kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

পটিয়া ছাত্রলীগে খুনি চাঁদাবাজ কিশোর গ্যাং সদস্যরা আসছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পটিয়া ছাত্রলীগে খুনি চাঁদাবাজ কিশোর গ্যাং সদস্যরা আসছে?

কেউ সদ্যঃসমাপ্ত পৌর নির্বাচনে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর ভাইকে প্রকাশ্যে হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছে। কাউকে মোটরসাইকেল চুরিকালে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দেওয়া হয়েছিল। আবার কারো নামের সঙ্গে যুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ কিংবা টেন্ডারবাজ খেতাব। এদের বেশির ভাগ আবার কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। অথচ তারাই নাকি আসছে চট্টগ্রামের পটিয়া ছাত্রলীগের নেতৃত্বে! দাগি অপরাধীদের ছাত্রলীগের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের বিভিন্ন পদে আনা হচ্ছে—এমন গুঞ্জনে ত্যাগী নেতারা বিস্মিত, ক্ষুব্ধ। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র মতে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ সামশুল হকের ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন বিতর্কিত কিছু মুখকে পটিয়া উপজেলা ছাত্রলীগ, পৌরসভা ও কলেজ শাখায় নেতৃত্বে আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁর নির্দেশনা মতো দু-এক দিনের মধ্যেই কমিটি ঘোষণা হতে পারে। প্রকৃত ও ত্যাগী নেতাদের এড়িয়ে অনুপ্রবেশকারী, বিতর্কিত ও অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আনা হচ্ছে এমন খবরে এলাকায় ক্ষোভ অনুভূত হচ্ছে।

শোনা যাচ্ছে, উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কের পদ দুটি ভাগাভাগি করে দেওয়া হতে পারে আবদুল্লাহ আল নোমান ও নাজমুল সাকেরের মধ্যে। দুজনই বিতর্কিত এবং নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এর পরও শেখ সোহেলকে পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি ও আবদুল হান্নানকে পটিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে চূড়ান্ত করেছেন শারুন চৌধুরী। আরো শোনা যাচ্ছে, কিছুদিন আগেও ছাত্রদলের নেতৃত্বে থাকা আরাফাত শাকিলকে উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এঁদের বাছাই করা হয়েছে। এখন কমিটি ঘোষণার তোড়জোড় চলছে।

ভয়ংকর যত অভিযোগ : পটিয়ায় ইয়াবা ব্যবসার নেতৃত্ব দেন আবদুল্লাহ আল মামুন। এলাকায় চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির সঙ্গেও জড়িত তিনি। সম্প্রতি ইন্দ্রপোলে সেতু নির্মাণ প্রকল্পে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া প্রকল্পে বিভিন্ন মালপত্র সরবরাহ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। ওই ঘটনায় কাজ বন্ধ করে চলে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখলেরও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

নাজমুল সাকেরের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বছর তিনেক আগে তিনি একটি মোটরসাইকেল চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েন। স্থানীয় লোকজন তাঁকে পুলিশেও দেয়। এ ঘটনার পর থানার একটি কক্ষে তোলা তাঁর খালি গায়ের একটি ছবি কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। স্থানীয় লোকজন জানায়, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে থানায় বিভিন্ন মামলার ঘটনায় তদবির-বাণিজ্য নাজমুল সাকেরের অন্যতম কাজ।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পটিয়ার পৌরসভা নির্বাচনের দিন সকাল ১১টায় একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে সহিংসতায় নিহত হন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুল মান্নানের ভাই আব্দুল মাবুদ (৫৫)। ওই ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি কালের কণ্ঠকে জানান, সাবেক কাউন্সিলর মান্নানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সরওয়ার কামাল রাজীবের অনুসারীরাই হামলা করেছিল। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শেখ সোহেল। বিতর্কিত এই সোহেলকে এখন পৌরসভা ছাত্রলীগের সভাপতি বানানোর তৎপরতা চলছে।

ওই নির্বাচনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পরও মামলার প্রধান আসামি রাজীবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি মাসখানেক জেলও খাটেন। কিন্তু অদৃশ্য কোনো শক্তির বলে পুলিশের সামনেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন হামলায় নেতৃত্বদাতা ও মামলার অন্যতম আসামি সোহেল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পটিয়ার কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনার পর পরিস্থিতির কারণে রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু হুইপপুত্র শারুনের নির্দেশে পুলিশ সোহেলকে ধরার সাহস পায়নি। এই সোহেল আবার কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন বলেও এলাকাবাসী অভিযোগ করে।

স্থানীয় সূত্র আরো জানায়, গত ২২ মে ছনহরা ইউনিয়নের উত্তর ছনহরা গ্রামে অভিযান চালিয়ে আব্দুল হান্নানের বাড়ি থেকে রাম দা, চাইনিজ কুড়ালসহ অনেক দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে হান্নানের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করলেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। জানা গেছে, হুইপ সামশুল হকের ভাই নবাবের সেকেন্ড ইন কমান্ড হলেন এই হান্নান। এলাকায় ইয়াবা বাণিজ্যের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। শোনা যাচ্ছে, তাঁকে দায়িত্বে এনে নিজের অবস্থান আরো পোক্ত করতে চান নবাব।

অন্যদিকে পটিয়ার শোভনদণ্ডী ইউনিয়ন ছাত্রদলের নেতৃত্বে ছিলেন আরাফাত শাকিল। এখন আলোচনা চলছে তাঁকে উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক করার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, হুইপ, তাঁর ছেলে ও ভাইয়ের ইশারায় এখানে সব কিছু চলে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সব সংগঠনের কমিটি হয় তাঁদের নির্দেশনায়। এখন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যাদের আনার তোড়জোড় চলছে, তাদের বেশির ভাগই দাগি আসামি। এলাকার মানুষ তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত। এদের নেতৃত্বে আনা হলে ছাত্রলীগের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের গায়ে কালিমা লেপন হবে বলেই মনে করেন তাঁরা।