kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

কম টিকার মাসুল সীমান্ত জেলায়

দেশে ২৪ ঘণ্টায় ৪৩ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২৪৫৪

তৌফিক মারুফ   

১২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কম টিকার মাসুল সীমান্ত জেলায়

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশেই আবারও সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা দিনে দিনে জোরালো হচ্ছে। গত কয়েক দিনে দৈনিক শনাক্তেও দেখা যাচ্ছে ঊর্ধ্বগতি। সীমান্তের কোথাও কোথাও দৈনিক শনাক্তের হার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে।

অন্যদিকে দেশে মৃত্যুও বেড়েছে। মোট মৃত্যু ছাড়িয়েছে ১৩ হাজার। টানা দুই সপ্তাহ ধরে দৈনিক মৃত্যু ৩০ জনের ওপরেই রয়ে গেছে। এর মধ্যে কয়েক দিন ছিল ৪০ জনের বেশি। শনাক্তও কয়েক দিন ধরে দুই-আড়াই হাজারের মধ্যে ওঠানামা করছে। এর মধ্যে রাজশাহীতে মৃত্যু ঘটছে সর্বোচ্চ।

এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা দেশে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার গতি যেকোনোভাবেই হোক বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন। সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে আরো কঠোর হওয়ার কথাও বলছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় কম টিকা দেওয়ার এক ধরনের মাসুল দিতে হচ্ছে এখন। ঢাকায় প্রথম ডোজের ১৮ শতাংশ দেওয়া হলেও সীমান্তবর্তী বেশির ভাগ জেলায় ২-৩ শতাংশের বেশি টিকা পায়নি সেখানকার মানুষ। কোথাও কোথাও ১ শতাংশেরও নিচে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এখন সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম চালানো দরকার বলে মত দিচ্ছেন। তবে এ ব্যাপারে ভিন্নমতও আছে। ফলে এই বিষয় নিয়েও এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯ মোকাবেলায় জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজির অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে টিকা দেওয়ার যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেই অনুসারে ঢাকায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল বাস্তবসম্মতভাবেই। তবে তখনই সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর দিকে আরো নজর রাখা উচিত ছিল। বিশেষ করে যখন পাশের দেশে ব্যাপকভাবে সংক্রমণ বেড়ে যায় তখনই আমাদের দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় যদি ব্যাপকভাবে টিকা দেওয়া যেত তবে হয়তো এখন ওই সব এলাকায় এমন সংক্রমণ না-ও হতে পারত। তবে এখনো পরিস্থিতি অনুসারে উচ্চহারে সংক্রমিত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নন-কভিড মানুষের মধ্যে গণটিকা দেওয়া যায়। এ জন্য ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করে যাদের রেজাল্ট নেগেটিভ আসবে, তাদের টিকাদানে অগ্রাধিকার দিলে সেখানে যেমন সংক্রমণ ও মৃত্যু কমবে, তেমনি ওই এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও কমে আসবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (টিকা) ডা. শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের হাতে টিকা থাকলে সব জায়গায়ই আমরা বেশি করে টিকা দিতে পারতাম। যেহেতু আমাদের হাতে পর্যাপ্ত টিকা ছিল না বা এখনো নাই, তাই আমরা চাইলেও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বেশি করে টিকা দিতে পারিনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যখন টিকা দিচ্ছিলাম না তখনো ভারতে সংক্রমণ ছিল। আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থা ছিল। আমাদের টিকার মজুদ ফুরিয়ে আসার পর্যায়ে ভারতে সংক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। ভারতে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির ওই সময় অন্তত ১৪ দিন যদি আমরা স্বাভাবিক টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে সীমান্তের জেলাগুলোতে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যেত।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেখানে ব্যাপকভাবে সংক্রমণ থাকে, সেখানে টিকা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদি সংক্রমিত কেউ টিকা নিয়ে ফেলে তবে তার শারীরিক জটিলতা বেড়ে যায়। অন্যদিকে যারা আক্রান্ত হয়ে গেছে তাদের মধ্যে এমনিতেই অ্যান্টিবডি তৈরি হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্য একজন বিশেষজ্ঞ কালের কণ্ঠকে বলেন, অনেকে সীমান্তবর্তী এলাকায় এখন জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিলেও সেটা বৈজ্ঞানিকভাবেই ঠিক নয়। বরং এখন যেসব এলাকায় সংক্রমণ তুলনামূলক কম আছে, সেই এলাকাগুলোতে টিকা দেওয়া গেলে বেশি উপকার হবে, সেখানে সংক্রমণ ছড়াতে পারবে না।

একই সঙ্গে সারা দেশেই করোনার নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দিয়ে অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু উপসর্গধারীদের পরীক্ষা করালেই কোথাও শনাক্তের হার অতি উচ্চ থাকতেই পারে। অল্প নমুনা পরীক্ষার হার দিয়ে অনেক সময় বাস্তব চিত্র না-ও মিলতে পারে। অন্যদিকে অন্য এলাকায় কী পরিস্থিতি আছে, সেটাও ঠিক বোঝা যাবে না। বিশেষ করে ডেল্টা বা ভারতীয় ভেরিয়েন্টের দিকে নজর রেখে একযোগে সারা দেশে সবার পরীক্ষা করা দরকার। সেই সঙ্গে কন্টাক্ট ট্রেসিং, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনেও জোর দিতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে দেশে টিকাদান পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে ৪০ বছরের বেশি বয়স্ক এবং সম্মুখ সারির কর্মী মিলিয়ে তিন কোটি ৯৫ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৭২ লাখ ৪৮ হাজার ৮২৭ জন। আর টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৫৮ লাখ ২০ হাজার ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে পেরেছেন ৪২ লাখ ৪০ হাজার ৮৫৬ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজের হিসাবে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পেয়েছেন রাজধানী ঢাকার মানুষ। এর পরই চট্টগ্রামে ৭ শতাংশ এবং কুমিল্লায় ৪ শতাংশ দেওয়া হয়েছে। খুলনা ও রাজশাহী জেলায় ৩ শতাংশ করে; যশোর, সিলেট, দিনাজপুর ও নওগাঁয় ২ শতাংশ করে; সাতক্ষীরা, নীলফামারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দেড় শতাংশ; চুয়াডাঙ্গা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ শতাংশ করে এবং বাকি জেলাগুলোতে ১ শতাংশের নিচে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় দ্বিতীয় ডোজও আনুপাতিক হারেই দেওয়া হয়েছে বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র।

কম টিকা পাওয়া জেলাগুলোর মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরাসহ বেশ কয়েকটি সীমান্ত জেলায় এখন সংক্রমণ উচ্চহারে ছড়িয়ে পড়েছে।

এখন পর্যন্ত দেশে তিনটি (অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, চীনের সিনোফার্ম ও ফাইজার) প্রতিষ্ঠানের মিলিয়ে মোট টিকা এসেছে এক কোটি ৯ লাখ চার হাজার ৬২০ ডোজ। এর মধ্যে অক্সফোর্ডের এক কোটি তিন লাখ চার হাজার ডোজ, সিনোফার্মের পাঁচ লাখ ডোজ এবং ফাইজারের এক লাখ ৬২০ ডোজ। ফাইজারের টিকা ১৪ জুন থেকে দেওয়া শুরু হতে পারে বলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া চীন সরকারের উপহার হিসেবে দেওয়া সিনোফার্মের আরো ছয় লাখ ডোজ টিকা আগামীকাল রবিবার নাগাদ দেশে আসার কথা রয়েছে। সিনোফার্মের আগের পাঁচ লাখ ডোজ টিকা স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে দেওয়া শুরু হয়েছে গত মাস থেকেই। দেশে থাকা চীনের নাগরিকরাও ওই টিকা থেকে ৩০ হাজার ডোজ পাবেন। এ পর্যন্ত দেশে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলিয়ে টিকা দেওয়া হয়েছে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এক কোটি ৬০ হাজার ৮৭১ ডোজ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরো ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন শনাক্ত হয়েছে আরো দুই হাজার ৪৫৪ জন, সুস্থ হয়েছে দুই হাজার ২৮৬ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ১৩.২৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্ত হয়েছে আট লাখ ২২ হাজার ৮৪৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছে ১৩ হাজার ৩২ জন এবং সুস্থ হয়েছে সাত লাখ ৬১ হাজার ৯১৬ জন। সুস্থতার হার ৯২.৫৯ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১.৫৮ শতাংশ।

গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ৪৩ জনের মধ্যে ৩০ জন পুরুষ এবং ১৩ জন নারী। তাদের মধ্যে আছে ঢাকা বিভাগের আটজন, চট্টগ্রামের ১০ জন, রাজশাহীর ১১ জন, খুলনার সাতজন, বরিশালের দুজন, রংপুরের চারজন এবং ময়মনসিংহের একজন।



সাতদিনের সেরা