kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

চট্টগ্রাম কাস্টমসে গতি পণ্য ব্যবস্থাপনায়, বাড়ছে আয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রাম কাস্টমসে গতি পণ্য ব্যবস্থাপনায়, বাড়ছে আয়

বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপের ফলে পণ্য এনে বন্দরে ফেলে রাখার প্রবণতা ও রাজস্ব ফাঁকি কমে এসেছে। করোনা মহামারির মধ্যে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি না কমে উল্টো বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনিয়মের গোলকধাঁধা থেকে কাস্টমসকে আলোয় আনার বাতিঘর হিসেবে কাজ করছেন বর্তমান কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম। অন্ধকার থেকে আলোর পথে এই যাত্রার ধারাবাহিকতা চান ব্যবসায়ীরাও। তাঁরা বলছেন, কাস্টমসে সুশাসন বা গুড গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে আগে কেউ এত বড় উদ্যোগ নেননি।

জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানটির আয়ের ওপরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। এর পরও প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। জাহাজ থেকে পণ্য নামিয়ে ইয়ার্ডে বছরের পর বছর ফেলে রাখাই ছিল কিছু ব্যবসায়ীর ‘নিয়ম’। পরিত্যক্ত পণ্য প্রতি মাসে নিলামে তোলার কথা থাকলেও কাস্টমসের জন্মের পর থেকেই সেটি কখনো হয়নি। ফলে বন্দরে স্থান সংকোচন এবং পণ্য ওঠানামা ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলেও সুফল মেলেনি। সেই কার্যক্রমে এবার গতি এসেছে। এতে খুশি সৎ এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীরা।

শুধু ধ্বংস কার্যক্রমই নয়, নির্ধারিত সময়ের পর পণ্য নিলামেও গতি এনেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। আগে ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য না নিলে নিলামের নিয়ম থাকলেও সেটি কার্যকর হতো না। এখন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসে গত দুই বছরে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির সঙ্গে জড়িতদের লাইসেন্স বাতিল, জরিমানাসহ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অর্থপাচার রোধে গঠিত ‘অ্যান্টি মানি লন্ডারিং টিম’ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, “অনিয়ম অনেক কমে এসেছে। আমরা এখন ‘ইজি অব ডুইং বিজনেস’ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছি, যাতে করে দ্রুত, বিনা হয়রানিতে পণ্য ছাড় করা যায়।” এই কাজে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ফখরুল আলম অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই কাস্টমসের সব কর্মী উনার মতো আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করুক। তাহলেই পূর্ণ সফলতা পাব।’

বর্তমান কাস্টমস কমিশনারসহ অন্য কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। বিপজ্জনক ও মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পদার্থ ধ্বংসের উদ্যোগকেও স্বাগত জানান তাঁরা।

জানা যায়, গত এক বছরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ২৬৮ কনটেইনার পচা বা নষ্ট হওয়া পণ্য ধ্বংস করেছে; যার পরিমাণ হবে ছয় হাজার টনের মতো। এর বাইরে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং বিপজ্জনক ৫৫ টন রাসায়নিক পদার্থও পরিবেশ সম্মতভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতর বিপজ্জনক পণ্য রাখার ঝুঁকি কিছুটা কমেছে; আর বন্দরের ভেতর পণ্য পরিচালন ব্যবস্থায় গতি এসেছে। মূলত লেবাননের রাজধানী বৈরুতের সমুদ্রবন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক বিস্ফোরণের পর চট্টগ্রাম বন্দরের টনক নড়ে।

সাইফ মেরিটাইম লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার আবদুল্লাহ জহির বলেন, ‘পণ্যভর্তি কনটেইনার ইয়ার্ডে ফেলে রাখলে শিপিং লাইনের আর্থিক ক্ষতি, বন্দরের পরিচালন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি, কাস্টমসও বঞ্চিত হয় নির্ধারিত রাজস্ব থেকে। এর পরও অনিয়ম বন্ধ করা যায়নি। আশা করছি এবার তারা চাপে পড়বে।’ তিনি মনে করেন, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা জরুরি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও নিয়মিত নিলাম আয়োজন হওয়ায় খুশি। চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেছেন, ‘আমাদের কাছে ইয়ার্ডের এক ইঞ্চি স্থানও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পণ্য রাখার ইচ্ছামতো স্থান আমাদের নেই। একটি পণ্যভর্তি কনটেইনার ইয়ার্ডে পড়ে থাকা মানে আরেকটি কনটেইনার সেখানে থাকার সুযোগ বঞ্চিত হওয়া। অনেক বছর পর কাজটি ধারাবাহিকভাবে সফলতার সঙ্গে করা হচ্ছে। এটি অক্ষুণ্ন থাকা চাই। বিপজ্জনক পণ্য ধ্বংস করাও একটি বড় অর্জন।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইয়ার্ড থেকে দ্রুত পণ্য ডেলিভারি নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংক ‘ইজি অব ডুইং বিজনেস’ কার্যক্রম পরীক্ষামূলক চালু করেছে। এর বড় অংশীদার হচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এ কাজে দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের সার্টিফিকেট অব অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। 

 

চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে ইলেকট্রনিক অকশন পদ্ধতি চালু করেছে। যদিও কিছু জটিলতার কারণে এখনো পুরোপুরি সফলতা পায়নি সেটি। সেই সঙ্গে পণ্যের এক্সামিন রিপোর্টও অনলাইনে দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে। বন্দরের আনস্টাফিং শাখার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা হয়রানিমুক্ত থাকেন।

‘নিয়মিত নিলাম আয়োজনের বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছি’ উল্লেখ করে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ফখরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে কোনো মাসে একবারও নিলাম হয়নি। গত মাসে আমি তিনটি নিলাম আয়োজন করেছি। এখন সেই ধারাবাহিকতা থাকবে।’ ডেপুটি কমিশনার (নিলাম শাখা) মো. আল আমিন বলেন, কাস্টমসের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ধ্বংস করা হয়েছে। ধ্বংস করা ছয় হাজার টন পণ্যের মধ্যে ছিল বিভিন্ন পচনশীল ও খাদ্যদ্রব্য। এর মধ্যে আপেল, পেঁয়াজ, চকোলেট, পোল্ট্রি ও ফিসফিডের মতো পণ্য ছিল।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত এই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার দাবি জানান। বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, আমদানিকারকরা সঠিক সময়ে পণ্য খালাস করলেই বন্দরে কনটেইনারজট থাকবে না। এ লক্ষ্যে তাঁদের নিয়মিত চিঠিপত্র দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।



সাতদিনের সেরা