kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

প্রতিশ্রুতির ১২ কোটি ২০ লাখ ডোজ টিকা মিলবে কবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রতিশ্রুতির ১২ কোটি ২০ লাখ ডোজ টিকা মিলবে কবে

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাদান কার্যক্রম চলছে। আসছে মে মাসে কোভ্যাক্স থেকে প্রথম দেশে আসবে ফাইজার-বায়োএনটেকের এক লাখ ডোজ টিকা; যা আসবে বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বিষয়টি কোভ্যাক্স থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে বলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন।

এ ছাড়া চীন সরকার বাংলাদেশকে পাঁচ লাখ ডোজ টিকা উপহার দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে।

এ পর্যন্ত দেশে টিকাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা, টিকার মজুদ ও সম্ভাব্য আমদানি পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের মাধ্যমে সরকার অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ টিকা আমদানি করছে। এখন পর্যন্ত সেরাম ৭০ লাখ ডোজ টিকা দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী এখনো পাওনা রয়েছে দুই কোটি ৩০ লাখ ডোজ। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে উপহার দেওয়া হয়েছে একই টিকার ৩৩ লাখ ডোজ। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মোট এক কোটি তিন লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে।

এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষ সহায়ক গ্রুপ কোভ্যাক্স থেকে বিনা মূল্যে দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ হিসাবে তিন কোটি ২০ লাখ মানুষের জন্য ছয় কোটি ৪০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার কথা রয়েছে চলতি বছরের মধ্যে। এ ছাড়া সরকার চাইলে ছাড়কৃত মূল্যে কোভ্যাক্স থেকে আরো ১১ শতাংশ মানুষের জন্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি ডোজ টিকা কিনে আনতে পারবে। অর্থাৎ কোভ্যাক্স থেকে মোট ৩১ শতাংশ মানুষের জন্য ৯ কোটি ৯০ লাখ ডোজ টিকার জোগান আসবে বলে আগে থেকেই সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। সেই সঙ্গে সেরামের আসবে তিন কোটি ডোজ। সব মিলিয়ে সেরাম ও কোভ্যাক্স থেকে সরকার মোট ১২ কোটি ৯০ লাখ ডোজ বা ছয় কোটি ৪৫ লাখ মানুষের (দুই ডোজ হিসাবে) টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে। সে হিসাবে এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুতির (কেনা ও বিনা মূল্যে) ১২ কোটি ২০ লাখ ডোজ টিকা কবে আসবে তা নিয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছে সরকার।

গতকাল ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির এক খবরে বলা হয়েছে, সে দেশে করোনা সংক্রমণ তীব্র হয়ে ওঠায় সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া তার ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ কর্মসূচির আওতায় টিকা রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদর পুনাওয়ালা এনডিটিভির সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই পরিস্থিতি অন্তত জুলাই পর্যন্ত থাকবে। তিনি বলেন, ‘ভারতের সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা টিকা রপ্তানির কথা ভাবছি না। এ মুহূর্তে আমরা দেশের মানুষের প্রয়োজনের কথাই ভাবছি। আগামী জুন-জুলাইয়ে সীমিত আকারে আবার টিকা রপ্তানি শুরুর কথা চিন্তা করতে পারব।’ এ ক্ষেত্রে আগের মতো বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের তরফ থেকে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা না নিলে আগামী তিন মাসে সেরাম থেকে বাংলাদেশে টিকা আসার সম্ভাবনা আরো কমে গেল।

সেরামের কাছ থেকে মোট ছয়টি চালানে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার জন্য চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রথম চালানে ৫০ লাখ ডোজ পেয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় চালানে ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২০ লাখ ডোজ আসে। তৃতীয় চালানের ৫০ লাখ ডোজ টিকা মার্চের শেষ সপ্তাহে দেশে আসার কথা থাকলেও দ্বিতীয় চালানের পর সেরামের কাছ থেকে আর কোনো টিকা পাওয়া যায়নি।

এখন পর্যন্ত সরকারের হাতে যে পরিমাণ টিকা আছে, তা আর দুই সপ্তাহের মাথায় ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখন টিকা সংগ্রহকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এত দিন অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিতে থাকলেও এখন পরিস্থিতির কারণে টিকা আমদানির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে সরকার। এমনকি গতকাল বুধবারও টিকা ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে এক জরুরি বৈঠকে বেসরকারি খাতকে টিকা আমদানির সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক আলোচনা হয়। এ ছাড়া একাধিক দেশের দূতাবাসের পক্ষ থেকেও আবেদন করা হয়েছে টিকার অনুমোদনের বিষয়ে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েকটি আবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান আবেদন জমা দিয়েছে, তারা এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্পূরক তথ্য-উপাত্ত জমা দেয়নি। ফলে আমরা কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সেগুলো সংযুক্ত করে দিতে বলেছি।’

মহাপরিচালক বলেন, ‘সরকারি বা বেসরকারি—যেভাবেই হোক এখন টিকা দরকার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উপযুক্ত নিয়ম-নীতি মেনে টিকা আনতে পারলে আমরা অনুমতি দিয়ে দেব।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (টিকা) ডা. শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেরাম থেকে বাকি টিকা কবে আসবে তা এখনো আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে মে মাস থেকে কোভ্যাক্সের প্রতিশ্রুত টিকা আসা শুরু হবে বলে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে শুরুতেই কোভ্যাক্স আমাদের ফাইজারের এক লাখ ডোজ টিকা পাঠাবে বলে জানিয়েছে। আমরা আগেই কোভ্যাক্সকে অনুরোধ করেছিলাম, তারা যেন আমাদের অক্সফোর্ডের টিকা পাঠায়। তবে তাদেরও যেহেতু সীমাবদ্ধতা আছে, তাই যেটা পাঠাবে সেটাই আমরা ব্যবহার করব।’

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ২০ এপ্রিল চীনের দূতাবাস থেকে পাঁচ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে দেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া চীনের একাধিক কম্পানির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে টিকা আমদানির জন্য আবেদন পড়েছে বলেও ওই সূত্র জানায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশে গতকাল বুধবার পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয়েছে ৭৫ লাখ ৭৭ হাজার ৮৮৯ জনকে। এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৫৭ লাখ ৬১ হাজার ৯০২ জন। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ১৮ লাখ ১৫ হাজার ৯৮৭ জন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল, তা ওই দেশে নতুন যে ব্যবস্থা (বিদেশে রপ্তানি বন্ধ) হয়েছে তার আগে। ভারতের ওই নতুন ব্যবস্থার প্রভাব আমাদের ওপর পড়া উচিত নয়।’

তিনি বলেন, ‘ভারতের নিজেদের চাহিদাই অনেক বেড়েছে। অনেক আন্দোলন হচ্ছে যে কোথাও ভ্যাকসিন পাঠাবে না। সে জন্য ভারত সময়মতো চালান পাঠায়নি। এর মধ্যে ভারত আমাদের কথা দিয়েছে। ভারতের হাইকমিশনার এখন নয়াদিল্লিতে আছেন। আমাদের সরবরাহে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে সে জন্য তিনি সেখানে কাজ করছেন।’