kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৮। ৫ আগস্ট ২০২১। ২৫ জিলহজ ১৪৪২

গার্ড অব অনারে নারী ইউএনওতে আপত্তি

‘সরকার, আ. লীগের আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী’

তৈমুর ফারুক তুষার   

১৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘সরকার, আ. লীগের আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী’

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার প্রদানের ক্ষেত্রে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিকল্প রাখার প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অনেক নেতা। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এমন প্রস্তাবকে সরকার, আওয়ামী লীগের আদর্শিক অবস্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বলে মনে করছেন। এমন প্রস্তাব আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল চেতনার বিরোধী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি সমর্থন বলেও মন্তব্য করেছেন তাঁরা।

গতকাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বেশ কয়েকজন নেতা কালের কণ্ঠ’র কাছে এমন অভিমত জানান।

গত রবিবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক সভায় প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার প্রদানের ক্ষেত্রে নারী ইউএনওর বদলে বিকল্প ব্যক্তি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এ প্রস্তাবের শুধু প্রতিবাদ নয়, তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, হাশরের ময়দানে কিন্তু সবাইকে মায়ের নাম ধরে ডাকা হবে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি যে প্রস্তাব দিয়েছে তার নিন্দা জানাবার ভাষা আমার জানা নেই।’

দলটির সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি এই প্রস্তাব কোনোভাইে সমর্থন করি না। যাঁরা দিয়েছেন তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন, এর পেছনে কী যুক্তি আছে। তবে আমি মনে করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী হয়ে সব বাহিনীর গার্ড অব অনার নিচ্ছেন, এতে কিন্তু কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তাহলে একজন নারী ইউএনও যদি প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন তাহলে সমস্যা কোথায়?’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই প্রস্তাব বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার যে মৌলিক নীতি ও বিষয়গুলো অনুসরণ করছে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বা আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেসব নীতি নিয়েছে সে পথযাত্রাকে বিঘ্নিত করার হীন চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। এর পেছনে কোনো হীন উদ্দেশ্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এই প্রস্তাব আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক নীতি ও বাংলাদেশবিরোধী মনমানসিকতার প্রতিফলন ঘটাবার একটি অপচেষ্টা মাত্র। এই প্রস্তাব মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী গোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনার প্রতি সমর্থনের নামান্তর।’

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহ্মুদ স্বপন বলেন, ‘এটি দুর্ভাগ্যজনক এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার বিষয়। ইউএনও নারী না পুরুষ সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়। ইউএনও রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর্মের নেতৃত্ব দেন। রাষ্ট্রের কোনো লিঙ্গভেদ নেই। রাষ্ট্র নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ—সবার।’

আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ বলেন, ‘উনারা কোন পরিস্থিতিতে এই প্রস্তাব দিয়েছেন তা আমি জানি না। তবে এটুকু জানি, আওয়ামী লীগ সরকার নারীবান্ধব সরকার। যদি সংসদীয় কমিটি নারী ইউএনওকে গার্ড অব অনার প্রদানে না রাখার কোনো প্রস্তাব দিয়ে থাকে তবে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। নারী ইউএনও তো ওখানে নারী হিসেবে চাকরি পাননি। তিনি ওই পদে যোগ্য একজন মানুষ হিসেবেই চাকরি পেয়েছেন। আমাদের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমানাধিকার রয়েছে। এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো অধিকার রাষ্ট্র বা সংবিধান কাউকে দেয়নি। বর্তমান সরকার নারী-পুরুষের সমানাধিকার নষ্ট হয়—এমন কোনো কাজ কখনোই করবে না।’

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার প্রদানে নারী ইউএনকে না রাখার প্রস্তাব এসেছে আওয়ামী লীগেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে। এর ফলে সরকারকে বিব্রত হতে হচ্ছে। এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার আগে দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার ছিল। এখন পর্যন্ত কোনো প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দিতে গিয়ে কোনো নারী ইউএনও সমস্যায় পড়েননি। এ নিয়ে দেশের কোথাও কোনো সমস্যাও দেখা যায়নি। এমন বাস্তবতায় সংসদীয় কমিটির ওই প্রস্তাব নারীবান্ধব একটি সরকারকে অহেতুক সমালোচনায় ফেলে দিয়েছে।



সাতদিনের সেরা