kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

বিদেশে বসে সরকারের বিরুদ্ধে গুজব উসকানি

বিচারের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে

জয়নাল আবেদীন   

৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিদেশে বসে সরকারের বিরুদ্ধে গুজব উসকানি

দেশের বাইরে অবস্থান করে সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও গুজব রটানোর প্রবণতা বেড়ে চলেছে। তথ্য-প্রযুক্তির ফায়দা নিয়ে আবেগপ্রবণ তরুণসমাজকে বিপথে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টায় তৎপর একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এরা বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করতেও দ্বিধা করছে না। গুজবের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সরকারের মন্ত্রী, শীর্ষ রাজনীতিকসহ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও।

দিনবদলের সনদ নিয়ে ২০০৮ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার শপথ ছিল দলটির। এরপর প্রায় ১৩ বছর ধরে দলটি একটানা ক্ষমতায়। দেশও অনেকটা ডিজিটালাইজ হয়েছে। ডিজিটাল শব্দটির ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামে। হাতে হাতে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ। নানা ক্ষেত্রে এর সুফল মিলছে। তবে একই সঙ্গে বেড়েছে এই প্রযুক্তির অপব্যবহারও। বিশেষ করে অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে বাড়ছে অপরাধ কর্মকাণ্ড।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক গত মার্চ মাসে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশে গুজব ছড়াতে ও সাইবার হামলা চালাতে একটি রাষ্ট্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থ বিনিয়োগ করছে। এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রমাণ বাংলাদেশের হাতে এসেছে।

এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার জানতে চাইলে জুনাইদ আহেমদ পলক কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু শহর থেকে সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের সুযোগ বর্তমানে নেই। তবে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে কাজ চলছে। বিশেষ করে ইউটিউব ও ফেসবুক যাতে বাংলাদেশে তাদের সার্ভার ডাটা সেন্টার স্থাপন করে সে জন্য আইন প্রণয়নের চেষ্টা চলছে।

পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, ফেসবুকে পেজ, গ্রুপ ও ইউটিউবে চ্যানেল খুলে নানা রকম ধর্মীয় উগ্র মতবাদ প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন ইস্যুতে সরলমনা তরুণসমাজের আবেগকে পুঁজি করে জিহাদের ডাক পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর ইস্যুতে অনলাইনে ভয়ংকর মিথ্যাচার দেখা গেছে। ওই সময় তরুণ শ্রেণি ও মাদরাসার এতিম শিক্ষার্থীদের প্রলুব্ধ করতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জিহাদের ডাক দেন হেফাজতে ইসলামের বেশ কিছু নেতা। এর জের ধরে দেশের একাধিক স্থানে সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

অন্যদিকে অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে গুজব রটিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতে তৎপর রয়েছে জঙ্গিরাও। তবে জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের সক্রিয় অবস্থানের কারণে চক্রটির অপতৎপরতা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। জঙ্গিবাদ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর অভিযোগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ক্রাইম ইউনিট বিভিন্ন সময় অনেককে শনাক্তও করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারবিরোধী প্রচার চালাতে গিয়ে দেশকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে চক্রটি। এরা মূলত অনলাইন বা ইন্টারনেটকে তাদের যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর বিভিন্ন পেজের অ্যাডমিন বা ব্যবহারকারীরা বেশির ভাগই বিদেশে অবস্থান করে। ফলে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন আইন হলে বিদেশে অবস্থান নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশের বিরুদ্ধে যারা অপতত্রতা চালাচ্ছে তাদের দেশে বিচারের আওতায় আনা যাবে। মূল আইনের ৭১ ধারায় টেলিফোনে আড়িপাতার অপরাধ সম্পর্কে শুধু টেলিফোনে আলাপের কথা বলা আছে। সংশোধনীর খসড়ায় টেলিফোনে আলাপের সঙ্গে টেলিযোগাযোগ মাধ্যমে ভাবের আদান-প্রদান বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের খসড়া প্রকাশ করে আগামী ২৪ জুনের মধ্যে ই-মেইলে গণমত আহ্বান করেছে। খসড়ায় আইনটির প্রয়োগ অংশে নতুন একটি উপধারা সংযুক্ত করে তাতে এই মর্মে বলা হয়েছে—যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে থেকে এ দেশের কোনো টেলিযোগাযোগব্যবস্থা বা যন্ত্রপাতি বা বেতারব্যবস্থার সাহায্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে, তাহলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যাবে যে অপরাধটি বাংলাদেশের ভেতরেই সংঘটিত হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু পরিবর্তন ও সংযোজন প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক কিছু অ্যাড্রেস করা নেই। সেগুলো করার কাজ চলছে। আইন সংশোধন করে তা মেনে চলার জন্য ওদের বাধ্য করতে হবে। চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফা জব্বার আরো বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর মন্তব্য ও অপপ্রচারের বিষয় আমরা মনিটরিং করি এবং কনটেন্টগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) কাছে পাঠিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলি। ওরা কিছু বিষয়ে অনুরোধ রাখে, আবার কিছু বিষয়ে সাড়া দেয় না। সার্বিক বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সে লক্ষ্যে আইন সংশোধনের কাজ চলছে।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদও বলেন, ‘গুজব নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুমোদন করা হয়েছে। এজেন্সি স্থাপনের কাজও চলমান। এ ছাড়া নিরাপদ অনলাইন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে ডিজিটাল লিটারেসি সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজও শুরু হয়েছে। আমরা সারা দেশে ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. জিয়া রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশ যে ডিজিটাল হয়েছে বা হচ্ছে তা এক দিনের পরিবর্তন নয়। অনেক আগে থেকেই এটি পরিকল্পনামাফিক চলছে। একটি দেশ যখন আধুনিক সমাজব্যবস্থার প্রাথমিক স্তরে থাকে, সেখানে অপরাধের বিস্তারও সেভাবে ঘটতে থাকে। সেটি মাথায় রেখেই প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর প্রশাসনের টনক নড়ে।

তবে শুধু আইন সংশোধন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন ড. জিয়া। তিনি বলেন, অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যমে ডুবে থাকা প্রজন্ম ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুশাসন ভুলে গেছে। এ জন্য তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো বা মিথ্যাচার করার বিষয়টিও তাদের সেই বেপরোয়া ভাবেরই অংশ। এটি নিয়ন্ত্রণে দুদিক থেকেই জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। রাষ্ট্রের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুশাসন ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে হবে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাব মতে, গত মার্চ পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ সংখ্যা ছিল ৯৮ লাখ। একটি সংযোগের বিপরীতে অন্তত চারজন ব্যবহারকারী রয়েছে। অন্যদিকে মোবাইল অপারেটরদের তারহীন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ। এ ছাড়া মোট মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর ৪১ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করে বলে গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েশনের (জিএসএমএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আর দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ ফোর-জি কাভারেজের আওতায় এসেছে। সব মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন অনলাইনে সক্রিয়।



সাতদিনের সেরা