kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

বাজেট প্রতিক্রিয়া

জীবন ও জীবিকার চমৎকার সমন্বয়

অধ্যাপক ড. মো. সেলিম উদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জীবন ও জীবিকার চমৎকার সমন্বয়

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ড. মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, কভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিতে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি জীবনকে সুরক্ষা অর্থাৎ স্বাস্থ্যঝুঁকিকে ন্যূনতম রাখার কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে জীবিকা তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রণয়ন ও ঘোষিত হয়েছে। সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, এই বাজেটে জীবন ও জীবিকার মধ্যে অত্যন্ত চমৎকার সমন্বয়ের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন—স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ইত্যাদির জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, কর অবকাশসহ নানা ধরনের কর ছাড় ও কর মওকুফের বিষয় অগ্রাধিকার পেয়েছে। গতকাল শুক্রবার ড. সেলিম কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন। 

ড. সেলিম উদ্দিন বলেন, বিগত বছরগুলোর বাজেট বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করলে এ ধারণা স্পষ্ট যে বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না এবং প্রস্তাবিত ব্যয় বরাদ্দ অব্যয়িত থেকে যাচ্ছে। যার কারণে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামোসহ অন্যান্য বরাদ্দের আওতায় পরিকল্পিত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হচ্ছে না। যার ফলে প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দকৃত মোট ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কেটি টাকা ব্যয়ের ফলে যে পরিমাণ সামাজিক কল্যাণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অবকাঠামোগত ব্যয়ের ধনাত্মক ফলাফল যেমন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব ও অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন হওয়ার অঙ্গীকার থাকে তা অর্জিত হয় না। তাই প্রস্তাবিত বাজেটের সুফল এবং সফলতা বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। ব্যয় পরিকল্পনা মাসিক ভিত্তিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিক আনুপাতিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। নতুবা গুণগত মান এবং কাজের প্রাপ্ত ফল পেতে অনিশ্চয়তা থাকে। উদাহরণস্বরূপ চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে সংশোধিত এডিপিতে প্রায় ১৩ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুকূলে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে ব্যয় হয়েছে চার হাজার কোটি টাকার মতো। যেটি বরাদ্দের ২৯ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে করোনাকালীন এই দ্বিতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি সৃষ্টিতে ঘোষিত বরাদ্দ, রাজস্ব প্রণোদনা, নতুন নতুন পলিসিসহ অবকাঠামোগত মেগাপ্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রয়োগের সব ব্যবস্থা নিশ্চিতপূর্বক রাজস্ব আদায় এবং ঘাটতি অর্থ সংস্থানে গতিশীল নেতৃত্বের সমাবেশ ঘটাতে পারলে ঘোষিত বাজেটের ফল ফলপ্রসূ এবং ইতিবাচক হবে।

চলতি বছরের (২০২০-২১) এবং প্রস্তাবিত বাজেট ২০২১-২২ দুটি করোনাকালীন বাজেটে করোনা মোকাবেলা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ঘোষিত বিভিন্ন নীতি, কৌশল, প্রণোদনাগুলো কার্যকর বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন সময় গৃহীত সরকারের মৌলিক অঙ্গীকারগুলো যেমন : প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ২৩টি প্যাকেজের প্রায় এক লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা প্রণোদনার সময় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ে কর্মসৃজনকে প্রাধান্য, বিলাসী ব্যয় হ্রাস ও নিরুৎসাহী করা, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ প্রবর্তনের সুবিধা চালু রাখা, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতাধীন এবং বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি যাবতীয় কার্যক্রম চালু রাখাসহ সুষ্ঠু বাস্তবায়নে অধিক কঠোরতা প্রত্যাশা করছি। উদাহরণস্বরূপ ২৩টি প্যাকেজের বিশাল প্রণোদনা এখনো কুটির, অতিক্ষুদ্র, অতি ছোট, মাঝারি, অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে নিয়োজিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক এবং রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর বিভিন্ন কারণে প্রত্যাশিত প্রণোদনার অর্থ ছাড় হয়নি। যথাযথ পদ্ধতি প্রবর্তনপূর্বক সিএমএসএমই খাতে প্রণোদনার অর্থ ছাড় করাসহ অধিক সহায়তা দিলে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি তেজীকরণ এবং চাহিদা বৃদ্ধি ইত্যাদিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

ড. সেলিম বলেন, এই বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট এক লাখ সাত হাজার ৬১৪ কোটি টাকার বরাদ্দ, যেটি বাজেটের ১৭.৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩.১১ শতাংশ। এই খাতে সরকার ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ১৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল, যেটি চলতি বাজেট ২০২০-২১-এ প্রায় সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বয়স্ক ভাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধীদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন, নগদ সহায়তাসহ প্রায় ১৩০টির ওপরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কুটির, অতিক্ষুদ্র, অতি ছোট, মাঝারির (সিএমএসএমই) সহায়তা, স্বাস্থ্য খাতে নানা কর্মসূচি, কৃষিতে গুরুত্ব এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজেটে অতি দরিদ্রের হার ১২.৩ শতাংশ থেকে ২০২৩-২৪-এর মধ্যে ৪-৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এই চিন্তা-চেতনা বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য দিক বলে আমি মনে করি।’

অধ্যাপক সেলিম উদ্দিন বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য এবং গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেশন থামানোর লক্ষ্যে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ গ্রামীণ রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও সংস্কার, যোগাযোগহীন গ্রামের মধ্যে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, একটি বাড়ি একটি খামার ইত্যাদিসহ নানা প্রকার কর্মসূচি সম্পাদনে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪১ হাজার ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ ঈপ্সিত অতি দরিদ্রের হার কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশি শিল্পকে সুরক্ষা, করোনাজনিত কারণে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য নতুন শিল্প স্থাপন ও বর্তমান শিল্প সম্প্রসারণে এবং সর্বোপরি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে অনেক ধরনের কর ছাড়, রাজস্ব সংস্কার ও রাজস্ব সহজীকরণ করা হয়েছে। কর ছাড়, কর অব্যাহতি, কর অবকাশ এবং কর কৌশলগুলোর মধ্যে অন্যতম টার্নওভার কর ০.৫% থেকে ০.২৫%, পাবলিক ও প্রাইভেট কম্পানির জন্য ২.৫% কর ছাড়, একক ব্যক্তি কম্পানির ক্ষেত্রে ৩২.৫% থেকে ২৫% কর হার, আয়শূন্য সম্পদের ওপর সারচার্জ বাতিল, ন্যূনতম সারচার্জ বিলুপ্ত, আমদানি পর্যায়ে শিল্পের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর ৪% থেকে ৩%, সিমেন্ট ও লোহাজাতীয় শিল্পের ক্ষেত্রে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর ৩% থেকে ২%-এ হ্রাস, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় মেগা শিল্পে ২০ বছর কর অবকাশ, হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও আইটি সংযোজন শিল্পের জন্য ১০ বছরের কর ছাড়, মানবসম্পদ উন্নয়নে পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপনে ১০ বছরের কর মওকুফ, পেরি-আরবান এলাকায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ছাড়া) হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ১০ বছরের কর অব্যাহতি, অটোমোবাইল, থ্রি হুইলার, ফোর হুইলার ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য কর ছাড়, এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টার্নওভার করমুক্ত রাখাসহ নান ধরনের কর প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কৃষি খাতে সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি আমদানিতে শূন্য শুল্ক অব্যাহত এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতির জন্য রেয়াতি শুল্ক হার সম্প্রসারণ এবং আমদানিকৃত বিভিন্ন ফল, শাকসবজির ওপর শুল্ক আরোপ দেশীয় কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করবে। ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ব্যবহার নিরুৎসাহের জন্য মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল সংযোজন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহার ছাড় দেওয়ার কারণে শিল্পগুলোকে টিকে থাকা এবং সম্প্রসারণে নতুন উদ্দীপনা পাবে।

ড. সেলিম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি অর্থায়ন দুই লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জিং। কেননা অভ্যন্তরীণ উৎস বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বাজেট অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাপ্রাপ্তসহ তারল্য সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সুতরাং রাজস্ব আহরণ এবং বৈদেশিক উৎস থেকে প্রাক্কলিত অর্থ যথাসময়ে সংগৃহীত না হলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এ জন্য রাজস্ব আহরণে এবং ঘাটতি অর্থায়নে বিশেষ করে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নে সাফল্য দেখাতে না পারলে প্রস্তাবিত বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কলাকৌশলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা অতীতের যেকোনো সময় থেকে বেশি নিতে হবে।

ড. সেলিম বলেন, বিগত তিন বছরে ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯ পর্যন্ত যথাক্রমে ৭.২৮, ৭.৮৬ এবং ৮.১৫ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আলোকে ২০১৯-২০ বছরে প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিশ্বব্যাপী করোনার প্রভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রাসী আক্রান্তে ৫.২ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮.২ শতাংশ এবং সংশোধিত হার ৬.২ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের (২০২১-২২) বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.২ শতাংশ ধরা হয়েছে। বাজার চাহিদাসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কভিড-১৯ পূর্ববর্তী অবস্থায় পুনর্বাসন হলে হয়তো এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা আমাদের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা। মুদ্রাস্ফীতি ৫.৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার প্রত্যয়ে বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে।