kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

‘এলপিজির ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ধ্বংসের মুখে’

সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসিকে দায়ী করলেন ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে





‘এলপিজির ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ধ্বংসের মুখে’

এলপিজি খাতের সমস্যা নিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সংবাদ সম্মেলন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ভুলে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) শিল্পে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এখন ধ্বংসের মুখে। এলপিজি পেট্রোলিয়াম পদার্থ, এ ধরনের পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার প্রবিধান বিইআরসির নেই। তবু তারা আদালতের চাপে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এমনই মন্তব্য করেছেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আজম জে চৌধুরী।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে লোয়াব আয়োজিত ‘এলপি গ্যাসের মূল্যহার এবং এলপি গ্যাস শিল্প, বাজার ও ভোক্তাসাধারণের ওপর ঘোষিত মূল্যহারে প্রভাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা বিইআরসিকে সহায়তা করেছি। কিন্তু তারা একপেশে একটা দাম ঘোষণা করল। তারা আসলে খাতটিকে ধ্বংস করতে চায়।’

এ সময় বসুন্ধরা এলপি গ্যাস লিমিটেডের পক্ষে লোয়াবের প্রতিনিধি হিসেবে প্রকৌশলী জাকারিয়া জালাল এবং ওমেরা এলপি গ্যাসের পক্ষে প্রকৌশলী শামসুল হক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বেক্সিমকোর মুনতাসির আলম ও পেট্রোম্যাক্সের নাফিস কামালসহ লোয়াবের অন্য নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এত বড় একটা শিল্প গড়ে তুলেছি পাঁচ বছরে। সরকার খুবই সহানুভূতিশীল এবং সরকারের উদ্যোগের ফলেই এই শিল্পের প্রসার ঘটেছে। প্রতিবছর ১০ লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হচ্ছে। এর সুবিধা সারা বাংলাদেশে মানুষ প্রতিটা ক্ষেত্রেই গ্রহণ করছে। সেটা বন্ধ হতে চলেছে। এখন যদি আমরা সরবরাহ বন্ধ করতে যাই তাহলে সাধারণ ভোক্তা কষ্ট ভোগ করবে। কিন্তু এখন যদি উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য কিছু ঘটে, তাহলে সব দায়দায়িত্ব বিইআরসির।’

লোয়াবের সভাপতি আরো বলেন, ‘বিইআরসি ঘোষিত মূল্যহার প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম এবং ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলারদের যে ব্যয় ধরা হয়েছে, তা সরকারি এলপি গ্যাসের চেয়ে অনেক কম। যেমন, সরকারি এলপি গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউটরের জন্য বিইআরসি নির্দিষ্ট করেছে ৫০ টাকা, অন্যদিকে বেসরকারি এলপি গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউটরের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে মাত্র ২৪ টাকা। এই অসংগতি ডিস্ট্রিবিউটরদের ক্ষুব্ধ করেছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘোষিত মূল্যহারে এলপি গ্যাস বিক্রির জন্য যখন তাগাদা দেয়, অনেক ডিলার ও রিটেইলার এলপি গ্যাসের কেনাবেচা বন্ধ করে দেয়।’

আজম জে চৌধুরী আরো বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাবের সঙ্গে বিইআরসি পাঁচ-ছয়টি কস্ট কম্পোনেন্টের ক্ষেত্রে বড় ধরনের গরমিল করায় এই সমস্যা হয়েছে। আশা করা যায়, বিইআরসি মূল্যহার সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে তারা এই গরমিল নিরসন করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নতুন মূল্যহার ঘোষণা করবে। ঘোষিত মূল্যহারে সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও ত্রুটি রয়েছে। যে মাসের জন্য মূল্যহার ঘোষিত হবে সে মাসের মূল্যহার না নিয়ে এক মাস আগের মূল্যহার নেওয়ার ফলেও ভুল-বোঝাবুঝি হচ্ছে।’

ভর্তুকির বিষয়ে লোয়াবের সভাপতি বলেন, ‘জ্বালানির প্রতিটি সেক্টরেই ভর্তুকির ব্যবস্থা আছে। এলএনজি, ডিজেল ও ইলেকট্রিসিটিতেও সাবসিডি আছে। শুধু এলপিজি খাতেই সাবসিডি নেই। সব জ্বালানিতেই যেহেতু সাবসিডি আছে, এখন সরকার যদি মনে করে ভোক্তা পর্যায়ে কম দামে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এলপিজি খাতে সাবসিডি দেওয়া উচিত, তাহলে উদ্যোগ নিতে পারে। সহজলভ্য করতে হলে অবশ্যই সরকারের সাবসিডি দিতে হবে। বর্তমানে এই খাতের সবাই লস করছি।’

প্রকৌশলী জাকারিয়া জালাল বলেন, ‘বর্তমান সরকারের সুচিন্তিত ও ভালো সিদ্ধান্তের কারণে মাত্র পাঁচ বছরেই এই খাত প্রবৃদ্ধি করেছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে যে পরিবর্তন হয়েছে, তা অন্য কোনো খাতে দেখা যায়নি। আমরা চাই ফিক্সড একটা প্রাইস হোক, সেটা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত হোক; যেটা ভোক্তার অধিকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও স্বার্থ রক্ষা করবে। আবার ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করতে গিয়ে যাতে ব্যবসায়ীদের মেরে ফেলা না হয়।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমান এলপিজি খাতে মোট ৩০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ৭ শতাংশ। বাংলাদেশে এমন কোনো শিল্প নেই যা পাঁচ বছরে জিডিপির ৬/৭ শতাংশ হয়েছে। এলপিজি ইন্ডাস্ট্রির ফলে আমরা প্রতিবছর ৫০ হাজার কিউবিক মিটার গ্যাস সাশ্রয় করছি। এই ৫০ হাজার কিউবিক মিটার গ্যাস বর্তমানে প্রডাক্টিভ সেক্টরে ব্যবহার হচ্ছে, যা সার, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য উৎপাদন খাতে ব্যবহার করা হয়। যেকোনো দেশে এলপিজি সেক্টর বাড়লে এর পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পও বাড়ে।

সম্মেলনে আরো জানানো হয়, যে দরে এলপিজি গ্যাস বিক্রি করা হতো তাতে লোকসান গুনছিলেন ব্যবসায়ীরা। ২০১৬ সালে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশনের একটি মামলার কারণে বিইআরসি দর নির্ধারণ করা শুরু করে। যখন এলপিজি গ্যাসের বাল্ক প্রাইস ছিল এক হাজার ৫০০ টাকা, সেই প্রেক্ষাপটে এই মামলা করা হয়। বর্তমানে সেই পরিস্থিতি পাল্টেছে। এলপিজি গ্যাসের দর নির্ধারণ বিষয়ে বিইআরসির সঙ্গে বারবার কথা বলা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কোনো দক্ষতা ও যোগ্যতা নেই। তারা এমন একটি দর নির্ধারণ করেছে, যা বর্তমান বাস্তব মূল্যের চেয়ে অনেক কম।

অটো গ্যাস নিয়ে বলা হয়, অটো গ্যাসের এমআরপি প্রতি মাসে পরিবর্তন করা হলে গ্রাহক পর্যায়ে অসন্তোষ দেখা দেবে। কারণ বাজারে যানবাহনের অন্য যেসব জ্বালানি রয়েছে, সেগুলোর দর প্রতি মাসে পরিবর্তিত হয় না। তাই অপারেটরের পক্ষ থেকে অটো গ্যাসের দর বছরে একবার নির্ধারণ করার জন্য বিইআরসিকে অনুরোধ করেন ব্যবসায়ীরা। 

 



সাতদিনের সেরা