kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

সাততলা বস্তিতে ফের আগুন

শুধু ঘর নয়, পুড়ল স্বপ্নও

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শুধু ঘর নয়, পুড়ল স্বপ্নও

আবারও আগুনে পুড়ল রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তি। গতকাল ভোরে লাগা এই আগুনে পুড়ে গেছে কয়েক শ ঘর। ছবি : লুৎফর রহমান

ছয় মাস আগেই আগুনে পুড়েছিল মহাখালীর সাততলা বস্তি। সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই গতকাল সোমবার ভোরের দিকে আবারও দাউদাউ আগুন। প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিটের কর্মীরা; কিন্তু ততক্ষণে পুড়ে ছাই সাততলা বস্তির কয়েক শ ঘর। এর সঙ্গে যেন পুড়ে গেছে বহু মানুষের স্বপ্নও।

দুপুর আড়াইটার দিকে বস্তির পোড়া ঘরের সীমানার ভেতর ছয় বছরের বাচ্চা কোলে নিয়ে অসহায়ের মতো বসে ছিলেন সুফিয়া। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার পর হৈচৈ শুনে আমি কোনো রকমে বাচ্চা আর মোবাইল ফোনটা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাই। বাচ্চার বাবা শুধু টিভিটা কান্দে নিয়া বের হইতে পারছে। আমাদের আর সব কিছুই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রাতটা কোথায় কাটাব, বুঝতেছি না।’

আগুনে নিঃস্ব হওয়া রফিক ও নুরজাহান দম্পতি তাঁদের দুই সন্তান নিয়ে বস্তির পাশের রাস্তায় বসে বিলাপ করছিলেন। জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘আমি সারা দিন রিকশা চালাই। আর আমার বউ মাইনসের বাসাবাড়িতে কাজকাম করে। এইভাবেই জীবনডা কাটাইতেছিলাম। কিন্তু এই আগুন আমাদের সব শেষ কইরা দিছে। কষ্ট কইরা জোড়ানো খাট, টিভি, ফ্রিজ, লেপ-তোশক থেকে শুরু করে পিন্দনের কাপড় ছাড়া সব কিছুই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’

মনির হোসাইন নামের একজন বস্তিতে তাঁর কার্পেট ও পাপোশের পোড়া গোডাউন দেখিয়ে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন শেষ। আমার ব্যবসার বেশির ভাগই এ গোডাউনে ছিল। আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব কি না জানি না।’

বস্তিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা আকলিমা আক্তার নামের একজন বলেন, ‘বারবার এই বস্তিতে আগুন লাগার কারণে আমরা অসহায়। একেকবারের আগুনে ঘরের খাবার থেকে শুরু করে সব আসবাব পুড়ে যায়। সেই সঙ্গে আমাদের সব স্বপ্নও পুড়ে যায়। এভাবে আর কত জোড়াতালি দিয়ে সংসার গোছাব, বুঝতেছি না। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, বস্তিতে আগুন যাতে না লাগে, এমন একটা ব্যবস্থা করে দিন।’

বস্তির বাসিন্দা রিকশাচালক জহিরুল হক বলেন, ‘১০ বছর ধরে এই বস্তিতে আছি। এর মধ্যে যতবারই আগুন লাগছে ততবারই আমার ঘর পুড়ছে। ঘনবসতি হওয়ায় ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারি না। আর এবারের আগুনের সময় আমরা সবাই ঘুমে ছিলাম। কোনো রকমে জীবন নিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসছি। আগুনে আমাদের সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সরকারের উচিত, বারবার কেন বস্তিতে আগুন লাগে, কেউ ইচ্ছা করে আগুন লাগিয়ে দেয় কি না, এসব বিষয় খুঁজে বের করা।’

বস্তির বাসিন্দারা জানায়, আগুনে এতটাই পুড়েছে যে অনেকে তার নিজের ঘরও চিনতে পারছে না। কোনো সংগঠন ও সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তারা জানায়, এখনো তারা কিছু পায়নি। তবে সিটি করপোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন তাদের নামের তালিকা করছে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ভোররাত সোয়া ৪টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পরে আগুনের ভয়াবহতা বাড়ায় একে একে ১৮ ইউনিট আগুন নেভাতে যোগ দেয়। পুলিশ, র‌্যাব ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আড়াই ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। দু-একজন সামান্য আহত হলেও বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

তিনি জানান, গ্যাস সংযোগ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্তের বাইরে স্পষ্ট করে কিছু বলা যাবে না। ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক নুর হাসানকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁরা সব কিছু তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেবেন। 

কেন বারবার সাততলা বস্তিতে আগুন লাগে—এ বিষয়ে ঢাকা বিভাগ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ঢাকার অন্যান্য বস্তিতে যেমন আগুন লাগে সাততলা বস্তিও এর বাইরে নয়। বস্তিতে দাহ্য পদার্থ, বাঁশ, কাঠ দিয়ে তৈরি ঘর, অনেক ঘর দোতলা, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা এসব ঘরের একটিতে আগুন লাগলে দ্রুত অন্য ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। 

এর আগে গত বছরের ২৪ নভেম্বর এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। প্রতিবারই বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। তারা বলছে, অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগের দুর্বল তারের কারণেই এমন ঘটনা বারবার ঘটেছে। আর সেই ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে গতকাল দেখা যায়, সাততলা বস্তির ভেতর ছোট ছোট সরু গলিতে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন। পায়ে হাঁটা রাস্তার ওপর দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে নেওয়া হয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের লাইন। এসব লাইনের ওপর দিয়ে বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত চলাচল করে। আবার অনেকের রান্নার চুলাও বসানো হয়েছে অরক্ষিত এসব গ্যাসলাইনের খুব কাছে। এ ছাড়া সংযোগ লাইনের ওপর আবর্জনা থেকে শুরু করে রয়েছে বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ। এভাবেই সাততলা বস্তিজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের লাইন।

দুপুরে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারকে পাঁচ হাজার টাকা, তিন বেলা খাবার, ঢেউটিন এবং দুই হাজার টাকার শুকনা খাবার দেওয়ার ঘোষণা দেন। এ জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছে সিটি করপোরেশন। মেয়র বলেন, ‘বস্তিবাসীরা আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তাদের উচ্ছেদ নয়, সরকারের নির্দেশনায় পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।’

বিকেলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. নাছির বলেন, ‘আমরা তাদের প্রাথমিক পুনর্বাসনের জন্য কাজ করছি। এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংগঠন ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। পরে সরকারি সহায়তায় স্থায়ীভাবে তাদের বাসস্থান করে দেওয়া হবে।’

বনানী থানার ওসি নূরে আযম মিয়া বলেন, কতগুলো ঘর পুড়েছে, এটা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। এটার জন্য তদন্ত কমিটি হয়েছে। তারা খতিয়ে দেখে বলতে পারবে।

 



সাতদিনের সেরা