kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

হেফাজতের তাণ্ডব

গ্রেপ্তার নেতাদের অনেকেই বিএনপি জোটের

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

২২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গ্রেপ্তার নেতাদের অনেকেই বিএনপি জোটের

অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের (ইসলামী) নেতারা রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের একাধিক শরিক দলের নেতারাও রয়েছেন এই সংগঠনের নেতৃত্বে। সম্প্রতি হেফাজতের বিক্ষোভ ও হরতাল কর্মসূচি থেকে তাণ্ডবের ঘটনায় এখন পর্যন্ত যেসব নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁদের অনেকেই ওই জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নেতা।

অরাজনৈতিক এই সংগঠনের নেতৃত্ব রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাতে থাকার বিষয়টি নানা কারণে আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে তাণ্ডবের ঘটনায় তৃতীয় কোনো অপশক্তি জড়িত কি না সেটা খতিয়ে দেখতে হেফাজত দুটি তদন্ত কমিটি করেছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর ঘিরে হেফাজত ২৬-২৮ মার্চ বিক্ষোভ ও হরতাল কর্মসূচি পালন করে। এই তিন দিন ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকা, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ব্রাহ্মবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সহিংসতা হয়। এর মধ্যে হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থানা, রেলস্টেশন ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনার সময় পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ১৭ জন নিহত হয়।

তাণ্ডবের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে করা অর্ধশতাধিক মামলায় অন্তত ৪৯ হাজার জন আসামি। এর মধ্যে চার শতাধিক গ্রেপ্তার হয়েছে। গত ১১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত আট দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন হেফাজতের কেন্দ্রীয়, নগর ও জেলা কমিটির প্রায় দুই ডজন নেতা।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান গত মঙ্গলবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয়সহ বিভিন্ন কমিটির ২২ জন নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন।’ এর মধ্যে জমিয়তের ১১-১২ নেতা রয়েছেন বলে তিনি জানান।

সর্বশেষ গত রবিবার ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়েছেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। তিনি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ

খেলাফত মজলিসের মহাসচিবও। এর আগে গত ১১ এপ্রিল প্রথম গ্রেপ্তার হন হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী, তিনি বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির (অনিবন্ধিত) যুগ্ম মহাসচিব পদে রয়েছেন। এরপর গ্রেপ্তার হয়েছেন হেফাজতের সহকারী মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, সহকারী মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন, নারায়ণগঞ্জ জেলার সেক্রেটারি বশিরউল্লাহ, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীব, সহ-অর্থ সম্পাদক ইলিয়াছ হামিদী, সহপ্রচার সম্পাদক শরীফ উল্লাহ, ঢাকা নগরের ভারপ্রাপ্ত আমির ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী মহাসচিব জুবায়ের আহমেদ, কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব জালালউদ্দিন, ‘শিশু বক্তা’ রফিকুল ইসলাম মাদানী, মাসুম বিল্লাহ, ফেরদৌস উর রহমান, মো. ফয়সাল প্রমুখ। এর মধ্যে মঞ্জুরুল ইসলাম জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বর্তমান মহাসচিব। জুনায়েদ আল হাবীব একই দলের নায়েবে আমির। বশিরউল্লাহ, রফিকুল ইসলাম মাদানীসহ জমিয়তের ডজনখানেক নেতা রয়েছেন গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকায়।

এ ছাড়া জুবায়ের আহমেদ ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ (আমিনী অংশ) যুগ্ম মহাসচিব। জালাল উদ্দিন খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা জানান, কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কর্তৃত্ব অনেকটা বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের হাতে। এই নেতাদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরও যোগাযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সরকারও রাজনৈতিক স্বার্থে হেফাজতকে ব্যবহার করেছে। দেশ স্বাধীনের পর বর্তমান সরকার থেকে হেফাজতে ইসলাম মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সহযোগিতা পেয়েছে তা অতীতে অন্য কোনো সরকারের আমলে কওমি মারদাসাগুলো পায়নি।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মীর ইদরিস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি ধর্মীয় অরাজনৈতিক সংগঠন। এখানে ধর্মীয় ঈমান-আকিদার বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ। ইসলামিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও আছেন। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।’ হেফাজতের প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্তরাই বেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন।’

তাণ্ডবের ঘটনায় তদন্ত কমিটি : হেফাজতের সাম্প্রতিক তাণ্ডবের ঘটনা তদন্তে হেফাজত এরই মধ্যে দুটি কমিটি করেছে। হাটহাজারীর ঘটনা তদন্তে ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদরিসকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। আর কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠনের নায়েবে আমির তাজুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সমস্যের আরেকটি কমিটি করা হয়।

মীর ইদরিস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে হেফাজতে তৃতীয় কোনো অপশক্তির অনুপ্রবেশ হয়েছে কি না তা তদন্ত করতে কমিটি করা হয়েছে। তবে আমাদের তদন্ত কমিটিকে পুলিশ সহযোগিতা করছে না।’

নেতৃত্ব সম্পর্কে হেফাজতের গঠনতন্ত্র : ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি হাটহাজারী বড় মাদরাসায় আয়োজিত ওলামা-মাশায়েক সম্মেলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ গঠিত হয়। সংগঠনের আমির ও মহাসচিব নির্বাচিত হন যথাক্রমে আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও জুনায়েদ বাবুনগরী। কমিটি করা হয় ১৫১ সদস্যের।

হেফাজতের নেতারা জানান, সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমির ও মহাসচিব এ দুটি শীর্ষ পদে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা পদে আছেন এ রকম কেউ থাকতে পারবেন না। আহমদ শফী ও জুনায়েদ বাবুনগরী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আহমদ শফী মারা যান। এরপর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর আহমদ শফীর অনুসারীদের বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সংগঠনের নতুন আমির নির্বাচন করা হয় জুনায়েদ বাবুনগরীকে। আর মহাসচিব করা হয় নূর হোসাইন কাসেমীকে। তিনি ছিলেন ২০ দলীয় জোটের শরিক জমিয়তের মহাসচিব। গত বছরের শেষ দিকে নূর হোসাইন কাসেমীর মৃত্যুতে হেফাজতের মহাসচিব পদে আসেন নুরুল ইসলাম জিহাদী।

সংগঠনটির নেতারা জানান, ইসলামী দলের পদে থাকা নেতারা হেফাজতে থাকতে পারবেন না—এ রকম কোনো বিধি-নিষেধ নেই। তবে সংগঠনে থেকে কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যাবে না, এটা গঠনতন্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। সংগঠনের বর্তমান কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, বড় হুজুরের (প্রতিষ্ঠাতা আমির) সময় একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে সংগঠন থেকে চার-পাঁচজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

হেফাজতের সাবেক এক নেতা বলেন, মামুনুল হক ও আজিজুল হক ইসলামাবাদীসহ কয়েকজন নেতা ২০ দলীয় জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে না থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা হেফাজতের ভাঙনের জন্যও দায়ী।

 

 



সাতদিনের সেরা