kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

মমতার সরকারকে ঢাকার শুভ কামনা

► স্বস্তির ফল বলছেন বিশ্লেষকরা
► মীমাংসিত ইস্যুগুলো দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা

মেহেদী হাসান   

৩ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মমতার সরকারকে ঢাকার শুভ কামনা

ফল ঘোষণার দুই সপ্তাহ আগে কালের কণ্ঠ’র এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য। সেখানে নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের জয় যখন নিশ্চিত তখন আবারও প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক দেশ। জনগণ জানে, কাকে ভোট দিতে হবে, কাকে দিতে হবে না। যাকে ভালো মনে করেছে তাকে ভোট দিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভারতের সব দলের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের প্রায় সব দল মোটামুটিভাবে পছন্দ করে, ভালোবাসে। যে সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে তার সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করি।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। এর পরও সীমান্তলাগোয়া ভারতের পাঁচটি রাজ্যের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক আছে বাংলাদেশের। এ ছাড়া ওই রাজ্যগুলোর মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনও আছে। আন্তঃসীমান্ত অনেক ইস্যুতে ওই রাজ্যগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। ওই রাজ্যগুলোতে নতুন সরকার এলে বাংলাদেশ থেকে তাদের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো হয়। ভারতের রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণমন্ত্রীর সমান মর্যাদা পান। সেই হিসেবে রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীর বাংলাদেশে কাউন্টার পার্ট (সমকক্ষ) পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তবে ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হওয়ার পর মমতাকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুসম্পর্কের কথা সবারই জানা। বিভিন্ন উপলক্ষে তাঁরা পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানান। এ পর্যন্ত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিসহ প্রায় সব ইস্যুতেই মমতার সরকার সহযোগিতা করে আসছে। তিস্তা ইস্যু নিয়ে মমতার অবস্থান আছে। তাঁর যুক্তি হলো, ভাগাভাগি করার মতো পানি তিস্তায় নেই। পশ্চিমবঙ্গেই তিস্তার পানিপ্রবাহে ঘাটতি আছে।

এদিকে ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকার পশ্চিমবঙ্গের সম্মতি সাপেক্ষে বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ভারতের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ইঙ্গিত ছিল, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে নির্বাচনের পর তারা দ্রুত তিস্তাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানিবণ্টন ইস্যু সুরাহা করতে চায়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সম্পৃক্ত নদ-নদীগুলোর পানি ইস্যুর সুরাহা করতে হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর আগের অবস্থান বদলান কি না সে বিষয়েও সবার দৃষ্টি থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুতে মমতার ওপর যেভাবে দোষ চাপানো হচ্ছে তা যথার্থ নয়। ভারত সরকারের উচিত পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি সিকিমকেও তিস্তা নিয়ে আলোচনায় যুক্ত করা। কারণ সিকিমে বাঁধের কারণে পশ্চিমবঙ্গ তিস্তার পানি পাচ্ছে না।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়কে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির বলছেন বিশ্লেষকরা। ওই নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, ক্ষমতায় এলে রাজ্যের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তারা আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকপঞ্জি করার সিদ্ধান্ত নেবে। এটি অনেক মানুষের অশান্তির কারণ হতো। আপাত দৃষ্টিতে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে না পারায় নাগরিকপঞ্জি হালনাগাদ করার ভাবনা ভেস্তে যাচ্ছে।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, এই নির্বাচনে বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে ভালো করত তাহলে ভারতের আরো বিপদ আসত। ভারত এরই মধ্যে বিজেপির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিপদে পড়েছে। জনগণ যে বুঝতে পারছে তা এই নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট।

তিনি বলেন, ‘বিজেপি একের পর এক যেভাবে রাজনীতি করছিল এবং বড় আকারে দ্বিজাতিতত্ত্বটাকে সামনে নিয়ে আসছিল তা ভারতের জনগণ প্রত্যাখ্যান করছে। বিশেষ করে আমি যদি পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালার দিকে দেখি তা স্পষ্ট।’

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পশ্চিমবঙ্গে যে সেক্যুলার চিন্তাধারা সেখান থেকে যদি আজকে বিজেপি ভালো করত তাহলে আমরাও চিন্তিত হয়ে পড়তাম। কারণ আমরা তো সেই একাত্তরে দ্বিজাতিতত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমরা আশা করব, যে কয়েক বছর নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে থাকবে, তারা তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনবে।’

এদিকে ভারতের নির্বাচনে সব সময় গণতন্ত্রের বিজয় হোক—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের যেকোনো নির্বাচন সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। যারাই ভারতে সরকার গঠন করুন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও পাশের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যে নৈকট্য, তা যেন আরো গভীরে প্রোথিত হয় এবং আমাদের দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান হোক, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই, ভারতে সব সময় গণতন্ত্রের বিজয় হোক।’

 



সাতদিনের সেরা