kalerkantho

বুধবার । ২ আষাঢ় ১৪২৮। ১৬ জুন ২০২১। ৪ জিলকদ ১৪৪২

শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস আজ

বিপুল শক্তি নিয়ে নতুন করে শুরু

আবদুল্লাহ আল মামুন   

১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিপুল শক্তি নিয়ে নতুন করে শুরু

ইতিহাসের এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পিতা-মাতা, আদরের তিন ছোট ভাইসহ আপনজনদের হারিয়ে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরতে গিয়ে ওই সময় স্বজনহারা শেখ হাসিনাকে তীব্র প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এর আড়াই দশক পর তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকারের যুগে এসে পুরনো সেই মুখের আদলগুলো নতুন করে দেখতে পান তিনি। এর পথ ধরেই আসে ১৬ জুলাই ২০০৭। গ্রেপ্তার হন শেখ হাসিনা। ঠাঁই হয় জাতীয় সংসদ এলাকার সাবজেলে। দীর্ঘ ১১ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ জুন এই জেল থেকে মুক্তি পান তিনি।

১৯৮১ সালের ১৭ মে বিমানবন্দর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে যাওয়ার সময় ঝড়-বৃষ্টির মতো প্রতিকূল আবহাওয়া অবশ্য ২০০৮ সালের ১১ জুন ছিল না। এদিন আগে থেকে জমাট বাঁধা পশ্চিম আকাশের মেঘ কাটতে শুরু করেছিল। দুপুরে দম বন্ধ করা গুমট হাওয়া কাটাতে একপশলা বৃষ্টিও হয়। এরপর দুপুরের ঝকমকে সূর্যের আলো গায়ে মেখে ধানমণ্ডির সুধা সদনে ফেরেন শেখ হাসিনা।

বাইরে তখন জনসমুদ্র। তা দেখে বিলম্ব না করে দোতলার ছাদ বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। হাত উঁচিয়ে বিজয়ী অঙ্গুলি প্রদর্শন করতেই নেতাকর্মীরা একযোগে স্লোগান তোলেন, ‘শেখ হাসিনা এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সঙ্গে’। সেই দিনই দলীয় নেতাকর্মীদের এই ঐক্যবদ্ধ বিপুল শক্তি নিয়ে শুরু হলো আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নতুন পথচলা।

আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস আজ। এদিন সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। সেনা সমর্থিত ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে ধানমণ্ডির বাসভবন সুধা সদন থেকে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার করে প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগারে নিয়ে আটক রাখা হয়। একসময় কারাগারের অভ্যন্তরে শেখ হাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন চিকিৎসকরা তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পরামর্শ দেন। আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের ক্রমাগত আন্দোলন, আপসহীন মনোভাব ও অনড় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

দিনটি ছিল বুধবার। সকাল থেকেই জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন সাবজেলের নিরাপত্তা আরো এক ধাপ বাড়ানো হয়। জোরদার করা হয় গোয়েন্দা তৎপরতা। বসানো হয় অন্তত অর্ধশত চেকপোস্ট। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে দেওয়া হয় পুরো ধানমণ্ডিসহ আশপাশের এলাকা। এরই মধ্যে সকাল ৯টার পর থেকে সংসদ ভবন সংলগ্ন সাবজেলের প্রবেশপথগুলোতে ভিড় করতে থাকেন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সকাল ১০টার মধ্যেই প্রবেশপথগুলো পূর্ণ হয়ে যায় কানায় কানায়। সারা দেশ থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঢল নামে সংসদ ভবন ও ধানমণ্ডি এলাকায়। দুপুর ১২টার পর থেকে দুটি হেলিকপ্টার চক্কর দিতে থাকে সংসদ ভবন ও সাবজেলের ওপর দিয়ে। দেড়টার দিকে সংসদ ভবনের পূর্ব পাশের সড়ক দিয়ে (বিশেষ আদালত) পুলিশ প্রটেকশনের বেশ কয়েকটি গাড়ি প্রবেশ করে সাবজেলে। গাড়িবহর প্রবেশ করতে দেখে সাবজেলের দুই পাশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকেন।

দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে র‌্যাবের কালো রঙের পাজেরো গাড়িতে করে সাবজেল থেকে বের হন শেখ হাসিনা। বহরের আগে-পিছে ১৮টি গাড়িতে ছিলেন র‌্যাব, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ সদস্য। গাড়িবহর তৎকালীন বিশেষ আদালতের (পূর্ব পাশের সড়ক) পাশ দিয়ে বের হয়ে ছুটতে থাকে ধানমণ্ডির সুধা সদনের দিকে। গাড়িবহর বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছুটতে থাকেন। মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে আসাদ গেটের সামনে আসা মাত্র নেতাকর্মীরা গাড়িবহরটিকে আটকে দেন। তাঁরা শেখ হাসিনার গাড়ি ঘিরে ধরে ফুলের পাপড়ি ছিটাতে থাকেন। এ সময় স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এই অবস্থায় গাড়ির গ্লাস নামিয়ে শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের প্রাণঢালা অভ্যর্থনার জবাব দেন।

এরপর তিনি দুপুর ১টা ৫৮ মিনিটে আসেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু ভবনে। সেখান থেকে তাঁর গাড়িবহর ২টা ২০ মিনিটে সুধা সদনের উদ্দেশে রওনা হয়। নিজের এই বাড়িতে পৌঁছেন ২টা ৩৫ মিনিটে। ১১ মাস আগে এক ভোরে এ বাড়ি থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

ফিরে আসার পর সুধা সদনে শেখ হাসিনা দলের দুই প্রবীণ নেত্রী সাজেদা চৌধুরী ও মতিয়া চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেও সুধা সদনের বাইরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল বিপুল শক্তি। দুই হাত তুলে দলীয় নেতাকর্মীদের স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছিল পুরো ধানমণ্ডি এলাকা। এই নেতাকর্মীদের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দলে হয়ে ওঠেন একক ও অপরিহার্য নেত্রী। এরপর ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে যাঁরা শেখ হাসিনাকে বাদ দিতে সংস্কারের ডাক দিয়েছিলেন, তাঁরা দলে হয়ে পড়েন কোণঠাসা। একে একে নেতৃত্ব থেকেও বাদ পড়েন তাঁরা।   

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শেখ হাসিনা কি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন—এ প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সেই সময়টা ছিল প্রতিকূল। অনেক চেনা মুখ অচেনা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছিলেন। সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন নিয়ে তিনি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সব সময় আওয়ামী লীগের জন্য অপরিহার্য। তাঁর বিকল্প কেউ নেই। তিনি দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের আগলে রাখেন, পাশে দাঁড়ান। তিনি এমনই। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সারা দেশের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে আসেন। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের চাপে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।