kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

ভারতে নারীপাচারে জনপ্রতিনিধি জড়িত!

চক্রের সমন্বয়ক নদীসহ গ্রেপ্তার সাতজনকে চার দিনের রিমান্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভারতে নারীপাচারে জনপ্রতিনিধি জড়িত!

বছরখানেক আগে মাদকাসক্ত এক ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন আন্তর্জাতিক নারীপাচারকারী চক্রের অন্যতম সদস্য নদী আক্তার ওরফে ইতি ওরফে নুরজাহানের কাছে। এরপর ওই নারীকে টিকটক মডেল বানানোর লোভ দেখিয়ে পাচার করা হয় ভারতে। এভাবে গত কয়েক বছরে আরো অনেক নারীকে ভারতসহ অন্য দেশে পাচার করেছে নদী ও তাঁর চক্রের সদস্যরা।

গ্রেপ্তার নদীসহ এই চক্রের সাতজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের ভাষ্য মতে, যশোরের শার্শা এলাকার একাধিক জনপ্রতিনিধিরও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে নারীপাচারে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এই সাতজনের প্রত্যেককে চার দিন করে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। এর আগে গত সোমবার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যশোরের শার্শা থানার পাঁচভুলট, বেনাপোল থানার পুটখালী এবং নড়াইল শহরের ডহর রামসিদ্দি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

অন্যরা হলো নদীর সহযোগী আল আমিন হোসেন, সাইফুল ইসলাম, আমিরুল ইসলাম, পলক মণ্ডল, তারিকুল ইসলাম ও বিনাশ শিকদার।

পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, হাতিরঝিল থানায় দায়ের মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাতজনকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদা আক্তারের আদালত চার দিন করে রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন। পাচারের পর ভারত থেকে পালিয়ে আসা একাধিক তরুণী মামলা করেছেন।

গতকাল সকালে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ বলেন, নদীসহ অন্যরা দীর্ঘদিন ধরে নারীপাচারে জড়িত। নারীপাচারকারী টিকটক হৃদয় বাবুর সঙ্গে নদীর যোগাযোগ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধু ভারতে নয়, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও নারীপাচারের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন নদী। হাতিরঝিল থানায় দায়ের দুটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, নদী ও তাঁর সহযোগীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচারের সঙ্গে যশোরের শার্শা এলাকার একাধিক জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তথ্য যাচাই-বাছাই ও তদন্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

শহিদুল্লাহ জানান, গ্রেপ্তার সাতজনের কাছ থেকে পাসপোর্ট, ভারতের আধার কার্ড, মোবাইল ফোনসেট, ভারতের সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পুলিশের তদন্তেও নদীর নাম উঠে এসেছে।

যেভাবে নারীপাচার চক্রে জড়ান নদী : ২০০৫ সালে সন্ত্রাসী রাজীব হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় নদীর। ২০১৫ সালে রাজীব বন্দুকযুদ্ধে মারা যান। ওই বছরই নদী পাচার হয়ে মালয়েশিয়া যান। পরে আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে নিজেই হাত মেলান। পরে পাচারচক্রের বাংলাদেশ অঞ্চলের সমন্বয়ক হন। তিনি ভারত, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ের পাচারচক্রের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করতেন। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নদীর ১০টির মতো নাম পাওয়া যায়।

জানা গেছে, পাচারের উদ্দেশ্যে আনা মেয়েদের যশোর সীমান্তে একটি বাড়িতে রাখা হতো। প্রত্যেক নারীর জন্য স্থানীয় এক ইউপি সদস্য এক হাজার টাকা করে নিতেন। পাচারকালে কোনো মেয়ে বিজিবির কাছে আটক হলে ওই ইউপি সদস্য আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নিতেন।

নদীকে জিজ্ঞাসাবাদকারী এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মুন্সীগঞ্জের মেয়ে নদী পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও কয়েকটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। পাচার করা নারীদের বিষয়ে তদারকি করতে দেশ-বিদেশে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। নিজেকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতেন বিভিন্ন মহলে। ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া হৃদয় বাবু, সাগর, আল আমিন, সবুজ বাবুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। ভারতে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে বাগিয়েছেন আধার কার্ড।

সম্প্রতি ভারতের বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশের এক তরুণীকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়। এর জেরে এই পাচারচক্র সামনে আসে। এরই মধ্যে নির্যাতনের ওই ঘটনায় বেঙ্গালুরু পুলিশ ‘টিকটক বাবু’ ওরফে ‘হৃদয় বাবু’সহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর এ পর্যন্ত ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছে চক্রের ১১ বাংলাদেশি ও এক ভারতীয়। এর মধ্যে ১০ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছে ১৮ জন। এর মধ্যে আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। হাতিরঝিল থানায় এ পর্যন্ত পাঁচটি মামলা হয়েছে।