kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

সংসদে গণতন্ত্র চর্চার সুবাতাস

► বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা সমালোচনায় সরব অনেক সদস্য
► সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করছেন সরকারি দলের সদস্যরা

নিখিল ভদ্র   

২৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সংসদে গণতন্ত্র চর্চার সুবাতাস

সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদ হবে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিয়মরক্ষার কার্যক্রমে পরিণত হয়েছিল সংসদ অধিবেশন। এই স্থবিরতার পর কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে সম্প্রতি। চলতি সংসদের আড়াই বছরের মাথায় চলতি অধিবেশনে অনেকটাই সরব ভূমিকা নিয়েছেন সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা। আইন প্রণয়ন, বাজেট প্রস্তাবসহ অন্যান্য আলোচনায় নানা ইস্যুতে সোচ্চার হয়েছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যরাও। ক্ষমতাসীন জোটের শরিক দলের সদস্যরাও সরকারের সমালোচনায় ছাড় দিচ্ছেন না। এমনকি সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্তকেও অধিবেশন কক্ষে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন সরকারি দলের সদস্যরা।

এবারের অধিবেশনে বাজেট আলোচনা ছাড়াও পাস হওয়া ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা বিল-২০২১’, ‘আয়োডিনযুক্ত লবণ বিল-২০২১’, ‘শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র বিল-২০২১’ ও ‘বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস বিল-২০২১’ নিয়ে আলোচনাকালে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাঁরা বিদেশে অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের লুটপাট বন্ধে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরেন। সরকারি দলের নেতাকর্মী ও আমলারা মিলে স্বাস্থ্য খাতে লুটপাট চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন। মদ-জুয়া ও ডিজে পার্টির সমালোচনা করে তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

অধিবেশনে বিরোধী বক্তব্যের জবাব দিতে সরব হন সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপিরা। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমালোচনাও করছেন তাঁরা। গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে সংসদে জনগণের দাবি তুলে ধরেছেন সরকারি দলের সদস্য এস এম শাহজাদা। তিনি বলেছেন, উপকূলের মানুষ এখন ত্রাণ চায় না, টেকসই বেড়িবাঁধ চায়।

একইভাবে মৃত্যুর পর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ইউএনওদের বিকল্প হিসেবে পুরুষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবকে চ্যালেঞ্জ করেছেন সরকারি দলের একাধিক সদস্য। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এ সিদ্ধান্তে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান। সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি ওই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেন, যাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাঁরা একদিন নারীদের গার্ড অব অনার দেওয়া যাবে না—এমন প্রস্তাবও করতে পারেন।

একই দিনে পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনার সুযোগ নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার বলেন, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এমন কারণ দেখিয়ে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ শুনে আমি বিস্মিত, হতবাক ও ব্যথিত। এ সিদ্ধান্ত যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি থেকে আসে, তা কিছুতেই বরদাশত করা যায় না।’ সিদ্ধান্তটিকে সংবিধানবিরোধী আখ্যায়িত করে তা বাতিলের দাবি জানান জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

সম্পূরক বাজেট পাসের আগে ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে বিরোধী দলের সদস্যরা অর্থপাচার বন্ধে ব্যর্থতা ও পুঁজিবাজারের অব্যবস্থাপনাসহ নানা অনিয়ম তুলে ধরেন। এরপর ১৪ জুন থেকে শুরু হওয়া সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তাঁরা অর্থপাচার বন্ধের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

ক্ষমতাসীন জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন স্বাস্থ্য খাত বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক নির্দেশে এই খাত পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, মানুষের জীবন রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক খবরদারির কারণে বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি। করোনা রোধের কার্যক্রম স্বাস্থ্য খাত বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক নির্দেশে পরিচালিত হওয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

জোটের আরেক শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সুশাসনের কোনো বালাই নেই। এ খাতে শুধু দুর্নীতির খবর। তাদের বরাদ্দ অপ্রতুল। প্রাপ্ত বরাদ্দও খরচ করতে পারে না। যেটুকু খরচ করেছে তাতে দুর্নীতির বদনাম কামিয়েছে।

বিএনপির মো. হারুনুর রশিদ বলেন, দুর্নীতির কারণে আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত। ব্যাংকের অর্থ লুট হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। পুঁজিবাজার আইসিইউতে চলে গেছে। কেনাকাটায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্নীতির ডিপো। স্বাস্থ্য বিভাগকে সংস্কারের আওতায় আনতে হবে।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, আর্থিক খাতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্ব সঠিক। কর্তৃত্ব দুর্বল। ব্যাংকে কর্তৃত্ব নেই। কর্তৃত্ব না থাকলে অবাধে এসব হবে। এক ব্যাংকের পরিচালক আরেক ব্যাংকের টাকা নিচ্ছে। টাকা নিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশ পাঠাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর কোনো কর্তৃত্ব নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নান বলেন, স্বাস্থ্য খাত মানুষের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। করোনাকালে এ খাতের অনেক অনিয়ম ও অসংগতি জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। চলতি অর্থবছরে এডিপির টাকা খরচে সবচেয়ে হতাশার চিত্র দেখা গেছে।

জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আফজাল-মালেকরা অনিয়ম করছে রূপকথার গল্পের মতো। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এখন কিছুটা কমেছে। কিন্তু তাঁদের থামানো যাচ্ছে না। এখানে অনেক মালেক, আফজালের ছড়াছড়ি। একজন মহিলা উপসচিবের কানাডাসহ তিনটা দেশে বাড়ি আছে। দুর্নীতিবাজ আমলাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিএনপির রুমিন ফারহানা বলেন, ব্যাংক কম্পানি আইন সংশোধন করে পরিবারের হাতে ব্যাংক তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জনগণের টাকার হরিলুট হচ্ছে। সংসদে ঋণখেলাপির তালিকা দেওয়া হলো। তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো?

সংসদে এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। তাঁরা মনে করছেন, দেরিতে হলেও সরকার ও বিরোধী দল সংসদকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। যে কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যুতে সংসদে প্রাণবন্ত আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনার আলোকে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেই সেটা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক হবে।

এ বিষয়ে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের থেকে সংসদ এখন কার্যকর ও প্রাণবন্ত। একসময় বিরোধী দলের সদস্যরা আলোচনার সুযোগ পেতেন না। তাঁদের মাইক বন্ধ করে দেওয়া হতো। এখন সেই সংকট নেই। বিরোধী দলের সদস্যরাও যেকোনো ইস্যুতে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। সরকারি দলের সদস্যরাও বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা আলোচনা করছেন। এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের অভাব পূরণ করেছে জাতীয় পার্টি। আগের মতো সরকারের বিরোধিতার নামে অধিবেশন কক্ষে গালাগাল ও ফাইল ছোড়াছুড়ি নেই। বরং বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের ইতিবাচক কাজের প্রশংসা করছে বিরোধী দল। বিরোধী দল দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে।

স্বল্প সংখ্যক সদস্য নিয়ে সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা মো. হারুনুর রশিদ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সরকার গণতন্ত্রকে একেবারেই সংকুচিত করেছে বলতে পারেন। কোথাও কথা বলার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের সংকটগুলো নিয়ে আমরা সংসদে কথা বলার চেষ্টা করছি। যদিও করোনাকালে সব সদস্যের অধিবেশনে যোগদানের সুযোগ নেই। তার পরও সাধারণ আলোচনা, বিল পাস, নোটিশসহ বিভিন্ন বিধিতে আলোচনার সুযোগ নিয়ে জনগণের কথাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।’ তিনি আরো বলেন, সংসদে যাঁরা প্রধান বিরোধী দলে আছেন তাঁরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে সংসদ আরো বেশি কার্যকর হতো। কিন্তু তাঁরা ক্ষমতাসীন মহাজোটের অংশ। তাঁরা সেই ভূমিকা রাখছেন না।

‘পাতানো বিরোধী দল’ দিয়ে সংসদ কতটুকু কার্যকর করা সম্ভব হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আনুগত্যশীল বিরোধী দল কিছু বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে। যাতে জনগণ বোঝে বিরোধী দল আছে। কিন্তু তাঁদের বক্তৃতার মাধ্যমে বাস্তবিক অর্থে কোনো পরিবর্তন আসবে না। সরকার যেটা চাইবে সেটাই হবে। আর তাঁরা বাজেট বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আলোচনাও করছেন না। রাজনৈতিক বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচনা করছেন। যেটা এক ধরনের স্টান্টবাজি।’

ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ বলেন, ‘শুধু বিরোধী দল নয়, আমরাও সংসদে আলোচনা করছি। এখন প্রয়োজন সংসদে প্রস্তাবের আলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সেটা হলেই সংসদ আরো বেশি কার্যকর হবে। যেমন—বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যয় নিশ্চিত করা জরুরি। আবার আইন পাসের পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগ দরকার।’

গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে সংসদে বক্তৃতার বিষয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা বলেন, ‘সারা দেশেই সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। আমার নির্বাচনী এলাকায়ও উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু বেড়িবাঁধ না হলে এই উন্নয়ন টিকবে না। তাই জনগণ টেকসই বেড়িবাঁধ দাবি করেছে। আমি জনগণের দাবিটিই সংসদে তুলে ধরেছি। জনগণের বুকে ঝোলানো প্ল্যাকার্ড সংসদে দেখিয়েছি।’

প্রসঙ্গত, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান চলতি অধিবেশনে বাজেট নিয়ে আলোচনায় যা হয়েছে তাকে ‘এক ধরনের নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন সম্প্রতি। তিনি বলেছেন, ‘এ আলোচনা মূলত এক ধরনের নাটক। সংসদ সদস্যরা নিজেদের এলাকার প্রকল্প দাবি করেন। প্ল্যাকার্ড নিয়ে সংসদে কথা বলেন। যা বাজেটে কোনো প্রভাব ফেলে না।’



সাতদিনের সেরা