kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

এনআইডি নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা

► টেবিল-চেয়ার না যে উঠিয়ে নিয়ে গেলাম : সিইসি
► এনআইডি সেবা যথাস্থানে আসছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এনআইডি নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কার্যক্রম নির্বাচন কমিশন থেকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কিভাবে নেওয়া হবে, নতুন করে এ জন্য অবকাঠামো ও জনবল প্রস্তুত করতে হবে কি না এবং কবে নাগাদ এ কাজ সম্পন্ন হবে—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে অন্ধকারে। জনমনেও নানা প্রশ্ন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা গতকাল বুধবার বলেছেন, ‘এই সেবাটি টেবিল-চেয়ার না যে উঠিয়ে নিয়ে গেলাম। এটা নিয়ে আলোচনায় বসে সমাধানে পৌঁছতে হবে।’

অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘এনআইডি নিয়ে যেসব কথা হচ্ছে তা অবান্তর। জেনেবুঝেই এনআইডি সেবাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হচ্ছে। এখানে সবার মতামত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নেওয়া হয়েছে। এনআইডি সেবা যথাস্থানে আসছে।’ গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর পুরান ঢাকার পুরনো কারাগার কনভেনশন হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।

বিষয়টি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানাতে গতকাল ইলেকশন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা নির্বাচন কমিশনার  মো. রফিকুল ইসলাম ও বেগম কবিতা খানমের সঙ্গে দেখা করেন।

মো. রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোটার তালিকার উপজাত হিসেবে এনআইডি প্রস্তুত করা হয়েছিল। ২০০৮-০৯ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এর কর্তৃপক্ষও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে সেটা বাতিল হয়ে যায়। ২০১০ সালে আইন প্রণয়ন করে এটা নির্বাচন কমিশনের অধীনেই রাখা হয়। এখন সরকার এটা অন্য কাউকে দিতে চাইলে আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু এর জন্য কারিগরি সহায়তা, আলাদা অবকাঠামো—এগুলো তৈরি করতে হবে। আলাদা জনবল লাগবে। এনআইডির জন্য তো নির্বাচন কমিশনের আলাদা কোনো অবকাঠমো ও জনবল নেই। এসব বিষয় আমাদের কাছে, আমাদের নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে অস্পষ্ট। এই সেবা নির্বাচন কমিশন থেকে সরাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কী ধরনের প্রস্তাব এসেছে, তা ব্যক্তিগতভাবে আমি জানি না।’

এদিকে গতকাল রাজধানীর নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) মেডিক্যাল ক্যাম্পের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘এ নিয়ে অলোচনার সুযোগ আছে। কারণ এটা তো অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। কিভাবে নেবে না নেবে এ বিষয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। এটা তো টেবিল-চেয়ার না যে উঠিয়ে নিয়ে গেলাম।’ এনআইডি সেবা চলে গেলে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে কি না জানতে চাইলে সিইসি বলেন, ‘আমাদের অসুবিধা হবে। এটা অন্যের অধীন হওয়ার আগে নিশ্চয়ই সচিব পর্যায়ে এ বিষয়ে কথাবার্তা হবে। আমাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো তাদের জানাব।’ 

‘কমিশন থেকে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তার জবাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আপনাদের কী জানিয়েছে’—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তারা শুধু বলেছে যে আগের সিদ্ধান্তেই আছে। এটার ওপর অনেক কাজ। আমাদের সঙ্গে উনারা বসবেন, তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা তো আমাদের অবস্থান অনেক আগেই বলেছি।’

সিইসি বলেন, ‘এই সেবা সরকারের কাছে নিয়ে যাওয়ার বিষয় চূড়ান্ত হয়েছে, এ রকম বলা যায় না। তারা নিতে চায় আমরা দেব না, এ রকমও বলা যায় না। আমাদের বসতে হবে তাদের সঙ্গে—এটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কথা। আমাদের যে অবস্থান আছে সেটা তাদের বোঝাব। সিদ্ধান্ত কী হবে তখন দেখা যাবে। আগে বলা যাবে না।’ কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্যাবিনেট তো আমাদের কাছে উচ্চ পর্যায়। ক্যাবিনেট থেকে আমরা চিঠি পেয়েছি। তাদের আমরা উত্তর দিয়েছি। আমরা এই পর্যায়ে আছি।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ কথা তো আমি বলেছি অনেকবার যে কমিশন চায় এনআইডি আমাদের কাছে থাকুক।’

সিইসি বলেন, ‘সরকারের অবশ্যই কিছু যুক্তি আছে, আমাদেরও কিছু যুক্তি আছে; এগুলো নিয়ে সংলাপ হবে। তাদের বক্তব্য হলো, এই সেবা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকে না এবং সেই যুক্তিটা ঠিক। আসলে অন্য কোনো দেশে এটা থাকার বিষয় না। আর আমাদের যুক্তি হলো, এ কাজটা আমাদের অনেক পরিশ্রমের ফসল। এ কাজটা করার জন্য আমাদের কয়েক হাজার নিবেদিত কর্মী তৈরি হয়েছে এবং তাঁরা অত্যন্ত পেশাদার-দক্ষ। এত দিনের ভুল-ভ্রান্তি শেষে, সব পেরিয়ে অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের প্রযুক্তিসম্পন্ন কাজ তাঁরা তৈরি করতে পেরেছেন। এটার জন্য নির্বাচন কমিশন গর্ববোধ করে। তারা এ জন্য আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলেছিলাম যে এতগুলো লোক আবার তৈরি করা, আবার ১২ বছর ঘুরে অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু তাদের যুক্তি হলো, সরকারের জিনিস তারা নিয়ে যাবে। আমরা বলি, আমরা সরকার না, কিন্তু সরকারের যখন যা দরকার হয়, তাদের চাহিদানুযায়ী আমরা তাদের সেসব সেবা দিতে পারি।’

সিইসি আরো বলেন, ‘আমাদের কাছে যেটা (চিঠি) পাঠিয়েছে,  সেটা হলো তারা নিয়ে যেতে চায়। আমাদের সঙ্গে তাদের কথা বলতে হবে। কিভাবে নেবে আলোচনা করতে হবে। সেখানে আমাদের আরো যে যুক্তি আছে, সেগুলো তুলে ধরব। এরপর সরকার কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে না নেবে, তা পরের কথা। এটা স্পর্শকাতর ইস্যু। এ নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। তারাই প্রস্তাব দেবে।’

এই সেবা ইসিতে রাখার সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা এখনই বলা যাবে না। আমাদের যুক্তি হলো, এ রকম অভিজ্ঞ লোকেরা এগুলো তৈরি করেছে। তাদের আবার নতুন করে তৈরি করতে হবে। আমাদের যে লোকগুলো আছে, তাদের মাধ্যমে সেবা যদি দিতে পারি তাহলে ভালো হবে। এটা আমাদের যুক্তি।’

সিইসি এর আগে গত ৩০ মে এনআইডি সেবা সরকারের অন্য সংস্থার হাতে গেলে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

প্রসঙ্গত, গত ১৭ মে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যক্রম ইসির পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে ন্যস্ত করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব বরাবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইসি সচিব ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিবের কাছে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে  নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে নানা যুক্তিসহ এক চিঠি দিয়ে জানানো হয়, এ সেবা নির্বাচন কমিশনের কাছে রাখাই সমীচীন হবে।

এরপর গত ২০ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকারকে একটি চিঠি পাঠিয়ে এনআইডি কার্যক্রম স্থানান্তরের নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে প্রতিপালনের জন্য বলা হয়।

 



সাতদিনের সেরা