kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বিপাকে ১১ লাখ রিকশাচালক

দিনে ক্ষতি ৩৮ কোটি টাকা

তামজিদ হাসান তুরাগ   

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



 দিনে ক্ষতি ৩৮ কোটি টাকা

ষাটোর্ধ্ব মো. আজগর আলী। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। বর্তমানে থাকেন রাজধানীর মেরুল বাড্ডায়। ঢাকায় রিকশা চালান অন্তত ১০ বছর ধরে। তাঁর আয়ে চলে সংসার। কিন্তু ১৪ এপ্রিল থেকে অনেকটাই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাঁদের। কারণ ‘লকডাউনে’র সঙ্গে তাঁর আয়ও নেমে গেছে অর্ধেকে।

আজগর আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার তো আমাদের কোনো সাহায্য দিল না। কারো কাছ থেকেই কোনো সাহায্য পাইলাম না। তাইলে কেমনে চলুম আমরা। আগের মতো ইনকাম নাই। আগে যদি দিনে ইনকাম হইত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, এখন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকাও সব সময় হয় না। নিজে কী খাই, আর মালিকরেই বা কী দেই।’ সরকার লকডাউন দিলেও রিকশা চলাচল যেন বন্ধ করা না হয়—এই দাবি জানান আজগর আলী। তিনি বলেন, ‘রিকশা বন্ধ থাকলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) ২০১৯ সালের এক গবেষণার তথ্য মতে, শুধু রাজধানীতে রিকশা চলাচল করে ১১ লাখ। গত দুই বছরে এই সংখ্যা আরো বেড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, লকডাউনের আগে একজন রিকশাচালকের দৈনিক গড় আয় ছিল ৭০০ টাকা। সেই হিসাবে ১১ লাখ রিকশাচালকের দৈনিক মোট আয় ছিল ৭৭ কোটি টাকা। লকডাউনের সময় তাঁদের গড় আয় অর্ধেকে নেমে আসায় বলা যায়, মোট গড় আয় কমেছে ৩৮ কোটি টাকা। যদিও এই হিসাব নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু গত এক সপ্তাহে রিকশাচালকদের যে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে কারো কোনো মতভেদ নেই। 

জানতে চাইলে ঢাকা সিটি করপোরেশন রিকশা মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মোমিন আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লকডাউনে রিকশাচালকরা খুব খারাপ অবস্থায় আছে, তারা দিনমজুর, দিনে আনে আর দিনে খায়। সে জায়গায় এখন তাদের রোজগার নেই বললেই চলে। তবু যারা সাহস করে রাস্তায় নামে, তাদের দৈনিক আয় হয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মতো। এর মধ্যে আবার পুলিশ ধরে গাড়ি উল্টে রাখে, মাইর দেয়, আর জরিমানার ভয় তো আছেই।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের দাবি, আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে রিকশা চালাতে চাই, আমাদের এ সুযোগ দেওয়া হোক। না হলে আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

১৪ এপ্রিল থেকে লকডাউনে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পুলিশের রিকশা ধরে উল্টো করে রাখার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। গত সোমবার ফার্মগেটে আমির নামের এক চালকের রিকশা উল্টে রাখা হয়। শুধু আমিরের রিকশাই নয়, সেখানে আরো আটজনের রিকশা উল্টে রাখে পুলিশ। তাঁদের ‘অপরাধ’ লকডাউনে রিকশা নিয়ে বেরিয়েছেন। আমির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কী কমু ভাই, এহন রাস্তায় মানুষ তেমন নাই, তাই আইছি কারওয়ান বাজারে, এহানে কাঁচামালের টিপ পাওন যায়। কিন্তু কী আর করার, এইহানে আইসা আটকা পড়লাম। দেড় ঘণ্টা ধইরা আটকা আছি, জানি না কহন ছাড়ব।’

পর পর দুই দিন র‌্যাকারে এক হাজার ৪০০ টাকার মামলা খেয়েছেন সারোয়ার সরকার নামের এক রিকশাচালক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা পেটের দায়ে রাস্তায় নামি। এহন দেহি খালি মামলা আর মামলা। দুই দিনে মামলা খাইছি দুইটা। যে দুই টাকা ইনকাম করি তা-ও জরিমানা দিতেই যায়। এমন অইলে আমরা চলমু কেমন কইরা?’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা রিকশা চালাতে চাই। কই, চাইর চাকার গাড়ি তো পুলিশ ধরে না, তাইলে রিকশা ক্যান ধরে?’

মধ্যবাড্ডার রিকশাচালক জামাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গেল সাত দিন আয়-ইনকাম ছিল না, এহন আবার লকডাউন বাড়াচ্ছে, তাইলে খামু কী? আমাগো আছে কেডা? গেল বছরও কোনো অনুদান পাই নাই। এই বছর পামু, তারও তো কোনো গ্যারান্টি নাই। আমরা রিকশা চালাতে চাই। কাম কইরা খাইতে চাই।’

রাস্তায় রিকশা না পাওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন রুবেল আলম নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী। ফার্মগেটে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি তো গরিব মানুষ ভাই, আমার তো গাড়ি নাই, কাজ করি, তাই অফিসে যেতে হয়। রিকশা না থাকলে বিপদে পড়ি। এখন একটু বেশি ভাড়া হলেও রিকশাই ভালো।’

লকডাউনে নতুন করে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়তে পারে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সানেমের করা জরিপে দেখা গেছে, গত বছর কিন্তু নতুন দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা আবার আগের অবস্থানে আসার চেষ্টা করেছিল। এবারও সে রকম হতে পারে। তবে আমি মনে করি, সরকারকে বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতগুলো চিহ্নিত করে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’

 



সাতদিনের সেরা