kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১০ আষাঢ় ১৪২৮। ২৪ জুন ২০২১। ১২ জিলকদ ১৪৪২

চাকরির আশা বহুদূর

শরীফুল আলম সুমন   

২৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চাকরির আশা বহুদূর

প্রতীকী ছবি

ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে দুই বছর আগে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন কৌশিক বিশ্বাস। চাকরি না পেয়ে এত দিন প্রাইভেট-টিউশনি করে চলতেন, কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে সেই প্রাইভেটও বন্ধ। বর্তমানে অনেকটা বোঝা হয়েই আছেন ভাইয়ের সংসারে।

কৌশিক বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাকরির সার্কুলার খুবই কম। কিছু পরীক্ষা দিয়েছি, চাকরি হয়নি। আরো কিছু আবেদনও করা আছে। এ মাসে একটা চাকরির পরীক্ষা স্থগিতও হয়েছে। আমরা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, এখন একটা পিয়নের চাকরি হলেও করব, কিন্তু সেটাও পাচ্ছি না।’

চার-পাঁচ বছর ধরেই দেশে শিক্ষিত ব্যক্তিদের জন্য চাকরির বাজার খুব কঠিন হয়ে উঠছিল। শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, যা পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছরের মার্চ থেকে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর চাকরির বাজার আরো কঠিন হয়ে ওঠে। চলতি বছরের শুরুতে করোনা কিছুটা কমলে আশার আলো দেখা গিয়েছিল, কিন্তু আবারও করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চাকরির বাজার।

জানতে চাইলে বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাশরুর কালের কণ্ঠকে বলেন, গত বছর করোনার প্রথম পর্যায়ে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চাকরির বিজ্ঞাপন কমে গিয়েছিল। এরপর নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত চাকরির বাজার অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ শুরুর পর এপ্রিল মাসে এরই মধ্যে ৫০ শতাংশ চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে। এখন এই অবস্থা যদি তিন-চার মাস অব্যাহত থাকে, তাহলে তা চাকরির বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনায় বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দ্বিগুণ হয়েছে। আগে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রতি ১০০ জনে গড়ে ১২ জন বেকার ছিলেন। এখন তা বেড়ে প্রায় ২৫ জন হয়েছে। এর সঙ্গে আছে পুরনো ২৭ লাখ বেকার। করোনার স্বল্প মেয়াদি প্রভাবে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান হারাতে পারে ১১ লাখ ১৭ হাজার যুব শ্রমশক্তি।

বেসরকারি সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের তথ্য মতে, দেশে কভিড-১৯-এর কারণে গত বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৩২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে। আর আয় কমেছে ৮৪ শতাংশ মানুষের। এমনকি যারা কাজ হারিয়েছে বা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

‘চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ চাই’ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাসলিমা লিমা বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষায় দেখা যায়, করোনায় বেকারত্বের হার ২০ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছে। প্রায় এক বছর পর ৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেশির ভাগ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষাগুলোও স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক লাখ শিক্ষার্থী সেশনজটে পড়েছে। তাই আমরা করোনাকালীন প্রণোদনা হিসেবে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর করার দাবি জানাচ্ছি।’

করোনার ঊর্ধ্বমুখীর কারণে সম্প্রতি ৪০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করেছে পিএসসি। এ ছাড়া নন-ক্যাডারের দুটি পরীক্ষাও স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। ৫ এপ্রিল থেকে ‘লকডাউন’ জারির পর তিতাস গ্যাস, সিলেট গ্যাস ফিল্ড, সেতু বিভাগ, পল্লী বিদ্যুৎ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ আরো কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করেছে। ইইডির বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগের জন্য ৯, ১৬, ২৩ ও ৩০ এপ্রিল পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। এতে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছেন। এ ছাড়া বেসরকারি খাতেও চাকরির বিজ্ঞপ্তি একেবারেই কমে গেছে। তবে দ্বিতীয় দফায় করোনার ঊর্ধ্বমুখীর পর বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি নেই বললেই চলে।

জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার ঊর্ধ্বগতিতে সরকারি বিধি-নিষেধের কারণে আমরা কিছু পরীক্ষা স্থগিত করেছি। তবে আমাদের সব কাজ থেমে নেই। বিশেষ করে আমরা এই মুহূর্তে ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ নিয়ে কাজ করছি। ঈদের পর যদি করোনার বর্তমান অবস্থাও থাকে তবু আমরা দ্রুততার সঙ্গে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নিয়োগগুলো শেষ করব। কারণ করোনা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্যই এই নিয়োগগুলো শেষ করা দরকার। এরপর পরিস্থিতির আরেকটু উন্নতি হলে অন্যান্য নিয়োগ কার্যক্রমও শুরু করব।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শেখ ইউসুফ হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপাতত চাকরিপ্রার্থীদের নিয়ে আমাদের আলাদা কোনো ভাবনা নেই। করোনার ঊর্ধ্বগতি রোধে আমরা সবাই মিলে কাজ করছি। করোনা কিছুটা কমলে আমরা বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখব। এ ছাড়া সরকারি কোনো দপ্তর, অধিদপ্তরকে নিয়োগ বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়নি, সেটা স্বাভাবিকভাবেই চলবে। তবে চলমান বিধি-নিষেধের  কারণে হয়তো কিছুটা সমস্যা হতে পারে।’

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম। সরকার বিধি-নিষেধ তুলে নিলে আমরা দেরি করব না। তবে অবশ্যই করোনার প্রাদুর্ভাব এবং নিয়োগপ্রার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনার মধ্যেও তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের বাজার বাড়ছে। ই-কমার্সভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ লোকের প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া সারা বিশ্বেই ঘরে বসে কাজ করার প্রবণতা শুরু হয়েছে। ফলে আমাদের দেশেও যোগাযোগ দক্ষতা ও খাতভিত্তিক দক্ষ লোকের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির পরিবর্তে দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘আমাদের দেশের বড় বড় ই-কমার্স ব্যবসা এখন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেছে। তাই টেকনিক্যাল কাজগুলো তারা বিদেশে বসেই করে থাকে। তবে লজিস্টিক সাপোর্টে লোক লাগছে। কিন্তু সেখানে বেশি বেতনের লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই।’

 



সাতদিনের সেরা