kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

দুর্নীতির কেনাকাটায় দায়মুক্তির ফন্দি

তৌফিক মারুফ   

১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্নীতির কেনাকাটায় দায়মুক্তির ফন্দি

দেশে করোনার শুরুর দিকে স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটায় বড় ধরনের যে কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে এসেছে, তা থেকে দায়মুক্তি পেতে পথ খুঁজছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কেনাকাটার ৩৪৩ কোটি টাকার বিল অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে সেই বিল পরিশোধে আপত্তি বা সেই অনিয়মের দায় নিতে নারাজ এখন। বিষয়টি সুরাহার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদসচিবসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় চলতি মাসের ২ তারিখ চিঠি পাঠিয়েছেন অতিরিক্ত সচিব ও সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোরস ডিপোর (সিএমএসডি) পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান। তিনি গত বছরের ৩ জুন সিএমএসডির পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার আগে এসব কেনাকাটা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন।

তবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব লোকমান হোসেন অনিয়মের কেনাকেটার ওই বিল পরিশোধে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্র মতে, সচিবের দপ্তর মনে করছে, বকেয়া বিল পরিশোধ করে দিলেই বিষয়টি আর আলোচনায় থাকবে না এবং প্রসঙ্গটি ধামাচাপা পড়ে যাবে।

আগের এই বড় দুর্নীতির রেশ কাটতে না কাটতেই এখন আবার প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকার কেনাকাটার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নতুন একটি চক্র এই কেনাকাটা নিয়ে ভেতরে-ভেতরে শুরু করেছে নানামুখী তৎপরতা। কিছু ক্ষেত্রে আগের মতোই অনিয়মও ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বর্তমান সচিব লোকমান হোসেন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসব কেনাকাটায় সুযোগ পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে অতিরিক্ত সচিবের আপত্তি সত্ত্বেও আগের ওই অনিয়ম ও দুর্নীতি করা কেনাকাটার বিল পরিশোধে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন জানা গেছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারদের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবাসচিবের একাধিক বৈঠক হয়েছে বলেও মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া ওই দুর্নীতির পুরো বিষয় ধামাচাপা দিতে বর্তমান সচিবের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন মাধ্যমে অসংগতিপূর্ণ, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কেনাকাটার বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও ইঙ্গিত রয়েছে অতিরিক্ত সচিবের চিঠিতে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব লোকমান হোসেনের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই পরিষ্কার যে সরকারি কোনো কিছু কেনাকাটার ক্ষেত্রে বিধি-বিধান না মেনে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে সরকারি কোনো চক্র যেমন জড়িত থাকে, তেমনি সরবরাহকারীরাও জড়িত থাকে। ফলে যখন সরকারেরই কোনো কর্তৃপক্ষ এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি ধরে ফেলেছে, তখন পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত সবাইকেই আইনগতভাবে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। এ ক্ষেত্রে কার্যাদেশ যারা দিয়েছে, তাদেরও বিভাগীয় বিধি অনুসারে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আবার যারা বিধি-বিধান ছাড়াই সরবরাহ করেছে, তাদেরও ছাড় দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের বিল ছেড়ে দিলে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমাণ করার কোনো সার্থকতা থাকবে না এবং দুর্নীতি ধরেও কোনো লাভ হলো না। বরং দুর্নীতি ও অনিয়মের বড় দায়মুক্তি পেয়ে যাবে জড়িতরা। ভবিষ্যতের জন্যও বিষয়টি খরাপ হবে।’

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সরকারি দপ্তরে যারা ঠিকাদারি করে তাদের ভালো করেই জানা আছে কার্যাদেশ পেতে হলে কী কী প্রক্রিয়া ও বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হয়। কোনো সরকারি দপ্তর যদি সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে থাকে এবং সরবরাহকারীরা মালপত্র সরবরাহে রাজি হয়, তবে বুঝতে হবে তারা জেনে-বুঝেই অন্যায়ে অংশ নিয়েছে অবৈধ মুনাফার আশায়।’

তবে পেছনের ওই দুর্নীতির পরোক্ষ দায়মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে অতিরিক্ত সচিব তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, কভিড-১৯ মোকাবেলায় সিএমএসডির ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংগৃহীত ৫৭টি প্যাকেজের মালপত্রের বিল পরিশোধ বাবদ ৩৪৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা গত ১২ এপ্রিল অর্থ বিভাগ থেকে বরাদ্দ করা হয়েছে। ওই বাজেট বরাদ্দ করা হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ এই কেনাকাটায় প্রযোজ্য আর্থিক বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে আটটি সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। এর মধ্যে রয়েছে ওই কেনাকাটায় পিপিআর-২০০৮-এর আওতায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি, বিপুল অঙ্কের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ অনুযায়ী অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, কোনো নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি করা হয়নি, জামানত নেওয়া হয়নি, সরবরাহ চুক্তি করা হয়নি, ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন ও চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াই সরবরাহ আদেশ বিধিসম্মত হয়নি (মালপত্র সরবরাহ সময়সীমা, দাম নির্ধারণ, শর্ত—কিছুই নেই), কার্যাদেশের বিপরীতে কোনো জরিপ ছাড়াই মালপত্র গ্রহণ করা হয়েছে এবং সর্বোপরি কেনাকাটার সময় কোনো বাজেটও বরাদ্দ করা হয়নি।

অতিরিক্ত সচিব মোরশেদ জামান উল্লেখ করেন, এসব বহাল রেখে আলোচ্য বিল পরিশোধের আইন ও বিধিগত কোনো সুযোগ নেই। অথচ এ ধরনের একটি অসংগতিপূর্ণ বিষয় সমাধানের প্রচেষ্টা এবং বাজেট বরাদ্দের কারণে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিএমএসডির ওপর আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করছে।

চিঠির আরেক অংশে বলা হয়েছে, এ ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ে কোনো সাধারণ অব্যাহতি বা ছাড় প্রদান না করে বা অন্য কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক সমাধান না করে সেগুলো বহাল রেখে বিল পরিশোধ করলে ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবে বিশাল অঙ্কের অডিট আপত্তি ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বিষয়গুলোর যৌক্তিক সমাধানপূর্বক ২০২০ সালের জুন মাসের আগে অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে সিএমএসডিকে কভিড-১৯ চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধের বিষয়টি নিষ্পত্তিকল্পে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’

অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাবর ওই চিঠি দিলেও অনুলিপি দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদসচিব, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সিপিটিইউয়ের মহাপরিচালক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একান্ত সচিবকে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সিএমএসডির পরিচালক প্রথমে গত ৯ ফেব্রুয়ারি এসংক্রান্ত একটি চিঠি দেন। পরে গত ২ মে আরেকটি চিঠি দেন। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পথ বের করতে পারেনি মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব ও সিএমএসডির পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।