kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

টিকটক-লাইকি সিন্ডিকেট ধরতে আসছে অভিযান

ওমর ফারুক   

৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টিকটক-লাইকি সিন্ডিকেট ধরতে আসছে অভিযান

অশ্লীল ভিডিও তৈরিতে জড়িত লাইকি ও টিকটকারদের তালিকা করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এরই মধ্যে কমপক্ষে ৪০টি গ্রুপের সন্ধান মিলেছে, যারা অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে। এসব ভিডিও দেখে তরুণ-তরুণীসহ শিশুরাও বিপথে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ওই সব টিকটক ও লাইকি নির্মাণকারী এবং এসব প্ল্যাটফর্মে অভিনয়কারীদের শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এরই মধ্যে যাদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে শিগগির সাঁড়াশি অভিযান শুরুর কথাও বলছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

তরুণ-তরুণীরা মিলে অশ্লীল ও উদ্ভট ভঙ্গিমার দৃশ্য ধারণ করে বানানো হচ্ছে টিকটক-লাইকির কনটেন্ট। পরে অ্যাপ ব্যবহার করে এসব প্রচার করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কম গতির ইন্টারনেটেও টিকটক-লাইকি অ্যাপ চালানো ও ভিডিও আপলোড করার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশে এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক। এ কারণে ঢাকার বাইরে, এমনকি গ্রাম পর্যন্ত এদের ব্যবহারকারী বেড়ে চলেছে।

র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, টিকটক-লাইকিসহ বিতর্কিত অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব লাইকি ও টিকটক তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিটি গ্রুপের একজন অ্যাডমিন থাকে। সেই অ্যাডমিনের প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ১৫ জন তরুণ-তরুণী কাজ করে। এ পর্যন্ত ৪০টি গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। আর তাতে পাঁচ শতাধিক তরুণ-তরুণী জড়িত।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের রাজনৈতিক ও আইসিটি বিভাগের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিকটক নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কাজ করছে। টিকটক অ্যাপ বন্ধের কাজটা করবে আইসিটি মন্ত্রণালয়। তবে আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে তা বন্ধ করতে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে যাদের চিহ্নিত করা গেছে, তাদের আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, লাইকি, টিকটক, ইমো, মাইস্পেস, ফেসবুক, ইউটিউব, স্ট্রিমকার, হাইফাইভ, বাদু ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী ধরনের অপরাধ হচ্ছে, তা নজরদারি করা হচ্ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, টিকটক অ্যাপ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে টিকটক হৃদয়, অপু, সজীব, নয়ন বন্ড, সুজন ফাইটারের মতো অপরাধীরা। এসব কিশোর গ্যাং যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই-রাহাজানি থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডের মতো বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনলাইনভিত্তিক এসব গ্যাং কালচার রোধে সাইবার নজরদারি করা হচ্ছে। পৃথিবীর কোন কোন দেশে টিকটক-লাইকির মতো অ্যাপ বন্ধ করেছে এবং করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক রয়েছে। সেই বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া টিকটক হৃদয় একটি গ্রুপের অ্যাডমিন। গত বছরের শেষের দিকে সেই গ্রুপের মাধ্যমে গাজীপুরের একটি রিসোর্টে ৭০০ থেকে ৮০০ তরুণ-তরুণী পুল পার্টিতে অংশ নেয়। তরুণ-তরুণীরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে মূলত টিকটক ভিডিও তৈরি করতে গিয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপে সংযুক্ত হয়। এরপর তাদের ভারতে পাচারও করে তারা। সম্প্রতি এক তরুণী ভারতের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে হাতিরঝিল থানায় মামলা দায়ের করেছেন। সেই মামলায় এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ওই মামলার তদারক কর্মকর্তা তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লাইকি-টিকটক সুস্থ কোনো বিনোদন হতে পারে না। এগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সময় এসেছে। যারা এগুলো চালাচ্ছে, তাদের আমরা খুঁজে বের করছি। আমরা তদন্তে নেমে এরই মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছি।’

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের প্রধান খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘টিকটক-লাইকির নামে যারা অশ্লীল ভিডিও তৈরি করছে, তাদের বিষয়ে তথ্য নেওয়ার জন্য দেশের সব ব্যাটালিয়নকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসবের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা করা হচ্ছে।’ তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন। তথ্যদাতাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে।’

যেভাবে তৈরি হয় টিকটক : টিকটক অপু (ইয়াসিন আরাফাত অপু) গত বছরের ২ আগস্ট ঢাকার উত্তরায় কয়েক বন্ধুসহ সড়ক বন্ধ করে দিয়ে টিকটক তৈরির জন্য ভিডিও করছিলেন। সেখানে একজনের গাড়ি আটকে যায়। পরে তাঁর সঙ্গে অপুর মারামারির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে উত্তরা পূর্ব থানায় সেই গাড়িচালকের করা মামলায় গ্রেপ্তার হন অপু। তাঁর তৈরি করা সেই টিকটক ভিডিওতে দেখা যায় রঙিন চুল ঝাঁকিয়ে অপু বলছেন—‘নামটা শুধু মনে রেখো, অপু বাই...।’ এটুকু বলে আরেকটা হাসি দেন। এভাবেই ছোট্ট ভিডিওর মাধ্যমে তৈরি হয়ে যায় টিকটক আইটেম। 

ভারতের কেরালায় সম্প্রতি বাংলাদেশি এক তরুণী নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে থাকা তরুণদের গ্রেপ্তারের পর জানা যায় যে এ ঘটনার হোতা হৃদয়। তিনি ‘টিকটক হৃদয়’ নামে পরিচিত। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে আলোচনায় আসে টিকটক নামের অ্যাপটি। দেশে এই দুটি অ্যাপের ব্যবহারকারীর পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। আর এসবের ব্যবহারকারী বেশির ভাগই কিশোর বা তরুণ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জেই লাইকি ও টিকটক গ্রুপের সংখ্যা বেশি। সম্প্রতি তা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। গাজীপুরে টিকটক-লাইকি বানানোর জন্য একদল তরুণী ভাড়ায় পাওয়া যায়। তারা নিয়মিত এসব অশ্লীল ভিডিওতে কাজ করে। প্রতিটি কনটেন্টের জন্য তারা এক থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে থাকে। টিকটক ভিডিও নির্মাতাদের একজন রোহান আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টিকটক-লাইকি তৈরির জন্য তরুণীদের আলাদা গ্রুপ রয়েছে। অল্প টাকা দিয়ে তাদেরকে অভিনয় করানো যায়।’

কী ধরনের অ্যাপ : আইটি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চীনের তৈরি টিকটক অ্যাপটি মূলত স্মার্টফোনে ব্যবহারের। আর লাইকি তৈরি করেছে সিঙ্গাপুরের বিগো টেকনোলজি। এর মধ্যে টিকটক অ্যাপ তৈরি হয় ২০১৮ সালে। আর ২০১৭ সালে তৈরি হয় লাইকি। স্মার্টফোনে সহজে ব্যবহার উপযোগী হওয়ায় কম বয়সী ছেলে-মেয়ে ও তরুণরা এই অ্যাপগুলো বেশি ব্যবহার করে। টিকটকের ৪১ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়স ১৬ থেকে ২৪ বছর। পৃথিবীতে ৪০টি ভাষায় ১৫৫টি দেশে চলত এই টিকটক অ্যাপ। এর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানে এই অ্যাপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান। বর্তমানে পৃথিবীতে এর সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০ কোটির বেশি। টিকটকে বর্তমানে দুই থেকে আড়াই মিনিটের ভিডিও দেওয়া যায়। তবে শুরুতে ৫, ১০ ও ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও দেওয়া যেত।

বর্তমানে প্রতি মাসে লাইকির সক্রিয় ব্যবহারকারী সাড়ে ১১ কোটি। আগে এর নাম ছিল লাইক। পরে নাম বদলে করা হয় লাইকি। গত বছর আট কোটি ডলারের বেশি আয় ছিল লাইকির। জানা গেছে, এদের মূল আয় আসে বিজ্ঞাপন থেকে।

সাতক্ষীরায় গ্রেপ্তার ২ : ভারতে নির্যাতনের শিকার তরুণীকে পাচারের ঘটনায় টিকটকচক্রের আরো দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আমিরুল ইসলাম ও আবদুস সালাম মোল্লা নামের এই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।



সাতদিনের সেরা