kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ে পরিবারে বাড়ছে অপরাধ

রেজোয়ান বিশ্বাস ও মোবারক আজাদ   

২৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ে পরিবারে বাড়ছে অপরাধ

রাজধানীর কদমতলীতে মা-বাবা ও ছোট বোনকে খুনের পর জাতীয় জরুরি সেবার হটলাইন নম্বরে ফোন করে নিজেই পুলিশকে খবর দিয়েছেন এক তরুণী। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ বলছে, মা-বাবার ভুলে পারিবারিক অশান্তির কারণে এই তিনটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাটি আরেকবার পারিবারিক কলহ বা পারিবারিক পরিসরে কুৎসিত কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্রও সামনে নিয়ে এসেছে। শুধু রাজধানীর এই হত্যাকাণ্ডই নয়, এমন ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে যশোর, সিলেটেও ঘটেছে। রাজধানীতে অনৈতিক সম্পর্কের জের ধরে স্ত্রীর প্ররোচনায় স্বামীকে হত্যা ও লাশ টুকরা করে লুকিয়ে রেখেছিলেন মসজিদের ইমাম। এমন খুনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এসব ঘটনার জন্য নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে দায়ী করছেন সমাজবিদ, মনোবিদ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা।

এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজের সব কিছুতে এখন বিশ্বায়নের প্রভাব আছে। মানুষ পরিবর্তনের সঙ্গে মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে সমানভাবে ধরে রাখতে পারছে না। প্রযুক্তি, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কের ধারণা পাল্টে দিচ্ছে। অতীতেও নৃশংসতার ঘটনা ঘটেছে। তবে করোনা মহামারির মধ্যে এমন ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়েছে। করোনার প্রভাবে আয়-রোজগার কমে যাওয়া, বেকারত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ, গৃহবন্দি সময়ে আর্থ-সামাজিক, মানবিক ও মানসিক বিপর্যয়ও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এ জন্য সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের দায় রয়েছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। 

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত বছর সারা দেশে মোট হত্যাকাণ্ডের শতকরা ৪০ ভাগ হয় পারিবারিক কলহের কারণে। নিরপরাধ শিশুরাও স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের কারণে হত্যার শিকার হয়। দেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ জন। এর বেশির ভাগই পারিবারিক ও সামাজিক কারণে হচ্ছে। আর এর প্রধান শিকার হচ্ছে নারী ও শিশু।

পুলিশের এক পরিসংখ্যান বলছে, পারিবারিক কলহের জের ধরে সারা দেশে গত পাঁচ বছরে প্রায় ১১ হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যার মামলা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশে ২৫৫টি শিশু খুন হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ৫২ জন নারী ও শিশু পারিবারিক সহিংসতার বলি হয়েছে। এ ছাড়া করোনাকালে অর্থাৎ গত ১৫ মাসে শুধু ডিএমপির থানাগুলোতে প্রায় তিন হাজার নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে। আর গত পাঁচ বছরে খুনের মামলা হয়েছে এক হাজার ২০০টি। এসব হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশই পারিবারিক কলহ ও বিরোধের জের ধরে ঘটেছে।

এ ছাড়া দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত উপকমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বেশির ভাগ পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ফলে খুনখারাবিও বেড়ে যাচ্ছে।’

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. অনুপম সেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। কোনো আয়ের পথ খুঁজে না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে গৃহবন্দি থাকার ফলে তুচ্ছ কারণেও চাঞ্চল্যকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধ রুখতে সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের অনেক দায়বদ্ধতা আছে। করোনার জন্য সরকারের নির্ধারিত অনুদান যেন একান্তই প্রয়োজনীয় লোকজন পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সামাজিক পরিবর্তন, পারিবারিক মূল্যবোধ ও বন্ধন অনেকটা ভেঙে গেছে। আর মহামারির কারণে এটা আরো প্রবল আকারে ধারণ করেছে। মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে। ফলে অনেকে বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে অপরাধও বেড়ে গেছে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি ও অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাকালে অনেক মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ তার আর্থিক-সামাজিক নিরাপত্তা পাচ্ছে না। অনেকে উচ্চাভিলাষী চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির মিল খুঁজে পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা ছেলে-মেয়েদের উচ্চাভিলাষী চাহিদা তৈরি করে তা পূরণ করতে না পেরে তাদের অপব্যবহার করছেন। ফলে তুচ্ছ ঘটনায়ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি খন্দকার ফারজানা রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে মানসিক সমস্যাগুলো সেভাবে চিহ্নিত করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে যাই না। ফলে করোনা আসার পর থেকে সমাজের বিভিন্ন বিশৃঙ্খল পরিবেশ মানুষের মানসিক সমস্যা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল ওয়াহাব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে ধরনের অপরাধপ্রবণতা এখন দেখা যাচ্ছে, সে অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হলে, রাষ্ট্রকে সুশৃঙ্খল রাখতে হলে, বাসযোগ্য করতে হলে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে শক্ত করতে হবে। এর চর্চা করতে হবে। শুধু আইন দিয়ে সব কিছু হবে না। সব কিছুর ওপর সরকারের নজর থাকতে হবে। আবার আইনের শাসন সবার জন্য সমান করতে হবে।’ পারিবারিক কলহ রোধে সমাজের বিজ্ঞজন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।