kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

করোনা মোকাবেলা

দুর্নীতির সঙ্গে পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্নীতির সঙ্গে পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি

অপরিকল্পিত ‘লকডাউন’ আরোপ করায় দেশে করোনার সংক্রমণ যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে আসছে না। অন্যদিকে টিকা কেনাসহ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য কেনাকাটায় দুর্নীতি-অনিয়মের মধ্য দিয়ে সার্বিকভাবে কভিড মোকাবেলায় সুশাসনের বড় ঘাটতি দেখা গেছে। পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে ঘাটতি। বিশেষ করে কভিড-১৯ টিকা কেনার ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করা হয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) উদ্যোগে ‘করোনাভাইরাস সংকট মোকাবেলা : কভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফলে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে একই সঙ্গে করোনা মোকাবেলায় সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেছে টিআইবি। পাশাপাশি টিআইবি করোনা মোকাবেলা এবং টিকা ব্যবস্থাপনায় ১৯ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে। ফলাফল উপস্থাপন করেন টিআইবির ফেলো (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) মো. জুলকারনাইন।

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, বেশির ভাগ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মী (৫৬ শতাংশ), পরিচ্ছন্নতাকর্মী (২৬.৬ শতাংশ), মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা টিকার আওতায় আসেননি।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে টিকা গ্রহণে অনাগ্রহ বা ভীতির কারণে ৬১.৬ শতাংশ এবং ৪০ বছরের কম বয়স থাকার কারণে ৫১.৬ শতাংশ কর্মী টিকা গ্রহণ থেকে বিরত থাকছে। অনাগ্রহ বা ভীতি দূর করতে উদ্যোগেরও ঘাটতি রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির প্রধান নির্বাহী ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, করোনা মোকাবেলা ও টিকা ব্যবস্থাপনায় সরকারের ইতিবাচক কিছু দিকের পাশাপাশি সুশাসন ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে ঘাটতিই বেশি। এ ছাড়া সরকার যতটা না মানুষকে সচেতন করতে তথ্য দিতে উদ্যোগী, তার চেয়েও বহুগুণ বেশি তৎপর তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে। তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা ও ঘাটতি ছিল শুরু থেকেই। অন্যদিকে সংক্রমণ রোধে জনগণের আচরণেও দায়িত্বশীলতার ঘাটতি রয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে সরকারের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বলা হয়, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ও জিন-এক্সপার্টসহ আরটি-পিসিআর নমুনা পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ, ঢাকায় এক হাজার শয্যার (দুই শতাধিক আইসিইউ শয্যাসহ) ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী লকডাউন বাস্তবায়ন, পার্শ্ববর্তী দেশসংলগ্ন সীমান্ত বন্ধ করা, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে গতি সঞ্চার করার উদ্দেশ্যে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকার দুটি নতুন প্রণোদনা কর্মসূচি অনুমোদন এবং ৩৬ লাখ দরিদ্র পরিবারে দ্বিতীয়বার দুই হাজার ৫০০ টাকা নগদ অর্থ সহায়তায় সরকারের পদক্ষেপগুলো প্রশংসার যোগ্য। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ টিকার ব্যবহার শুরু হওয়ার (ডিসেম্বর ২০২০) কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশে টিকার ব্যবস্থা (ফেব্রুয়ারি ২০২১) করা হয়েছে।

বলা হয়, চীনের সঙ্গে সরকার সরাসরি ক্রয় চুক্তি করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী চীনের টিকা বাংলাদেশ ১০ ডলার দিয়ে  কিনছে, যা বিশ্ব বাজারদরের (১০-১৯ ডলার) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাশিয়া থেকে টিকা কেনার আগে চুক্তির বিভিন্ন শর্ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি প্রসঙ্গে বলা হয়, করোনা সংক্রমণের এক বছর তিন মাস অতিবাহিত হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী আইসিইউ, ভেন্টিলেটর ইত্যাদি চিকিৎসা সুবিধার সম্প্রসারণ করা হয়নি। বাজেট ও যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও সব জেলায় ১০টি করে আইসিইউ শয্যা প্রস্তুতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি। সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সংকটের কারণে বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে সাধারণ জনগণ এবং একজন কভিড-১৯ রোগীর গড় খরচ পাঁচ লক্ষাধিক টাকা।

প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে সরকারঘোষিত মোট ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজে বরাদ্দকৃত এক লাখ ২৮ হাজার ৩০৩ কোটি টাকার প্রায় ৩৫ শতাংশ বিতরণ করা হয়নি।

বলা হয়, স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে এখনো। পাঁচটি হাসপাতালে ক্রয়, শ্রমিক নিয়োগ ও কোয়ারেন্টিন বাবদ ৬২.৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ কোটি টাকার দুর্নীতি, ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে এক লাখ কিট ক্রয়, দর প্রস্তাব মূল্যায়ন, আনুষ্ঠানিক দর-কষাকষি, কার্যসম্পাদন চুক্তি, কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে বিধি লঙ্ঘন ও অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে ক্রয়াদেশ প্রদানের ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। করোনাকালে কারিগরি জনবলের ঘাটতি মেটাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়োগে জনপ্রতি ১৫-২০ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশে কভিড-১৯ টিকা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বলা হয়, শুরুতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিকল্প টিকা উৎসর সুযোগ গ্রহণ করা হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৮০ শতাংশ বা ১৩ কোটি আট লাখ মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা এবং সে অনুযায়ী টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল। টিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নারীদের হার ছিল ৩৭ শতাংশ। প্রচারে ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধনের ব্যবস্থা না করায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব কর্মীকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ৪২.৬ শতাংশ টিকা গ্রহীতা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে; যারা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে তাদের প্রায় ৭৮ শতাংশকে নিবন্ধন করতে ৫-১০০ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।

১৯ দফা সুুপারিশের মধ্যে রয়েছে

দেশের ৮০ শতাংশ জনসংখ্যাকে কিভাবে, কত সময়ের মধ্যে টিকা দেওয়া যাবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা করা, সম্ভাব্য সব উৎস থেকে টিকা আনতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সক্ষমতাসম্পন্ন কম্পানিগুলোকে নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ দেওয়া, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসারে সরকারি-বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সরাসরি আমদানির অনুমতি দেওয়া, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ছাড়া টিকা ক্রয়চুক্তি সম্পর্কিত সব তথ্য উন্মুক্ত করা, পেশা, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রত্যন্ত এলাকা বিবেচনা করে টিকার নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং টিকা দান কার্যক্রম সংস্কার করতে হবে; ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে নিবন্ধন এবং তৃণমূল পর্যায়ে টিকাকেন্দ্র চালু, সব কারিগরি ত্রুটি দূর করাসহ সবার জন্য বিভিন্ন উপায়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেওয়া এবং সবার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন কার্ড প্রিন্ট করার নিয়ম বাতিল, এলাকাভিত্তিক চাহিদা যাচাই করে টিকা সরবরাহ, টিকা প্রদান কার্যক্রমে টিকাকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, টিকাকেন্দ্রে অভিযোগ নিরসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা; অভিযোগের ভিত্তিতে বিদ্যমান সমস্যা দূর করা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

কভিড-১৯ মোকাবেলা কার্যক্রমে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির ক্ষেত্রে দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত এবং দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, করোনা মোকাবেলা কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পগুলো দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন এবং এর অগ্রগতির চিত্র প্রকাশ, স্টোরে ফেলে রাখা আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি অতি দ্রুততার সঙ্গে ব্যবহারযোগ্য করা এবং সংক্রমণ হার বিবেচনা করে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ, সব জেলায় আরটি-পিসিআর পরীক্ষাগার স্থাপন, বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউসহ কভিড-১৯ চিকিৎসার খরচ সর্বসাধারণের আয়ত্তের মধ্যে রাখতে চিকিৎসা ফির সীমা নির্ধারণ, জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি পালন করাতে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আচরণ পরিবর্তনমূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ ও মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে তা কার্যকরের উদ্যোগ নিতে হবে।

জনসংখ্যাকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার আগে স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবন-জীবিকার সংস্থান করে সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় এলাকাভিত্তিক লকডাউন দিতে হবে; সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাসহ নিষেধাজ্ঞার আওতা নির্ধারণ করতে হবে এবং সরকারঘোষিত প্রণোদনা অতি দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণের উদ্যোগ নিতে হবে।

 



সাতদিনের সেরা