kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

দ্রুত বাড়ছে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ

► ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের ৮৮% মন্দ মানের
► মন্দ ঋণ সোয়া এক লাখ কোটি টাকারও বেশি
► ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে

জিয়াদুল ইসলাম   

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দ্রুত বাড়ছে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ

ব্যাংকিং খাতে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে মোট খেলাপি ঋণ যে পরিমাণ বেড়েছে, তার চেয়েও বেশি বেড়েছে এই মানের ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে মোট খেলাপি ঋণ যেখানে ছয় হাজার ৩৫১ কোটি টাকা বেড়েছে, সেখানে মন্দ ঋণ বেড়েছে ছয় হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, শতকরা হিসাবেও মন্দ মানের ঋণের অংশ বাড়ছে প্রতিবছর। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের ৮৮ শতাংশই মন্দ মানের। এর পরিমাণ সোয়া এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে অবলোপন করা (রাইট অফ) মন্দ ঋণ রয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এই মানের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম থাকে।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ঋণগ্রহীতা ঋণের কিস্তি শোধ না করলেও খেলাপি করা যাবে না, ২০২০ সালজুড়ে এমন সুবিধা পেয়েছেন গ্রাহকরা। এতে করে গত বছরে ঋণের কিস্তি না দিয়েও নতুন করে কোনো ঋণখেলাপি হয়নি; যার কারণে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে আসে। সেই সঙ্গে কমে আসে মন্দ মানের খেলাপি ঋণও। চলতি বছর এ সুবিধা বহাল রাখা না হলেও সব ধরনের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের মেয়াদ বিভিন্ন হারে বাড়ানো হয়েছে। এর পরও খেলাপি ঋণের সঙ্গে মন্দ মানের ঋণও বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মন্দ ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যায়। কারণ এর বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে, যা তাদের নিট আয়ে প্রভাব ফেলছে। এতে দুর্বল হয়ে পড়ছে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি। ফলে বছর শেষে লভ্যাংশবঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে মন্দ ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনার ব্যয় বাড়ছে। মন্দ ঋণ বৃদ্ধির জন্য বাছবিচার ছাড়া ঋণ অনুমোদন, ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনে ছাড় এবং সুশাসনের অভাবকে দায়ী করছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো ব্যাংকের মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ওই ব্যাংকের জন্য অগ্রিম সতর্কবার্তা। মন্দ ঋণ বাড়লে ব্যাংকের দুই ধরনের ক্ষতি হয়। একটি হচ্ছে, ব্যাংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে, যা পরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে এই মানের ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়।

আর এটা করতে গিয়ে সরাসরি চাপ পড়ে ওই প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সময় যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় রাখলে এই ঋণের পরিমাণ এমন হারে বাড়ত না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ শ্রেণীকরণের তিনটি পর্যায় রয়েছে। তা হলো নিম্নমান, সন্দেহজনক ও মন্দ মান বা ক্ষতিজনক। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে নিম্নমান ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ প্রভিশন, সন্দেহজনকের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ মান বা ক্ষতিজনক ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের ৫৯টি ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৫৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৮.৭ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। ওই অঙ্ক ছিল মোট বিতরণ করা ঋণের ৭.৬৬ শতাংশ। এ হিসাবে গত তিন মাসের ব্যবধানে মোট খেলাপি ঋণ বেড়েছে ছয় হাজার ৩৫১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মন্দ মানের খেলাপি ঋণ ছিল ৭৭ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। এর বাইরে অবলোপন করা মন্দ মানের খেলাপি ঋণ ছিল ৪৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে অবলোপনসহ মন্দ মানের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা। ফলে গত তিন মাসের ব্যবধানে মন্দ মানের খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ছয় হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা।

শতকরা অংশ হিসাবেও মন্দ মাণের ঋণ বাড়ছে প্রতিবছর। যেমন—২০১৯ সালে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দ মানের ঋণ ছিল ৮১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা বা ৮৬.৭৯ শতাংশ। করোনার বছর ২০২০ সালে খেলাপি ঋণ কমে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকায় নেমে আসায় মন্দ মানের খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়ায় ৭৭ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। কিন্তু মোট খেলাপি ঋণের অংশ হিসেবে ২০২০ সালে মন্দ মানের খেলাপি ঋণের অংশ বেড়ে হয় ৮৬.৯৯ শতাংশ। আর চলতি বছরের মার্চে মোট খেলাপি ঋণের অংশ হিসেবে মন্দ ঋণের হার আরো বেড়ে ৮৭.৯৯ শতাংশে উঠেছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মন্দ মানের ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলোতে। মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের অবলোপন বাদে মন্দ ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। বিশেষায়িত খাতের দুই ব্যাংকে অবলোপন বাদে মন্দ ঋণ রয়েছে তিন হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। এ সময়ে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর অবলোপন বাদে মন্দ ঋণ রয়েছে ৩৭ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকের অবলোপন বাদে মন্দ ঋণ রয়েছে এক হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।

এদিকে মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে ১১টি ব্যাংক। এ তালিকায় সরকারি খাতের পাঁচটি ও বেসরকারি খাতের ছয়টি করে ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা।



সাতদিনের সেরা