kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

বিশেষ সাক্ষাৎকার

হেফাজতের মুখোশ উন্মোচনে বৈশ্বিক লাভ দেখছে সরকার

ড. এ কে আব্দুল মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হেফাজতের মুখোশ উন্মোচনে বৈশ্বিক লাভ দেখছে সরকার

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর ঘিরে তাণ্ডব চালিয়ে হেফাজতে ইসলামই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে হেফাজতের এই রূপ প্রকাশ পাওয়ায় বৈশ্বিকভাবে লাভবান হয়েছে সরকার। কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি মেহেদী হাসান

কালের কণ্ঠ : ভারতের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের সময় ধর্মভিত্তিক একটি গোষ্ঠী অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। এটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বা সরকারের জন্য কতটা বিব্রতকর ছিল?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী : অরাজকতা করলে তো বিব্রতকর হবেই। আমরা গণতান্ত্রিক দেশ। কোনো একটি দল-মতের লোকজন নরেন্দ্র মোদির নীতি যদি অপছন্দ করে তাহলে নিশ্চয়ই তাদের অধিকার আছে তা জানানোর। কিন্তু আপনি যখন আপনার নিজের সম্পদ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ফেললেন, নতুন কেনা ট্রেন ভেঙে ফেললেন; এগুলো তো গ্রহণযোগ্য নয়। এটিই দুঃখজনক। মানুষের বাড়ির সম্পদ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন তো সরকারেরও না। এটিও জ্বালিয়ে দিলেন! কেন তারা নিজের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না? এখানে কোনো ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণ আদায় করা উচিত।

কালের কণ্ঠ : আপনাদের সঙ্গে আলোচনায় ভারতীয় প্রতিনিধিরা এ ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেছেন?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী : না, তারা এ নিয়ে আমাদের কাছে কিছু বলেনি। গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত জানে যে এ ধরনের আন্দোলন হয়। তবে আমাদের দেশে আন্দোলনের সঙ্গে সন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াও হয়। এগুলো অগ্রহণযোগ্য। পরিপক্বতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ঠিক হবে। কিন্তু সমস্যা হলো যারা এটি করেছে তাদের মধ্যে সহনশীলতা খুব কম। তাদের নিজেদেরই হেফাজত দরকার। দুর্বৃত্তগুলো আমাদের ধর্ম নষ্ট করে।

কালের কণ্ঠ : এই উগ্রবাদ, তাণ্ডব থেকে বিশ্বের কাছে কী বার্তা গেল?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বার্তা গেছে যে ওরা অসহিষ্ণু। তাদের তো ক্ষতি হয়েছেই। আর আমাদের কিছুদিনের জন্য বদনাম হলো। তবে সরকারের জন্য একদিক থেকে লাভ হয়েছে। সরকার খুবই সহনশীল, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার সবার মত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের সুযোগ দেয়—এসব বিষয় সবাই জানছে। সরকার তাদেরও (হেফাজত) সুযোগ দিয়েছে রাস্তায় যেতে। কিন্তু যখন জ্বালাও-পোড়াও শুরু করেছে তখন সরকার আর সুযোগ দেয়নি। এটি সব দেশই করে।

কালের কণ্ঠ : করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে আমরা কি ভারত ও চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছি?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী : না, ভারত আমাদের বলেছে তাদের নিজস্ব টিকা নেওয়ার জন্য। তারা বলেছে, স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি, জয়শঙ্কর সাহেব ওই টিকা নিয়েছেন। কিন্তু এরও উৎপাদন ক্ষমতা কম। এটিও তাদের দেশে দিচ্ছে। তবে এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) অনুমোদিত না। আমাদের তখন সিদ্ধান্ত ছিল, ডাব্লিউএইচও অনুমোদিত না হলে আমরা নেব না। সে জন্য চীনারা যখন আমাদের প্রস্তাব দিল আমরা নিইনি। তারা কিছু উপহার ও কিছু বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল। আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, এটি ডাব্লিউএইচও অনুমোদিত টিকা কি না? দেখা গেল, অনুমোদন নেই। তখন আমাদের বিশেষজ্ঞরাই বললেন, ডাব্লিউএইচওর অনুমোদন না হলে নেওয়া ঠিক হবে না।

রাশিয়া যেটি তৈরি করেছে সেটিও ডাব্লিউএইচও অনুমোদিত নয়। চীনারা বলল যে তাদের ধারণা যে তাদের টিকা অনুমোদন পাবে না। কারণ অনেকে এটাকে পছন্দ করে না। সেটি রাজনীতির বাইরে না। অথচ এই সংস্থা পুরোপুরি কারিগরি সংস্থা হওয়া প্রয়োজন ছিল।

কালের কণ্ঠ : অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আমরা কিভাবে পেলাম?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী : আমরা আগে থেকেই সম্ভাব্য টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আশা করা হচ্ছিল, ইউরোপেই প্রথম টিকা উদ্ভাবিত হবে। তাই আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এক হয়ে তাদের টাকা-পয়সা দিয়েছি। প্রতিটি দেশের নাগরিকরা যাতে ন্যায্য দামে টিকা পায় সেই দাবিও আমরা তুলেছি। আমরা অক্সফোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। অক্সফোর্ড বলল, তারা ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছি, তোমরা পেলে আমাদেরও দিতে হবে। ভারত রাজি হয়ে বলল, যেদিন আমরা পাব সেদিন তোমরাও পাবে। আমরা ভারতকে বললাম, তিন কোটি টিকা চাই। প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে। আমরা আগাম টাকাও দিয়ে দিয়েছি। তারা বলেছে, এখনো বলছে যে টিকা সরবরাহ করবে। তবে তাদের দেশে এখন বেশ সমস্যা। একে তো সেরাম ইনস্টিটিউট ‘ওভার সোল্ড’ (সামর্থ্যের বেশি বিক্রি করে ফেলেছে), দ্বিতীয়ত, তাদের দেশেও চাহিদা অনেক বেড়েছে। এর ফলে তাদের রাজনীতিবিদরা দাবি জানিয়েছেন যে কোথাও রপ্তানি করা যাবে না। আমাদের চুক্তি তো এসবের আগে। সুতরাং তাদের একে সম্মান করা উচিত। ভারত কিন্তু সব সময় বলছে, তারা চুক্তিকে সম্মান করবে। কিন্তু তারা দেরি করছে।

কালের কণ্ঠ : এখন আমরা কি টিকার বিকল্প উৎস খোঁজ করছি?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী : আমরা ভারতের ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই। পাশাপাশি আমরা শুরু থেকেই বিকল্প উৎস খোঁজ করছি। চীন বলেছে, ডাব্লিউএইচও অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু কোথাও তো সমস্যা হয়নি। বিশ্বের সব জায়গায় আমরা টিকা দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। তাদের উৎপাদন ক্ষমতা যতটা ছিল বিক্রি করে ফেলেছে। একটু সময় লাগবে।

কালের কণ্ঠ : রাশিয়ার টিকা?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী : আমরা রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। কিন্তু তাদের উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কম। রাশিয়া বলছে আমাদের কভিডের টিকা তৈরির প্রযুক্তি দেবে। আমাদের ওষুধ কম্পানিগুলোই উৎপাদন করবে। যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় আসতে চায়। এটি সুখবর। এ বিষয়ে ওরা সম্ভবত চুক্তির খসড়া দিয়েছে। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। এই চুক্তিতে সরকারের কোনো আপত্তি নেই।