kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

জবাবদিহির বালাই নেই জড়িতদের

ফাতিমা তুজ জোহরা   

১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জবাবদিহির বালাই নেই জড়িতদের

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক কতটা, তা প্রবাসে পা রাখার পর থেকেই একজন নারী কর্মীর সামনে স্পষ্ট হতে থাকে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেতন কিংবা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ—এসবের কোনো কিছুই জোটে না তাঁদের। তবে প্রতিশ্রুতির বাইরে যৌন নির্যাতন এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কমতি নেই। ‘স্বর্গের’ আশায় গিয়ে যাদের কারণে নারী কর্মীদের এই ‘নরকে’ পড়তে হয়, সেই রিক্রুটিং এজেন্সি ও মানবপাচারকারীদের কোনো শাস্তিই ভোগ করতে হয় না। সরকারের যে পদক্ষেপ, তাতে মনে হয় যে নির্যাতিত কোনো নারী কর্মীকে দেশে ফিরিয়ে আনাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব।

আল হাবিব ও সিকদার ওভারসিজ নামের রিক্রুটিং এজেন্সি এবং একটি দালালচক্র লেবাননে গৃহপরিচারিকার কাজ দেওয়ার কথা বলে শাহিনাকে (আসল নাম নয়) সিরিয়ায় পাঠায়। সেখানে সাত মাস যৌনকাজে বাধ্য করা হয় তাঁকে। যৌনকাজে বাধা দিলেই তাঁর ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। সিগারেটের ছেঁকা, বৈদ্যুতিক শক, চাবুকের বাড়ি—সবই সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে।

শাহিনার মতো অসচ্ছল নারীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। বিদেশে নারী কর্মী পাঠানোর ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর হলেও ১৩-১৪ বছরের কিশোরীদেরও বয়স বেশি দেখিয়ে সৌদি আরবে পাঠানো হচ্ছে।

সম্প্রতি নদী নামে ১৩ বছরের এক কিশোরীর লাশ পাওয়া যায় সৌদি আরবে। মৃত্যু সনদে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও পরিবারের দাবি, নদীকে হত্যা করা হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, ২০১৯ সালের মার্চে সৌদি আরব যাওয়ার পর থেকেই নদীর ওপর নির্যাতন শুরু করেন নিয়োগকর্তা। বেতনও দেওয়া হতো না তাকে। এসব বিষয়ে একাধিকবার নদীর বাবা দুলাল মিয়া রিক্রুটিং এজেন্সি ঢাকা এক্সপোর্টের মালিক এ রহমান লালনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।

সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৫ রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশে নারী কর্মী পাঠানোর অনুমতি পায়। কিন্তু গত চার বছরে এজেন্সির সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এখন ৬২১ রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশে নারী কর্মী পাঠাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মানবপাচারের যত মামলা হয়েছে, তাতে এক হাজার ৭৯১টি নারীপাচারসংক্রান্ত। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালেই অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমকালে ৩০৩ জন নারীকে উদ্ধার করা হয়েছে।

সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, টিকটক মডেল বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে অল্প বয়সী নারীদের পাচার করা হচ্ছে। এই পাচারচক্র মধ্যপ্রাচ্যে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের ভারত ও দুবাইয়ে পাচার করছে। করোনা মহামারির মধ্যে তুরস্ক থেকে দেশে ফিরেছেন এক হাজার ২৯ জন নারী। তুরস্কে কোনো শ্রমবাজার না থাকলেও এত নারীর দেশে ফেরা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। 

বিভিন্ন এনজিও দীর্ঘদিন ধরেই দালালদের আইনের আওতাভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে, যাতে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, নারী অভিবাসন নীতিমালা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে নারীদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলে বিদেশে পাঠাতে হবে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সে দেশের সিম কার্ডের ব্যবস্থাও থাকতে হবে তাদের জন্য। তিনি আরো বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বমসা) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, বেশির ভাগ নারী দালাল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিদেশ যাচ্ছেন। ফলে বেশির ভাগ নারী ফাঁদে পড়েন। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সঙ্গেই দালালদের সখ্য থাকে। কোনো দালালেরই বাইরে কর্মী পাঠানোর ক্ষমতা নেই। প্রত্যেক দালাল এজেন্সির মাধ্যমে লোক পাঠান। আইনি হিসাব করলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির ওপরই সব দায় বর্তায়। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) কিন্তু এজেন্সিকেই চেনে, দালালদের চেনে না। বিএমইটি অভিযোগ পেলে এজেন্সির সার্ভার বন্ধ করে দেয়। কিন্তু দালাল ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাফরিজা শ্যামা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দালালদের জবাবদিহির আওতায় আনতে কাজ শুরু করেছি। দালাল কোন রিক্রুটিং এজেন্সির, তা জানার জন্য দালালের একটি কার্ড থাকবে। এতে রিক্রুটিং এজেন্সি দায় এড়াতে পারবে না। আর প্রবাসে যেন দালালের মাধ্যমে যেতে না হয়, সে জন্য আমরা একটি অ্যাপ তৈরি করেছি। মাস দুয়েকের মধ্যেই চালু হবে। সেখানে তথ্য দিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে এসে সরাসরি টাকা দিতে হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন গৃহকর্মী দেওয়ার বিনিময়ে সৌদি নিয়োগকর্তা আমাদের দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো দেয়। রিক্রুটিং এজেন্সি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেয়। বাকি টাকা গৃহকর্মীকে নিয়ে আসার খরচ এবং দালালকে দেয়। পরে যখন কোনো নারী অভিযোগ করেন, তখন রিক্রুটিং এজেন্সিকে তিন-চার লাখ টাকা খরচ করে দেশে ফেরত আনতে হয়। বিপত্তি বাধে এখানেই। রিক্রুটিং এজেন্সি এই টাকা দিতে চায় না।’



সাতদিনের সেরা