kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

এক দেশে দুই আইন

করবৈষম্যে বিটুমিন উৎপাদন হুমকিতে

► নজিরবিহীন বৈষম্য, উৎপাদনের চেয়ে আমদানিতে কর কম
► দেশে উৎপাদিত বিটুমিনের ওপর ১০ শতাংশ বাড়তি ভ্যাট
► বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশীয় শিল্প সুরক্ষা আইনের পরিপন্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করবৈষম্যে বিটুমিন উৎপাদন হুমকিতে

দেশে মানসম্পন্ন বিটুমিন উৎপাদনে প্রধান কাঁচামাল পেট্রোলিয়াম অয়েল অ্যান্ড অয়েলস অকটেন ফ্রম বিটুমিনাস মিনারেলস, ক্রুড আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। অথচ মানহীন প্রস্তুতকৃত বিটুমিন আমদানিতে কোনো ভ্যাট আরোপ করা নেই। বিটুমিনের কর কাঠামোয় নজিরবিহীন বৈষম্যে হুমকিতে পড়ল দেশীয় উৎপাদন শিল্প। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তকে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা আইনের পরিপন্থী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। এটিকে ‘এক দেশে দুই আইন’ আখ্যা দিয়ে তাঁরা বলছেন, এই দ্বৈত আইন ও নীতি দেশীয় শিল্পকে টুঁটি চেপে ধরার শামিল।

জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয় শিল্পে কর ছাড়সহ নানা নীতি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা এবং আমদানি নিরুৎসাহ করতে জোর দেওয়া হয়েছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের ওপর। শিল্প, সেবা, কৃষি খাতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশ বেগবান করতে তথ্য-প্রযুক্তি, নির্মাণ, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপকভাবে শুল্ক ছাড় ও কর অবকাশ সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু বিটুমিন শিল্প। উৎপাদনের চেয়ে আমদানিতে কম কর আরোপ করায় বিস্মিত দেশীয় উদ্যোক্তারা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প-২০৪১ এর মূল স্লোগান ‘কমাতে হবে আমদানিনির্ভরতা, বাড়াতে হবে উৎপাদনশীলতা, তাহলে তৈরি হবে কর্মসংস্থান’। টেকসই উন্নয়ন ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার স্থায়িত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশে প্রথম বিটুমিন অ্যাসফল্ট প্লান্ট স্থাপিত হয়েছে, যা দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানিতেও সক্ষম। বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দেশীয় বিটুমিন শিল্পে উৎপাদন পর্যায়ে অযৌক্তিকভাবে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কর বিদ্যমান রয়েছে। অথচ আমদানির ক্ষেত্রে অনেক কম কর ধার্য করা হয়েছে। এভাবে শুরুতেই দেশীয় বিটুমিন শিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্তমানে দেশে বিটুমিনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন, যা অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিবছরই বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে বিটুমিন উৎপাদনের জন্য প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে পেট্রোলিয়াম অয়েলস অ্যান্ড অয়েলস অবটেইন্ড মিনারেলস, ক্রুড। যার এইচএস কোড ২৭০৯.০০.০০। এই কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কর ৫ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, আগাম কর ৩ শতাংশ এবং অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ। এই কর কাঠামো পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ শতাংশ সিডিসহ মোট আমদানি শুল্ক দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া প্রতি ব্যারেলের ট্যারিফ মূল্য ৪০ মার্কিন ডলার নির্ধারিত রয়েছে।

অন্যদিকে বর্তমানে দেশে এইচ এস কোড ২৭১৩.২০.১০ এবং ২৭১৩.২০.৯০ এর মাধ্যমে ফিনিশড বা তৈরি বিটুমিন আমদানি হয়ে থাকে। ড্রামে বিটুমিন আমদানিতে প্রতি টনের শুল্ককর নির্ধারিত রয়েছে চার হাজার ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ এবং আগাম কর ৫ শতাংশ। অন্যদিকে অন্যান্য বিটুমিন নামে যদি কেউ বাল্ক আকারে আমদানি করে, সে ক্ষেত্রে প্রতি টনে তিন হাজার ৫০০ টাকা আমদানি শুল্ক নির্ধারিত রয়েছে। এর সঙ্গে এআইটি ২ শতাংশ এবং এটি ৩ শতাংশ প্রযোজ্য হয়।

বিটুমিনের এইচএস কোড পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে বিটুমিন উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে অন্যায্যভাবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। অথচ পরিশোধিত বিটুমিন আমদানিতে কোনো ভ্যাটই নেই। আবার আমদানির বিটুমিন সরবরাহ পর্যায়ে যেখানে ভ্যাট মাত্র ৫ শতাংশ, সেখানে দেশীয় উৎপাদকের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাটের খড়্গ রয়েছে। পরিশোধিত বিটুমিন আমদানির বেলায় খরচ যেখানে ২৬০ ডলার, দেশি বিটুমিন উৎপাদনের ক্ষেত্রে টনপ্রতি কাঁচামাল আমদানিতে ৫৬০ থেকে ৫৭০ মার্কিন ডলার।

ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও সুরক্ষায় কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক কর কাঠামো দেখতে চাই না। যেখানে তৈরি পণ্য আমদানিতে ভ্যাট নেই, সেখানে দেশীয় শিল্পের উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অযৌক্তিক ও অন্যায়। দেশীয় বিটুমিন সরবরাহ পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাটও অপ্রত্যাশিত।’ সব মিলিয়ে দেশীয় বিটুমিন শিল্পের সুরক্ষায় যৌক্তিক কর নির্ধারণে পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে গত মার্চে বিটুমিন আমদানিতে শুল্ককর বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআরকে লেখা চিঠিতে ভালোমানের বিটুমিন উৎপাদনে সুরক্ষা দিতে ফিনিশড বিটুমিন আমদানিতে ৪৭ শতাংশ আর বাল্ক বিটুমিন আমদানিতে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিল সংস্থাটি।

বিটিটিসি চেয়ারম্যান মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘আমদানিকারকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না দেশীয় বিটুমিন উৎপাদকারী উদ্যোক্তারা। এর কারণ বিটুমিনের কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে রাখা হয়েছে। অথচ ফিনিশড বিটুমিন আমদানিতে কোনো ভ্যাট নেই। এ অবস্থায় দেশীয় শিল্পকে রক্ষার জন্য আমরা মনে করি বিটুমিন আমদানিতে শুল্ক, কর ও ভ্যাট বাড়ানো জরুরি। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দিয়েছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও আমাদের প্রস্তাবের সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।’

জানা গেছে, আমদানি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়মনীতি ও তদারকি না থাকায় নিম্নমানের বিটুমিন আনা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে। আর অধিক মুনাফা লাভের আশায় কিছু সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করছে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজে। এ কারণেই নির্মাণ ও মেরামতের অল্প দিনেই সড়ক ও মহাসড়কগুলোর অবস্থা বেহাল হয়ে উঠছে। আর নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার করার খেসারত গুনতে হচ্ছে সরকারকে। দেশের রাস্তাঘাট তৈরির জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত মাত্রা ও মানের না হওয়া নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর সরকারের আনুমানিক কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির আড়ালে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে একদিকে টাকা পাচার হচ্ছে, অন্যদিকে তারা সরকার থেকে বাড়তি কর সুবিধাও পাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের এই নীতি কোনোভাবেই আইনের সঙ্গে যায় না। দেশের আইনে স্পষ্ট করে বলা আছে, সরকারকে স্থানীয় শিল্পের বিকাশে উচ্চ শুল্ককর আরোপ করে আমদানি নিরুৎসাহ করতে হবে। এখানে এর উল্টোটা হলো। আমদানিকে উৎসাহিত করে দেশে উৎপাদন নিরুৎসাহ করা হচ্ছে। সরকার দেশীয় শিল্পের টুঁটি চেপে ধরছে। এর থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যত দিন পর্যন্ত আমদানি নিরুৎসাহ করতে সরকার কঠোর নীতিমালা না করবে তত দিন পর্যন্ত বিদেশ থেকে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করার সুযোগ থাকবে। দেশে উৎপাদিত ভালো পণ্য ব্যবহার হবে না। এটা শুধু বিটুমিনের ক্ষেত্রেই না, বাংলাদেশে উৎপাদিত অনেক পণ্য আছে যেগুলোর মান অনেক ভালো কিন্তু নীতিমালার কারণে দেখা যায় বিদেশ থেকে খারাপ পণ্য চলে আসে। এখন সরকারের নীতি-নির্ধারণের ব্যাপার, দেশি শিল্পকে উৎসাহিত করবেন, না কি বিদেশ থেকে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতেই থাকবেন।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘বিটুমিন আমদানির চেয়ে দেশীয় শিল্প-কারখানায় উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাড়তি কর আরোপের সুযোগ নেই। এমনটা করা হলে তা হবে দেশীয় শিল্পের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম। সরকারের দেশীয় শিল্প সুরক্ষা নীতিরও পরিপন্থী। দেশীয় শিল্পের সঙ্গে এই বৈষম্যমূলক কর কাঠামো সংশোধন করা উচিত।’

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশীয় প্রতিষ্ঠান কেউ যদি বিটুমিন উৎপাদন করতে চায় তাহলে স্থানীয়ভাবে অন্যান্য পণ্য উৎপাদনে যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, বিটুমিন উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সেসব সুবিধা সরকারের দেওয়া প্রয়োজন।’

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাসিব মোহাম্মদ আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশেই যদি বিটুমিন উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয় সেটি তো দেশের জন্য খুব ভালো। দেশে একটা ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দেশে বিটুমিন উৎপাদন করতে চায় তাহলে আমাদের স্বাগতম জানানো উচিত। দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিটুমিন উৎপাদন করতে চাইলে, তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সরকারের দেওয়া উচিত। দেশে উৎপাদন হলে বিটুমিনের মান নিয়ন্ত্রণ দেশেই করতে পারব।’ বিটুমিনের ক্ষেত্রে সরকার স্থানীয় উৎপাদনে কর ছাড় দেবে বলে আশা করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, স্থানীয়ভাবে বিটুমিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান না থাকায় বিটুমিনাস ক্রুডের চেয়ে পরিশোধিত বিটুমিনের আমদানি শুল্ক কম রাখা হয় কেবল স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে। কিন্তু বর্তমানে গুণগত মান সম্পন্ন বিটুমিন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা বিবেচনায় আমদানি শুল্ক কাঠামো স্থানীয় শিল্পবান্ধব করে ফের নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশের দেশ ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের স্থানীয় শিল্পের প্রতিরক্ষণার্থে শিল্পের মূল কাঁচামালের ওপর থেকে শুল্ক ও অন্যান্য কর প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশের নিমিত্তে ফিনিশড পণ্যের ওপর বিভিন্ন রকমের শুল্ক ও অন্যান্য করারোপ করে। যার মাধ্যমে বিদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে উন্নতির শীর্ষে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে দেশীয় শিল্প রক্ষায় এ ধরনের নীতি আমাদেরও অনুসরণ করা উচিত। স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠা লাভ করলে দেশের জিডিপি আয় বাড়ার পাশাপাশি আমদানি খাতে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।