kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

উন্নয়নে শেখ হাসিনা মডেল

বদলে যাচ্ছে ৫৪ লাখ মানুষের জীবন

► জানুয়ারিতে ঘর ও জমি পেয়েছে প্রায় ৭০ হাজার পরিবার
► আজ স্থায়ী ঠিকানা পাচ্ছে ৫৩ হাজার ৩৪০ পরিবার
► ডিসেম্বরে ঘরের চাবি পাবে আরো এক লাখ পরিবার

বাহরাম খান, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে   

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বদলে যাচ্ছে ৫৪ লাখ মানুষের জীবন

ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর বা জমি দেওয়ার জন্য বিশ্বের অনেক দেশে নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে। আবেদন করার পর যাচাই-বাছাইয়ের বিভিন্ন স্তর পার হয়ে সেই ঘর-জমি পেতে হয়, গুনতে হয় ঋণের কিস্তি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গরিব-অসহায় মানুষের মধ্যে যাদের জমি আছে, কিন্তু ঘর তৈরির সামর্থ্য নেই তারা বিনা মূল্যে ঘর পাচ্ছে। আর যাদের জমিটুকুও নেই তাদের দুটোই দেওয়া হচ্ছে কোনো খরচ ছাড়া। এতে স্থায়ী ঠিকানা পেয়ে পাল্টে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনমান। নতুন জীবনবোধ তাদের সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের পর মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে গরিব-অসহায় মানুষের জন্য বিশেষ কিছু করতে চাচ্ছিলেন। সে অনুযায়ী গত বছরের জুন মাসে সারা দেশে দুই শ্রেণিতে আট লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবারের তালিকা করা হয়। এই তালিকা ধরে পর্যায়ক্রমে ঘর দেওয়া শুরু করেছে সরকার। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি প্রথম পর্যায়ে ৬৯ হাজার ৯০৪টি পরিবারকে ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ রবিবার দ্বিতীয় পর্যায়ে একসঙ্গে ৫৩ হাজার ৩৪০টি পরিবারকে ঘরের চাবি বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

চলমান এই প্রকল্পে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে আরো এক লাখ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে বিনা মূল্যে জমিসহ ঘর দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প-২’ শিরোনামে। সারা দেশে মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে সরাসরি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, শেখ হাসিনা প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৯৭ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে গরিব-অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বর্তমান উদ্যোগে প্রায় ৯ লাখ পরিবার ঘর পাচ্ছে। এর আগে আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন উদ্যোগে হস্তান্তর করা হয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ ঘর ও ফ্ল্যাট। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এই উদ্যোগে উপকারভোগী পরিবার দাঁড়াবে পৌনে ১১ লাখে। প্রতি পরিবারে গড়ে পাঁচজন হিসাবে উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৫৪ লাখ।

আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের ঘর উদ্বোধনে আজ দেশের কয়েকটি উপজেলায় ভার্চুয়ালি ঢাকার গণভবন থেকে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সরকারের একাধিক উদ্যোগ থেকে গরিব-অসহায়, জলবায়ু উদ্বাস্তু, বেদে, জেলে, হিজড়া ও সমতলে থাকা ক্ষুদ্র্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। উল্লিখিত সব কার্যক্রমের উদ্যোগকে একত্র করে মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ হচ্ছে। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, গরিব মানুষকে ঘর করে দেওয়ার বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এর জন্য বাড়তি ব্যয় হচ্ছে না। একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নিজ নিজ বরাদ্দকৃত টাকার মাধ্যমে মহৎ এই উদ্যোগ এগিয়ে চলেছে।

এই প্রকল্পে গত জানুয়ারি মাসে ঘর পাওয়া শ্রীমঙ্গলের ভূমিহীন কৃষক আব্দুল খালেক গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করতেই কষ্ট হতো। পরের বাড়িতে ছাপরা ঘর বেঁধে থাকতাম।’ আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসা কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, ‘ছয় মাস আগে পাকা ঘর পেয়ে গেলাম। প্রধানমন্ত্রীকে কী বলে ধন্যবাদ দেব জানি না।’ পাশেই থাকা তাঁর স্ত্রী সাবিনা বেগম বলেন, ‘দুইটা মেয়ে। ভাবছিলাম মানুষের বাড়িতে কাজ করাই ওদের নিয়তি হবে। ঘর পাওয়ার পর মেয়েদের জন্য আমরা নতুন স্বপ্ন দেখতে পারছি। আগামী বছর বড় মেয়েকে স্কুলে পাঠাব। ছোট মেয়েকেও পড়াব।’

হবিগঞ্জের বাহুবলের কামাইচোর চা বাগানের শ্রমিক শ্যামল ভৌমিক এবার ঘর পাচ্ছেন। গতকাল তাঁর জন্য বরাদ্দকৃত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ছনের ঘরে থাকি। বর্ষাকালে সারা দিন কাজ করে রাতে বৃষ্টিতে ভিজতে হতো। এমন সুন্দর পাকা ঘর পাব জীবনেও ভাবিনি। সৃষ্টিকর্তা প্রধানমন্ত্রীর ভালো করুক।’

মৌলভীবাজারের ডিসি মীর নাহিদ আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ভূমিহীন একটি পরিবার যখন কয়েক লাখ টাকা দামের পাকা ঘর ও জায়গা পায়, তখন তাদের জীবন সত্যিই বদলে যায়। এটা তাদের জীবনে স্বপ্নের মতো ঘটনা।

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্নিগ্ধা তালুকদার বললেন, ‘ঘর পাওয়া মানুষগুলো এখন দারুণ আত্মবিশ্বাসী। তাদের এই আত্মবিশ্বাস ব্যাপকভাবে সামাজিক পরিবর্তন আনছে। উপকারভোগীরা এখন তাদের আয়ের বড় অংশই সন্তানদের খাওয়া ও লেখাপড়ার জন্য ব্যয় করতে পারছে। কয়েক বছরের মধ্যে এই উদ্যোগের বড় ধরনের সামাজিক প্রভাব আমরা দেখতে পাব।’ তিনি জানান, উপকারভোগীদের ঘর দেওয়ার পর আয়বর্ধক কাজে লাগিয়ে তাদের জীবনমান উন্নত করতে উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশ আছে। সে অনুযায়ী সরকারের অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমেও তাদের যুক্ত করা হচ্ছে।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের পরিচালক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব হোসেন জানান, যাদের জমি নেই, তাদের দুই শতাংশ জায়গা বন্দোবস্ত দিয়ে ঘর তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। যারা জমি ও ঘর দুটোই পাচ্ছে তারা প্রায় আড়াই থেকে পৌনে তিন লাখ টাকার সুবিধা পাচ্ছে। আর যারা শুধু ঘর পাচ্ছে তাদের জন্য খরচ হচ্ছে প্রায় দুই লাখ টাকা। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগের সুযোগ আছে সেসব এলাকায় ঘরগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হচ্ছে।



সাতদিনের সেরা