার করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শত শত যাত্রী ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দেয়। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাস না চললেও অটোরিকশায় লোকজন ভেঙে ভেঙে শিমুলিয়া ঘাটে আসছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শুকলালহাটে চেকপোস্ট বসিয়ে ঢাকামুখী বাসগুলোকে ঠেকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াতকারী দূরপাল্লার বাসে বহু যাত্রী এসে নারায়ণগঞ্জের মেঘনা-গজারিয়া এলাকায় ও ভুলতা-গাউছিয়া এলাকায় নামছে। এরপর অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানে, মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কারে করে তারা ঢাকায় ঢুকছে। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড পর্যন্ত আসা অনেক বাস ফেরত পাঠিয়ে দেয় প্রশাসন। জেলায় মোট ৩০টি পয়েন্টে পুলিশ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

মতিঝিলের একটি বেসরকারি কম্পানির কর্মী আতিকুর রহমান সাইনবোর্ড থেকে হেঁটেই কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে থাকা তাঁর মতো ঢাকায় চাকরি করা মানুষদের দুর্ভোগের শেষ নেই। একদিকে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া, অন্যদিকে বৃষ্টি। বাধ্য হয়ে তাঁর মতো অনেকে হেঁটে যাচ্ছেন।

মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা শহরসহ সাভার, নবীনগর, ধামরাই, আশুলিয়া ও গাজীপুরে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করে। তাদের বেশির ভাগই গার্মেন্টকর্মী। কর্মস্থলে পৌঁছতে তাদের তিন থেকে চারবার গাড়ি বদল করতে হচ্ছে। প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসেও গাদাগাদি করে গাবতলী পর্যন্ত যেতে লাগছে ৩০০-৪০০ টাকা।

গতকাল নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ অভিযানে পাঁচ দোকানিকে দোকান খোলা রাখায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রাজবাড়ী সদর, বালিয়াকান্দি, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বেশ কয়েকজনকে মোট ১৪ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা করেন। ১৭টি মামলাও করা হয়েছে।

অন্যান্য জেলায় লকডাউন : নাটোরের আটটি পৌরসভায় গতকাল সকাল থেকে ২৯ জুন সন্ধা ৬টা পর্যন্ত সর্বাত্মক লকডাউন বলবৎ হয়েছে। বাগেরহাটে সাত দিনের লকডাউন বলবৎ হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় চলমান ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত করা হয়েছে। নওগাঁ ও চাঁপাইগঞ্জেও লকডাউন এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে।

যশোরের মণিরামপুরে গতকাল ছিল লকডাউনের প্রথম দিন। সকাল থেকে লকডাউন কার্যকর করতে থানা পুলিশকে ব্যাপক তৎপর থাকতে দেখা গেছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখায় ১৩ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বেনাপোল এলাকায় লকডাউন এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে।

শেরপুর সদর উপজেলায় আরো এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। সাতক্ষীয়ায় লকডাউনের ১৯তম দিনেও ছিল ঢিলেঢালা ভাব। শহরের বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ থাকলেও হাট-বাজারগুলোতে মানুষের ভিড় ছিল লক্ষণীয়।

 



সাতদিনের সেরা