kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

‘আবিষ্কৃত’ আইনটিতে কাউকে দোষী করা কল্পনাতেই সম্ভব

ড. শাহদীন মালিক, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী

২১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘আবিষ্কৃত’ আইনটিতে কাউকে দোষী করা কল্পনাতেই সম্ভব

সম্প্রতি একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে আনা অভিযোগ বিশ্লেষণ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, আইনটি সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধে কতিপয় আমলার এক ধরনের আবিষ্কার। কিন্তু শতবর্ষ পুরনো এই আইনে ওই সাংবাদিককে অপরাধী করার কোনো সুযোগ নেই, বরং সরকারের নিরাপত্তাজনিত দলিল যদি পাচার হয়ে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারাই এই আইনের অধীনে অপরাধী হবেন। কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি কাজী হাফিজ।

 

কালের কণ্ঠ : বর্তমানে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট এবং এই আইন একজন সাংবাদিকের ওপর প্রয়োগের চেষ্টার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এটি আপনি কিভাবে দেখছেন?

শাহদীন মালিক :  এটি এক ধরনের আবিষ্কার। সাংবাদিকের কণ্ঠরোধে নতুন এই আবিষ্কারে চমত্কৃত না হয়ে পারা যাচ্ছে না। ১৯২৩ সালে প্রণীত আইনটি আছে প্রায় শতবর্ষ ধরে। এত দিন সম্ভবত আইনটি সরকারের গোচরীভূত ছিল না। লব্ধ প্রতিষ্ঠিত একজন সাংবাদিককে হেনস্তা ও হয়রানি করা এবং সংবাদমাধ্যমকে ভয়ভীতির নতুন বার্তা দেওয়ার জন্য হঠাৎ করেই এই পুরনো আইন আবিষ্কার করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

আমলাদের মধ্যে যাঁরা দুর্নীতি, লুটপাট যত বেশি করেন, তাঁরা এসব আবিষ্কারে বেশি উৎসাহী হন। সরকার আসে যায়, কিন্তু আমলারা থাকেন বহাল তবিয়তে। তাই আকাম, কুকাম করার অভিজ্ঞতাও তাঁদের মধ্যে অনেকেরই অনেক বেশি। তাঁরা আইনটি আবিষ্কার করেছেন ঠিকই, কিন্তু পড়ে দেখার সময় সম্ভবত কেউই এখনো পাননি। অথবা পড়লেও অর্থ ঠাওর করতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে না।

পুরো আইনটি পড়লে এটি সহজে বোধগম্য হতো যে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত গোপনীয় তথ্য, মডেল, প্ল্যান, নকশা ইত্যাদি গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে শত্রুপক্ষের কাছে পাচার করার অপরাধ এবং এ অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্যই আইনটি করা হয়েছিল।

এই আইনের মূলকথা হলো, প্রথমত—নিষিদ্ধ স্থান থেকে মডেল, প্ল্যান, নকশা পাচার করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত—এই আইনে দায়ী করা হয়েছে সরকারের সেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের, যাঁদের কাছে গচ্ছিত সরকারের নিরাপত্তাজনিত দলিল যদি পাচার হয়ে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা এই আইনের অধীনে অপরাধী হবেন।

এই আইনে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, সেনাঘাঁটি ইত্যাদির তথ্যপাচারের কথা বলা আছে। এই আইনের অপরাধের অভিযোগে সেনা সদস্যদের নিষিদ্ধ এলাকা বা এলাকার আশপাশে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এই আইনের বিচারও আমাদের সাংবিধানিক উন্মুক্ত বিচারের রক্ষাকবচকে বাতিল করে গুপ্ত বিচারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

আইনটির উপরোক্ত সংশ্লিষ্ট আলোচনা থেকে এটি নিশ্চয় প্রতীয়মান হবে যে শুধু কল্পনায় বিচরণ করলেই ভুক্তভোগী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে এই আইনের অধীনে শত্রুরাষ্ট্রের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায়। তাই বলছিলাম, সরকার এই নতুন আবিষ্কার এখনো ঠাওর করতে পারেনি।

 

কালের কণ্ঠ : স্বাস্থ্যমন্ত্রী রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে বলেছেন, বিষয়টি দুঃখজনক। কেননা এই ফাইলগুলো ছিল টিকাসংক্রান্ত। আমরা যে রাশিয়ার সঙ্গে টিকার চুক্তি করছি, চীনের সঙ্গে টিকার চুক্তি করছি। সেগুলো নন-ডিসক্লোজার (গোপন) আইটেম। আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে বলেছি, আমরা এটি গোপনে রাখব, এগুলো বলব না। সেগুলো যদি বাইরে চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলাম এবং আমরা টিকা না-ও পেতে পারি। এতে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য বিরাট ক্ষতি হতে পারে। এগুলো সিক্রেট ডকুমেন্ট, বাইরে নেওয়ার চেষ্টা ঠিক হয়নি। মন্ত্রীর এই বক্তব্য সম্পর্কে কী বলবেন?

শাহদীন মালিক : বড় বড় বাণিজ্যিক লেনদেনের চুক্তিতে গোপনীয়তা রক্ষা একটি অতি সাধারণ, নিয়মিত ও মামুলি শর্ত। দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তিতে এ ধরনের শর্ত থাকলে তৃতীয় কোনো পক্ষ ওই চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ করলে (এ ক্ষেত্রে আলোচিত সাংবাদিক) চুক্তিবদ্ধ পক্ষের কেউ (এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) শর্তভঙ্গের দোষে দোষী হবে না। তা ছাড়া টিকা ক্রয়ের চুক্তিতে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য বা ফর্মুলা থাকার কথা নয়।

 

কালের কণ্ঠ : সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী বলেছেন, ভুক্তভোগী সাংবাদিকের সুবিচার নিশ্চিত করা হবে।

শাহদীন মালিক : সুবিচার বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। তবে সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের পর মন্ত্রীবর্গের বাণী শুনে প্রচণ্ডভাবে আশ্বস্ত হয়েছি। অনেকেই জোর গলায় বলছেন, এ সাংবাদিক যাতে সুবিচার পান, তা নিশ্চিত করা হবে। স্পষ্টতই বিচার কার্যক্রম এখন নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে কিছু মন্ত্রী ও সরকারি দলের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন যে কোন মামলার সুবিচার, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। বাকি মামলার সুবিচার, ন্যায়বিচার ঘটবে লেখক মুশতাক, সাংবাদিক কাজলদের পরিণতির মতো।

 

কালের কণ্ঠ : বর্তমান পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শাহদীন মালিক : কোনো দেশে গণতন্ত্র যত হ্রাস পায়, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার প্রয়াস তত জোরালো হয়। ৪০ থেকে ৫০ বছর আগের প্র্যাকটিসের তুলনায় বর্তমানকালে গণতন্ত্রহীন ও স্বল্প গণতন্ত্রের দেশে সংবাদ ও বাকস্বাধীনতা সীমিত ও খর্ব করার চেষ্টাগুলো করা হয় তথাকথিত আইনের একটা ছদ্মাবেশ পরিয়ে। অতীতে পত্রিকা অফিস বন্ধ করে দিয়ে, ডিক্লারেশন বাতিল করে, ছাপাখানা জব্দ করে সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরা হতো। লাঠিপেটাও করা হতো। এখন একই কাজ করা হচ্ছে তথাকথিত আইন ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে। একটি মামলা দিয়ে বছরের পর বছর তদন্তের নামে বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করার কাজটি করা যায় আরো সুচারুভাবে। এতে অভিযুক্ত সাংবাদিকের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদমাধ্যম এবং বাকস্বাধীনতায় যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁদের এমন ভয় দেখানো হয় যে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই এসব মৌলিক অধিকার বিসর্জন দিতে বাধ্য হন। আর সরকার তখন সমালোচনার ঊর্ধ্বে থেকে তার কল্পিত উন্নয়ন কাহিনি প্রচার করতে পারে আরো জোরেশোরে।

 

কালের কণ্ঠ : এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী?

শাহদীন মালিক : অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে সাংবাদিক গ্রেপ্তারের সাম্প্রতিক ঘটনায় দেশে-বিদেশে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, দল-মত-নির্বিশেষে বিরাট জনগোষ্ঠী যেভাবে নিন্দায় সোচ্চার হয়েছে, তা থেকে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ও অভাবিত ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিকের সম্ভাবনাও নিশ্চয় উজ্জ্বল হয়েছে। অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের যে সংগ্রামী প্রতিবাদের ইতিহাস, তা ইদানীং কিছুটা ম্লান নিশ্চয় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একসময় আমাদের প্রতিবাদী চেতনা, যেটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, সেটি জেগে উঠতে বাধ্য।

 

কালের কণ্ঠ : সার্বিক এই পরিস্থিতিতে আমরা সরকারের কাছে কী আশা করতে পারি?

শাহদীন মালিক : প্রতিটি সরকারই ভালো কাজ করে, মন্দ কাজও করে। ত্রুটিবিচ্যুতি সব সরকারের জন্যই স্বাভাবিক। ইদানীংকালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে, ফরিদপুরে সরকারি দলের নেতাদের গ্রেপ্তার ও মামলায় এবং এ ধরনের আরো কিছু পদক্ষেপে সরকারের কিছুটা বোধোদয় হয়েছে বলে আশা করা যায়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করে, জেলে পুরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রোধ বা খর্ব করাতে কোনো কল্যাণ আসবে না। এতে প্রতিবাদ আরো জোরালো হবে।