kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

বাড়ি ফেরা কঠিন, থেকে যাওয়া আরো কঠিন

ওমর ফারুক ও শরীফুল আলম সুমন   

১১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাড়ি ফেরা কঠিন, থেকে যাওয়া আরো কঠিন

রাজধানী থেকে শুরু। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে ট্রলারে পদ্মার মাঝে চর পর্যন্ত। দুর্গম যাত্রার এই পর্যায়ে নৌকা, গন্তব্য নদীশাসন এলাকার জাজিরা শিবচর প্রান্ত। তারপর অটোরিকশা বা অন্য যানে বাড়ি ফেরা। ছবি : প্রদ্যুৎ কুমার সরকার

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকাতে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে সরকার। বন্ধ রয়েছে লঞ্চ-ট্রেনও। ঈদ উপলক্ষে মানুষের ঢল থামাতে দুই দিন বন্ধ ছিল পাটুরিয়া-মাওয়া ঘাটের ফেরি চলাচলও। পথেঘাটে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, বিজিবি। এর পরও বিভিন্নভাবে বাড়ি যাচ্ছে মানুষ। একদিকে করোনার ভয়, অন্যদিকে অনেক কষ্ট সহ্য করে, কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন বাড়ি যাচ্ছে মানুষ—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে কথা হয়েছে বহু মানুষের সঙ্গে। প্রত্যেকেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। শোনা যাক কী বলছেন তাঁরা—  

ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন রুস্তম আলী। মাগুরায় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য গতকাল সোমবার যাত্রাবাড়ীতে যানবাহন খুঁজছিলেন। কেন বাড়ি যাচ্ছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঈদের বেশ কিছুদিন তেমন কোনো কাজ থাকবে না। ঢাকায় থাকলে জমানো টাকা ভেঙে খেতে হবে। বাড়িতে বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানরা পথ চেয়ে আছে। তাই বাড়ি যাচ্ছি।’

ঢাকায় পাঠাওয়ে মোটরসাইকেল চালান আব্দুর রাজ্জাক। পাটুরিয়া ঘাটে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘করোনা শুরুর পর থেকে খুব বেশি আয় হচ্ছে না। আর ঈদের সময় যারা ঢাকায় থাকবে তারাও তেমন ঘর থেকে বেরোবে না। যে মেসে থাকতাম সেটাও বন্ধ থাকবে বেশ কিছুদিন। তাই গ্রামের বাড়ি বরিশালে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।’

পটুয়াখালীর গনি মিয়া উত্তরার একটি গার্মেন্টে চাকরি করেন। তিনি মাওয়া ঘাটে ফেরিতে পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলেন, ‘কারখানা ছুটি হয়ে গেছে। এখন ঢাকায় থেকে কী করব? তাই বাড়ি যাচ্ছি।’

মানিক মিয়া মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরের একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন। তিনি জানান, ‘সারা বছর তো আর সময় পাই না। দুই ঈদেই বাড়ি যাই। ঈদ করার চেয়েও বড় কথা বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখতে যাচ্ছি।’

পুরান ঢাকায় পরিত্যক্ত কাগজ ও বোতলের ব্যবসা করেন দেলোয়ার খান। তিনি বলেন, ‘ঈদের পরে অন্তত ১৫ দিন আমাদের কাজ থাকবে না। তাই বাড়ি যাচ্ছি। এই সময়ে বাড়িতে থাকলে নিজের জমিজমায়ও কিছু কাজ করা যাবে।’

সরকারি তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র নাসির আহমেদের সঙ্গে গতকাল দুপুরে যাত্রাবাড়ী মোড়ে ফ্লাইওভারের নিচে কথা হয়। তিনি একটি বড় ব্যাগ নিয়ে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট এলাকায় যাওয়ার জন্য গাড়ি খুঁজছিলেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কলেজ বন্ধ থাকলেও টিউশনির জন্য ঢাকায় থাকছি। রামপুরায় একটি মেসে এক রুমে তিনজন থাকি। অন্য রুমমেটরা গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছেন। রান্না করে দেওয়ার বুয়াও ছুটি নিয়ে চলে গেছেন। এ অবস্থায় আর ঢাকায় থাকা সম্ভব নয়। তাই যেভাবেই হোক আমাকে গ্রামের বাড়ি যেতেই হবে।’

শুধু রুস্তম আলী, আব্দুর রাজ্জাক, গনি মিয়া, মানিক মিয়া, দেলোয়ার খান বা নাসির আহমেদই নন, তাঁদের মতো হাজার হাজার মানুষ শুধু ঈদ করার জন্যই বাড়ি ফিরছেন না, এর পেছনে আরো নানা কারণ রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীতে যারা ব্যাচেলর থাকে তাদের ঈদে বাড়ি যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার ঢাকায় থাকার চেয়ে কষ্ট হলেও বাড়িতে যাওয়াকেই যুক্তিযুক্ত মনে করছে।

জানা গেছে, রাজধানীতে থাকা ব্যাচেলরদের বেশির ভাগই সাধারণত রেস্টুরেন্টে বা মেসে খেয়ে থাকেন। কিন্তু ঈদের ছুটিতে রেস্টুরেন্টসহ বেশির ভাগ দোকানই বন্ধ থাকে। এমনকি রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়াতেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে এই ধরনের ব্যাচেলরদের বাড়িতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। এই তালিকায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন। 

এ ছাড়া অনেক ব্যাচেলর আছে যারা কাজ শেষে দোকানে বা অফিসেই ঘুমায়। টয়লেট ও গোসলের কাজ সারে কোনো মার্কেটের বাথরুম অথবা কোনো বাসাবাড়ির বাথরুমে। ঈদের ছুটিতে এসব মার্কেট ও বাসাবাড়ি বন্ধ থাকে। ফলে তারাও বাড়ি যায়।

ঈদের পর অন্তত ১৫ দিন আগে থেকে এক মাস অনেক পেশার লোকজনেরই কোনো কাজ থাকে না। বিশেষ করে যারা বিভিন্ন প্রেসসহ উৎপাদনমুখী ছোট ছোট কারখানায় কাজ করে তারা সাধারণত কাজের ওপর ভিত্তি করে মজুরি পায়। কিন্তু ঈদের পর বেশ কিছুদিন পর্যন্ত তাদের কাজের কোনো অর্ডার থাকে না। ফলে তারা কষ্ট করে হলেও যেকোনো উপায়েই হোক বাড়ি যায়।  গার্মেন্টের শ্রমিকরা সারা বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকে, বলতে গেলে আত্মীয়-স্বজন কারো সঙ্গেই দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। শুধু দুই ঈদে বাড়ি যায়। তখন যেন তারা শান্তি ফিরে পায়। তাই ঈদে তারা যেকোনোভাবেই হোক বাড়ি যায়। তাদের হাতে কত দিনের ছুটি আছে সেটাকে তারা পাত্তাই দেয় না।    

রাজধানীতে কর্মজীবী, শ্রমজীবী, ছোট চাকুরে, হকার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নিম্ন আয়ের মানুষজন ছোটে ফ্ল্যাটে বা বাসায় থাকে। তাদের পাশে কারা থাকে তাও হয়তো তারা জানে না। এই করোনায় তাদের অনেকেই কর্মহীন বা আয় কমে গেছে। ঢাকায় থেকে তারা কারো কাছে সাহায্যও চাইতে পারছে না। আবার কেউ দিচ্ছেও না। অথচ গ্রামে গেলে এই ঈদে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছ থেকে ফিতরা, জাকাত, দান, সাহায্য বা নতুন কাপড়-চোপড় পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে তারাও বাড়ি যাচ্ছে।

এ ছাড়া ঈদে অফিস বন্ধ থাকায় মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করতে অনেকেই কষ্ট করে হলেও বাড়িতে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের সঙ্গে এই শ্রেণির মানুষের কাজ ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু জীবিকার তাগিদেই তারা এসেছে। তাই ঝুঁকি নিয়ে হলেও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে তারা গ্রামের বাড়িতে ছুটছে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আমাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মাসুদ খান ও মানিকগঞ্জের আঞ্চলিক প্রতিনিধি মারুফ হোসেন)