kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

ইরানি বিটুমিন এলো ইরানি জাহাজেই, মাঝে তুঘলকি!

দুই আমদানিকারকের ১৯ হাজার ১৪০ ড্রাম খালাস

জয়নাল আবেদীন   

২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইরানি বিটুমিন এলো ইরানি জাহাজেই, মাঝে তুঘলকি!

উৎপাদন হয় ইরানে। রপ্তানিপ্রক্রিয়ায় নিযুক্ত চীনা কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠান। শুধু জাহাজ বদল ও লেবেল লাগানোর কাজটি হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই)। আর তাতেই বিটুমিনভর্তি ড্রামের গায়ে সিল মারা হয় ‘কান্ট্রি অব অরিজিন ইউএই’। এত দিন ঠিক এভাবেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আমিরাতের নাম দিয়ে আমদানি হয়ে আসছিল আমদানি নিষিদ্ধ ইরানের মানহীন বিটুমিন। এবার রাখঢাক না রেখে খোদ ইরানের পতাকাবাহী জাহাজেই তুলে দেওয়া হলো বিটুমিনের চালান। তা নির্বিঘ্নে খালাসও হয়ে গেল চট্টগ্রাম বন্দরে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)-২-এ ভেড়ে ইরানের পতাকাবাহী জাহাজ ‘নিগার’। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় জাহাজটির আইএমও নম্বর (৯১৬৫৮৩৯) ট্র্যাক করে দেখা যায়, গত শনিবার ১৯ জুন বিকেল পৌনে ৫টায় ‘নিগার’ চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করে। ছুটে যায় মালয়েশিয়ার কেলাং বন্দরের উদ্দেশে। ছেড়ে যাওয়ার আগে টার্মিনালে জাহাজটি থেকে খালাস করা হয় ১৯ হাজার ১৪০টি বিটুমিনের ড্রাম।

কারা কোথা থেকে আনল বিটুমিনের এই চালান—অনুসন্ধানে গিয়ে পাওয়া গেল আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি নথি। একটি নথিতে দেখা যায়, ১৩ হাজার ৬৪০টি বিটুমিনের ড্রাম এনেছে জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। দুই হাজার টনের এই বিটুমিনের ক্রয়মূল্য দেখানো হয় আট লাখ ৩২ হাজার ৩০১ মার্কিন ডলার। বাকি সাড়ে পাঁচ হাজার ড্রাম আনে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং (এনডিই) লিমিটেড। প্রায় এক হাজার টন ওজনের এই বিটুমিনের ক্রয়মূল্য উল্লেখ রয়েছে চার লাখ ১৭ হাজার ৮৫৫ ডলার।

নথিতে রপ্তানিকারক বন্দর হিসেবে ‘ইউএই’ উল্লেখ করা হলেও সূত্র বলছে, এসব বিটুমিনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ইরান থেকেই। উৎপাদনও সেই দেশে। মাঝে ইউএইতে সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের ডিপোতে যাত্রাবিরতি হয়েছে শুধু। এই বিরতিকালে এসব বিটুমিনের ড্রামে লেগেছে ‘মেড ইন ইউএই’ সিল।

জানা গেছে, এভাবেই আমিরাতের ভুয়া সিল দিয়ে হরহামেশা দেশে ঢুকছে ইরানের উৎপাদিত নিম্নমানের ভেজাল বিটুমিন। এই বিটুমিনের ব্যবহারে শীত-বর্ষা-গ্রীষ্ম সব কালেই সর্বনাশ হচ্ছে দেশের সড়কের।

আমদনি নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানের পণ্য খোদ ওই দেশের জাহাজে দেশে ঢোকার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরাও। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে দেশকে কোণঠাসা করে রাখতে পারে। আমদানি নিষিদ্ধ দেশের জাহাজ এবং ওই দেশের পণ্য এভাবে ঢুকতে থাকলে অর্থনৈতিকভাবে দেশে এর বিরূপ প্রভাবও পড়তে পারে।

সূত্র বলছে, সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে বিটুমিনভর্তি কয়েকটি জাহাজ। এর মধ্যে কিছু জাহাজের বিটুমিন খালাস হয়ে গেছে। সর্বশেষ গত রবিবার পিএইচপি গ্রুপ এবং ইলিয়াস ব্রাদার্সের ১১ হাজার টনের বেশি বিটুমিন পরীক্ষা ছাড়াই খালাস হতে দেখা গেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিটুমিনের জাহাজটি জব্দ করে রাখা সত্ত্বেও আটকে রাখা যায়নি। কৌশলে বন্দর থেকে কর্ণফুলী নদী হয়ে নিজেদের ডিপোতে নিয়ে যায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্সের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, গত এক বছরে অন্তত ৩০টি চালানে বিটুমিন আমদানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ চালানে আসা দুই হাজার টন বিটুমিন ইউএই থেকে রপ্তানি করেছে রাজ স্পেশালিটি কেমিক্যালস প্রাইভেট লিমিটেড। এটি মূলত ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। চেন্নাইয়ে এর প্রধান কার্যালয়। প্রতিষ্ঠানটি ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ইরান থেকে বিটুমিনের সোর্সিং করে থাকে। এ ছাড়া গ্রাহকের নির্দেশনা অনুযায়ী শুধু আমিরাত থেকে পুনঃ রপ্তানির কাজটিও করে দেয় তারা।

নথির তথ্যানুযায়ী, এনডিই লিমিটেডের বিটুমিন রপ্তানি করেছে হংকংভিত্তিক ‘রোসনার হোল্ডিং কম্পানি লিমিটেড’। অনুসন্ধানে দেখা যায়, হংকংয়ে প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি চীনের সাংহাই, ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডস ও ইথিওপিয়ায় এ কম্পানির কার্যালয় আছে। মজার তথ্য হলো, ইউএইতে কম্পানিটির কোনো কার্যালয়ই নেই। অথচ এনডিইর বিটুমিন আমদানির নথিতে এ কম্পানিকে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সময় আমদানিকারকরা পণ্য খালাসের জন্য দাখিলকৃত নথিতে কৌশলে বিটুমিনের উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ইউএইর নাম উল্লেখ করে আসছে। তবে ইউএইর বাংলাদেশ কনস্যুলেট সূত্র কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে, সেখানে বিটুমিনের কোনো কারখানা নেই, দেশটি বিটুমিন উৎপাদনই করে না। মূলত পাশের দেশ ইরান থেকে বিটুমিনের চালান সে দেশে ঢোকার পর সেগুলো রিফাইন হয়। এরপর তা বিভিন্ন দেশে পুনরায় রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। কনস্যুলেট সূত্র আরো জানায়, আবুধাবি, হামরিয়াহ উন্মুক্ত জোন, ফুজাইরাহ ও আজমানে রিফিলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

ইউএই সূত্র জানায়, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আমিরাতের বিভিন্ন বন্দরসংলগ্ন এলাকায় বিটুমিনের ডিপো স্থাপন করেছে। ইরানের উৎপাদিত বিটুমিন প্রথমে এসব ডিপোতে রাখা হয়। এরপর ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী প্যাকেজিং শেষে আবার রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

দুবাইভিত্তিক বিটুমিন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ইনফিনিটি জেনারেল ট্রেডিং এফজেডই-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে কালের কণ্ঠ। প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ব্যবস্থাপক টিনা তাঘাভি জানান, ইউএইর কোথাও তাঁদের বিটুমিনের কোনো প্লান্ট নেই। মূলত ইরান থেকে তাঁদের চাহিদামতো বিটুমিন আসেন। ইরানের আল আব্বাস পোর্ট থেকে বিটুমিনের জাহাজ সরাসরি এসে ভেড়ে ইউএইর জেবেল আলী পোর্টে। সেখানে ক্রেতার চাহিদানুযায়ী নতুন লেবেল লাগিয়ে তা পুনঃ রপ্তানি করা হয়। 

অন্যদিকে ইরানের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপ করেও জানা গেছে তাদের বিটুমিন বিক্রয়ের নানা বিষয়। ইরানের ইসফাহানের সেগঝি ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে অবস্থিত ইসফাহান বিটুমিন প্রডাকশন কম্পানির এক বিক্রয় কর্মকর্তা জানান, নিয়মিতই তাঁরা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বিটুমিন বিক্রি করে আসছেন। তবে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় সরাসরি তাঁর কম্পানি রপ্তানি করে না। তাই ক্রেতার দেশ বা সংশ্লিষ্ট বন্দরে বিটুমিনের চালান পৌঁছে দিতে তাঁদের দ্বারস্থ হতে হয় ইউএইভিত্তিক কোনো না কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের।

জানা গেছে, দিনের পর দিন আমিরাতের সিল দেওয়া ইরানের ভেজাল বিটুমিন খালাস হলেও মান পরীক্ষার বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। এ বিষয়ে কালের কণ্ঠে গত মাসে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমদানির বিটুমিন খালাসের আগে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। তবে প্রভাবশালী আমদানিকারকদের বিটুমিন আমদানির কৌশলের কাছে টিকছে না সরকারের প্রজ্ঞাপনও। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে মান পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। পরীক্ষা ছাড়াই কৌশলে খালাস হচ্ছে হাজার হাজার টন বিটুমিন।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার তোফায়েল আহমেদ দাবি করেছেন, বিটুমিন আমদানি নিয়ে সরকারের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে মান যাচাই করা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

এ ছাড়া বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা থাকা দেশ থেকে বিটুমিন আমদানি প্রসঙ্গে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘দেখুন এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না। এটা নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে। আর আমরা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিটুমিনের গুণগত মান যাচাই হচ্ছে কি না সেটা দেখেই বন্দর থেকে পণ্য খালাসের অনুমতি দিচ্ছি। এর বাইরে আমরা কিছু বলতে পারব না।’

 



সাতদিনের সেরা