kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

জবাবদিহি করতে হবে, ভাতাও ফেরত দিতে হবে

আ ক ম মোজাম্মেল হক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জবাবদিহি করতে হবে, ভাতাও ফেরত দিতে হবে

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে রয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন নিয়ে তাঁর চ্যালেঞ্জের কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক শাহাদাত স্বপন

 

কালের কণ্ঠ : বাদ পড়া ২৩ হাজার মুক্তিযোদ্ধা এরই মধ্যে সরকারের কোষাগার থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা সুবিধা নিয়েছেন। এর দায় কার?

মোজাম্মেল হক : এককভাবে দায় কারো নয়। কারণ বিভিন্ন সময় এ তালিকা হয়েছে। তবে আমরা এ টাকা আদায় করব। একটি টাকা মাফ করার ক্ষমতা আমার নিজের নেই। আমরা অবৈধভাবে বনে যাওয়া এসব মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মামলা করব। মামলা হবে ‘সরকারি পাওনা আদায় আইনে’ তাঁদের ধরা হবে। কেন তাঁরা ভুল তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বনেছিলেন, সে জবাব নেওয়া হবে। তবে যে টাকা ক্ষতি হয়েছে

তা তুলতে সরকারি কোষাগার থেকে আরো টাকা খরচের পক্ষে আমি নই। এক টাকার জন্য এক লাখ টাকা খরচ করার পক্ষেও আমরা নই। আবার অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ধারী ভাতা নিয়ে মারা গেছেন। ফলে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। তবে চূড়ান্ত কথা হচ্ছে, ভুল তথ্য দিয়ে যাঁরা রাষ্ট্রের টাকা নিয়েছেন তাঁদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

 

কালের কণ্ঠ : মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশের কাজ কবে শেষ হবে?

মোজাম্মেল হক : তিন দফা তালিকা প্রকাশ করেছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরেক দফা প্রকাশ হবে। এ দফায় প্রায় ১৮ হাজার নাম থাকবে। বাকি অংশে আপিল করা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থাকবে। সেখানে দেড়-দুই হাজারের বেশি হবে না। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তালিকা প্রকাশ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ছাড়া ভুল তথ্য দিয়ে যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন, তিন মাস সময় দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আহ্বান করা হবে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণসহ চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। সব কিছু মিলে তা আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।

 

কালের কণ্ঠ : এর আগে তো ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন-২০১৮’ সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন...।

মোজাম্মেল হক : দেখুন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে যাঁরা দেশের অভ্যন্তরে গ্রামে-গঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর বিরুদ্ধে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন—এমন সব বেসামরিক নাগরিকই মুক্তিযোদ্ধা হবেন। এ সংজ্ঞায় প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্তে কোনো সমস্যা নেই। ফলে আপাতত আইন সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই।

 

কালের কণ্ঠ : নীতিমালা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের ভুল নামের মৌলিক পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অভিযোগ আছে, এতে কিছু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়ে যাচ্ছেন। আপনার ব্যাখ্যা কী?

মোজাম্মেল হক : মৌলিক ভুল, অর্থাৎ কোনো মুক্তিযোদ্ধার বাবার নাম বা মুক্তিযোদ্ধার নিজের পুরো নাম ভুল হলে তা সংশোধনের সুযোগ নেই। যেমন—‘আফসার আলী’র জায়গায় ‘আনসার আলী’ হতে পারে, আবার ‘আকতার আলী’ হলে এটা সংশোধন হতে পারে। ভুল টাইপিংয়ের কারণে দু-একটি অক্ষরের সংশোধন হতে পারে। এমনকি দু-একটি শব্দের এদিক-ওদিক হলে সংশোধন করা যাবে। কিন্তু ‘আনোয়ার আলী’র স্থলে ‘শাহাবুদ্দিন’—এমন সংশোধন করলে হয়তো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়তে পারেন। নামের সঙ্গে কোনো মিল নেই, এমন নামের সংশোধনের সুযোগ নেই। নীতিমালায় আমরা সেটি উল্লেখ করেছি। অনেকে আসেন বাবার নাম বদলে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে নিতে—এটি সম্ভব নয়।

 

কালের কণ্ঠ : শুরু থেকে ভাতা পাওয়া স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাও বাদ পড়ছেন, এটি কিভাবে হলো?

মোজাম্মেল হক : শুরু থেকে ভাতা পেতেই পারেন। পরে বিচারিক বিবেচনায় অনেকে বাদ পড়ছেন। যাচাই-বাছাইয়ে প্রমাণ হচ্ছে যে তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা নন। কিন্তু প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকায় ওয়েবসাইটে নাম প্রকাশের আগ পর্যন্ত মানবিক কারণে আমরা তাঁদের ভাতা দিচ্ছি। এভাবে আগে অনেকে ভাতা নিয়েছেন। আবার অনেকে ভুল তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিলেন। এভাবে ভাতা নিয়েছেন। তথ্য-প্রমাণ সেটিই বলছে। আমরা এই সুযোগ বন্ধ করছি।

 

কালের কণ্ঠ : অতীতে মুক্তিযোদ্ধা যাচাইয়ের প্রতিটি প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এবারের যাচাইপ্রক্রিয়াও পরবর্তী সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হবে কি না?

মোজাম্মেল হক : দেখুন, যাচাইপ্রক্রিয়ায় দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে যে কমিটি করেছি, সেই কমিটিতে মুক্তিযোদ্ধারাই আছেন। তাঁরাই জানেন কারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বা কারা করেননি। ফলে যাচাই-বাছাই করে তাঁরা যে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন তার ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত তালিকা ওয়েবসাইটে যাচ্ছে। এ ছাড়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অধিকতর যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়ছেন, আমাদের কাছে এমন মনে হয়নি। এ ছাড়া এ বিষয়ে আপিলের দ্বার উন্মুক্ত আছে। প্রকৃত কেউ বাদ পড়েছেন, এমন অভিযোগ পেলে সেটিও তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ নেই। শুধু এ তালিকা প্রণয়ন নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানো আমরা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।

 

কালের কণ্ঠ : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিদেশি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক স্থাপনের কাজ বিলম্বিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে...।

মোজাম্মেল হক : জমি অধিগ্রহণের জন্য আমাদের প্রকল্পে চার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। স্থানীয় জেলা প্রশাসক বলেছেন জমির বর্তমান বাজারমূল্য তিন গুণ। সে ক্ষেত্রে ওই প্রকল্পে মোট ১০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। এ কারণে আমরা প্রকল্প সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছি। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড় পেলে জেলা প্রশাসক জমি অধিগ্রহণ করবেন। সেটি চলতি অর্থবছরেই হবে।



সাতদিনের সেরা