kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

সাক্ষাৎকার

উচ্চাভিলাষী নয় শিল্প সহায়ক বাজেট চাই

জসিম উদ্দিন, এফবিসিসিআই সভাপতি   

২৬ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উচ্চাভিলাষী নয় শিল্প সহায়ক বাজেট চাই

করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এর দ্বিতীয় আঘাতে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় শিল্প আবারও মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ সময় দেশের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে নতুন দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির ফেডারেশন এফবিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত সভাপতি জসিম উদ্দিন। গত রবিবার সংগঠনের নিজস্ব কার্যালয় মতিঝিলে তিনি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, করোনার প্রভাব, বাজেট ও এফবিসিসিআই নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এম সায়েম টিপু

 

কালের কণ্ঠ : দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নতুন সভাপতি হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। পাঠকের জন্য আপানার পরিকল্পনার কথা যদি বলেন।

জসিম উদ্দিন : এফবিসিসিআই ব্যবসায়ীদের ব্যবসাসংক্রান্ত স্বার্থ সুরক্ষা এবং সরকারের সঙ্গে নীতি সহায়তা নিয়ে কাজ করে। গত দেড় বছর কভিডের কারণে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। তবে প্রথম ধাপে সরকারের প্রণোদনা কোরামিনের মতো কাজ করেছে। এ সময় রপ্তানিসহ অনেক খাতের উপকার হয়েছে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্যও প্রণোদনা দেওয়া হলেও বিতরণব্যবস্থা ছিল বেশ বিলম্বিত। ফলে এই খাতের উদ্যোক্তারা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন আরো গতিশীল করতে এফবিসিসিআইয়ের সারা দেশের চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে আরো প্রণোদনা দরকার। এ জন্য সরকারের সঙ্গে কাজ করব।

 

কালের কণ্ঠ : করোনায় দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আপনার কী ভূমিকা থাকবে?

জসিম উদ্দিন : কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে তেমন বিনিয়োগ আসেনি। জিডিপির যে প্রবৃদ্ধি, তা হয়েছে সরকারের বড় বিনিয়োগের কারণে, বিশেষ করে মেগা প্রকল্পের কারণে। অবকাঠামোর অভাবে সুযোগ থাকলেও কাজে লাগানো যায়নি। এখনো সুযোগ আছে। ইউরোপ ও আমেরিকা এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। শিগগিরই তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য খুলবে। এ জন্য কভিডকে ভালোভাবে মোকাবেলা করতে হবে। বিদেশি ও স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অবকাঠামো ঠিক না হলে কোনো সুযোগ কাজে লাগানো যাবে না। সরকারের সুযোগ-সুবিধাগুলো রাজধানী থেকে সরিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এ জন্য সরকারের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করব।

 

কালের কণ্ঠ : ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রধান বাধা কী বলে মনে করেন?

জসিম উদ্দিন : সরকার বর্তমানে বৈশ্বিক নীতিমালা হিসেবে শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি করছে। আমি মনে করি, এখন সময় এসেছে দেশের অভ্যন্তরীণ খাত বিবেচনায় নিয়ে খাতভিত্তিক নীতি তৈরি করার। তৈরি পোশাক খাতের জন্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা উচিত। একইভাবে বস্ত্র, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল খাত নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। সম্ভাবনাময় খাতগুলো নিয়ে এসব নীতি তৈরি করা যেতে পারে। তবে এফবিসিসিআইয়ের এখানে বড় ব্যর্থতা, আমরা গবেষণা খাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারিনি।  বর্তমান বোর্ডের দৃঢ় পরিকল্পনা আছে এ বিষয়ে শক্তভাবে কাজ করার।

 

কালের কণ্ঠ : আসন্ন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে পরিকল্পনা কী?

জসিম উদ্দিন : সরকারের কাছে আমাদের মতামত পাঠানো হয়েছে। তবে আমি মনে করি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আগাম ভ্যাট নেওয়া বন্ধ করা উচিত। কেননা, বলা হয় এটা ফেরত দেওয়া হবে। তাহলে শুধু শুধু নেওয়া কেন? এ ছাড়া ফেরত নেওয়াটাও খুব সহজ নয়। এতে আমাদের খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া পাইকারি বিক্রেতাদের টার্নওভার ট্যাক্সের মধ্যে নিয়ে আসা উচিত। বর্তমানে ০.৫ শতাংশ হারে ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়। এটা তাদের জন্য বেশ বড় অঙ্ক। পণ্য বিক্রি করে তারা এতটা লাভ করতে পারে না। করপোরেট কর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। এটা কমিয়ে আনার দাবি জানিয়েছি সরকারের কাছে।

 

কালের কণ্ঠ : স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় কেমন বাজেট হওয়া উচিত?

জসিম উদ্দিন : দেশের বাজেট করার সময় অতি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়। বাস্তবে গত পাঁচ বছরে ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। এ বছর ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে গত অর্থবছরের চেয়ে। কভিডের এমন দুঃসময়ে আমরা উচ্চাভিলাষী বাজেট চাই না। আমরা চাই স্থানীয় শিল্প সহায়ক বাজেট, রপ্তানি খাতের শিল্পের ওপর যেন বাড়তি চাপ না আসে। করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে করের আওতা বাড়াতে চাই। এত দিন বলে এসেছি, এখন বাস্তবায়ন করা দরকার। বাজেটের আকার হবে বাস্তবায়ন ও অর্জনযোগ্য। বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান করেছে। অন্যদিকে ড্রেজারের ওপর আমদানি শুল্ক ধরা হয়েছে ৩১ শতাংশ। এর মানে, পরিকল্পনার কথা বলা হলেও একই সঙ্গে পরিকল্পনা যেন বাস্তবায়িত না হয় সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ড্রেজার দেশে উৎপাদন হয় না। এর ওপর এত শুল্ক রাখার মানেই হয় না।

নতুন ভ্যাট আইনেও অনেক বৈষম্য আছে। যেমন—তিন কোটি টাকা পর্যন্ত ভ্যাট রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন নেই বলা হলেও ভ্যাট কর্মকর্তা বলেন ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন করতে। কর দিতে হবে না বলে আশ্বাস দিয়ে আবার যারা ভ্যাটের আওতায় পড়ে না তাদেরও তালিকা করে মামলা করছে। কিছু কিছু জায়গায় সরকার পিসিআর মেশিন দিয়েছে ভ্যাট কালেকশন করতে। একই বাজারে ২০০ দোকানের মধ্যে ১০টিতে পিসিআর মেশিন দিচ্ছে, ১৯০টিতে পিসিআর নেই। সেখানে তারা গোপনে আঁতাত বা সমন্বয় করছে। এতে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। তাই দিলে পুরোটাই দেওয়া হোক।

 

কালের কণ্ঠ : আপনি কি মনে করছেন ভ্যাট পলিসিতে বৈষম্য আছে?

জসিম উদ্দিন : ভ্যাট পলিসি ও বাস্তবায়ন নিয়েও আছে বৈষম্য। যারা নীতি তৈরি করে তারা আবার নিজেরাই বাস্তবায়ন করে। ফলে এখানেও স্বার্থের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এ নিয়ে ২০০৯ সালে একটি এসআরও হয়—যারা পলিসি করবে তারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে না। এখন সময় হয়েছে একটা আলাদা কর্তৃপক্ষ করার।

 

কালের কণ্ঠ : এ জন্য কি এনবিআরে সংস্কার দরকার বলে মনে করেন?

জসিম উদ্দিন : প্রথমে অগ্রাধিকার দিতে হবে এনবিআরকে পুরোপুরি অটোমেশনে চলে যাওয়ায়। এসআইকোডের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। কর্মকর্তাদের ইচ্ছামতো পণ্যের অ্যাসেসমেন্ট করা যাবে না। রাজস্ব বাড়াতে করের আওতা বাড়াতে হবে। এ জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়েও যাদের কর দেওয়ার সামর্থ্য আছে, এমন জায়গায় যেতে হবে এনবিআরকে। এনবিআরে বর্তমানে প্রচুর লোকবলও আছে। গত দু-তিন বছরে অনেক নতুন লোক নিয়োগ হয়েছে। এদের কাজে লাগাতে হবে।