kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশের গুলি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম এবং বাঁশখালী প্রতিনিধি    

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশের গুলি

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারায় নির্মাণাধীন কারখানায় গতকাল শনিবার সকালে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের গুলিতে পাঁচ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩২ জন। আহতদের মধ্যে তিনজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। গুরুতর আহতদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সংঘর্ষের সময় কারখানার ভেতরে বিভিন্ন গাড়ি ও স্থাপনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। ওই কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশের গুলিতে নিহত শ্রমিকরা হলেন কিশোরগঞ্জের ফারুক আহমদের ছেলে মাহমুদ হাসান রাহাত (২২), চুয়াডাঙ্গার অলি উল্লাহর ছেলে মো. রনি হোসেন (২৩), নোয়াখালীর আব্দুল মতিনের ছেলে মো. রায়হান (১৯), চাঁদপুরের মো. নজরুলের ছেলে মো. শুভ (২২) এবং বাঁশখালীর পূর্ব বড়ঘোনার মওলানা আবু ছিদ্দিকির ছেলে মাহমুদ রেজা (১৯)। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন ও জেলা পুলিশ সুপার এস এম রসিদুল হক।

যেভাবে ঘটনার শুরু : আনুমানিক ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন ওই কারখানায়। ঘণ্টাপ্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা হারে শ্রমিকরা বেতন পান। পাঁচ দিন আগে শ্রমিকরা দাবি করেন, রমজান মাসে আট ঘণ্টা পরিশ্রম করলে ১০ ঘণ্টার বেতন দিতে হবে। নামাজ পড়ার জন্য সময় দিতে হবে, নামাজ পড়ার জায়গা করে দিতে হবে। এ ছাড়া বকেয়া বেতন, উৎসব বোনাস, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়াসহ ১১ দফা দাবিতে তারা পাঁচ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন তাঁরা। গত শুক্রবার রাতে শ্রমিকরা ১১ দফা দাবিতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে গতকাল শ্রমিকরা কেউ কাজে যাননি। এ রকম প্রেক্ষাপটে কারখানায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা ১৫ শ্রমিককে ধরে তাঁদের ক্যাম্পে নিয়ে আসেন। ওই ক্যাম্পে সব সময় ৩০ পুলিশ সদস্য নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। পরে পুলিশ আবার গিয়ে আরো কয়েকজন শ্রমিককে তুলে আনার চেষ্টা করলে তাঁরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। এ সময় পুলিশ শ্রমিকদের ওপর ব্যাপক লাঠিপেটা শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়তে থাকে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ গুলি ছুড়তে শুরু করে। এতে অনেক শ্রমিক গুলিতে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান চারজন। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান একজন। পরে স্থানীয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে কারখানার মাল লুট করে। বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন লাগিয়ে দেয় তারা। এতে প্রতিটি দেড় কোটি টাকা মূল্যের সাতটি মিক্সার গাড়ি, এসি মেশিন এবং বিভিন্ন স্থাপনা পুড়ে যায়। 

হামলার পরপরই বাঁশখালীর সরকারি-বেসরকারি কমপক্ষে পাঁচটি হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ শ্রমিকরা চিকিৎসা নেন। কারখানার শ্রমিকদের দিগ্বিদিক ছোটাছুটি ও রক্তাক্ত অবস্থা দেখে বাঁশখালী শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিহতদের বন্ধু ও স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। আহতদের অনেকেই পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পালিয়ে গেছেন। বিকেলে ওই কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, ১০ হাজার শ্রমিকের একজনও কারখানায় নেই। সবাই আতঙ্কে পালিয়ে গেছেন।

‘কিছু বোঝার আগেই গুলি লাগে পায়ে’ : ‘আমরা এক কক্ষে কাজ করছিলাম ২৬ জন। হঠাৎ গুলির শব্দ। বেশ কয়েকটি গুলি আসে আমাদের কক্ষেও। কিছু বোঝার আগেই আমার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে একটি গুলি ঢুকে বের হয়ে যায়। শুনেছি আমাদের কক্ষে কর্মরত একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।’ গতকাল বাঁশখালীতে পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ সেফটি কর্মকর্তা কামরুল হাসান (২৬) বলছিলেন এভাবেই। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ২৬ নম্বর অর্থোপেডিক সার্জারি ওয়ার্ডে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি বেতন পেয়েছি নিয়মিত। বেতনের জন্য আমার কোনো ক্ষোভ নেই। বিক্ষোভও করিনি। তার পরও অফিসে কাজ করার সময় আমি গুলিবিদ্ধ হলাম।’ 

এ সময় তাঁর পাশে থাকা ওই কারখানার শ্রমিক মো. শামসুদ্দীন বলেন, ‘আমাদের বেতন বকেয়া আছে। বেতন দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আমরা বিক্ষোভ করিনি।’

চমেক হাসপাতালে যাঁরা ভর্তি : আহত শ্রমিকদের মধ্যে চমেকের ২৪ নম্বর সার্জারি ওয়ার্ডে মো. আমিনুল হক, দিদার হোসেন শান্ত, মো. মিজান, শিমুল আহমেদ, হাবীব উল্ল্যাহ, মো. অভি, মো. অমর, মো. রাহাত ও মো. ইমন; ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে মুরাদ হোসেন, মো. আজাদ, বেলাল হোসেন, আবু সৈয়দ ও মো. মোর্শেদ ভর্তি রয়েছেন। এ ছাড়া আহত তিন পুলিশ সদস্যের মধ্যে ২০ নম্বর ওয়ার্ডে আবদুল কাদের ও আসাদুজ্জামান এবং ২৮ নম্বর নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে ইয়াছির আহম্মদ ভর্তি রয়েছেন। চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের (ইএমও) ডা. ফয়সল কবীর গতকাল বিকেলে বলেন, বাঁশখালীর ঘটনায় ভর্তি হওয়া আহতদের মধ্যে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ আছেন। তবে আহতদের মধ্যে কাদের অবস্থা বেশি খারাপ, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

শ্রমিকদের অভিযোগ : ওই কারখানায় ১৫টি ম্যানপাওয়ার কম্পানির অধীনে ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। ওই শ্রমিকদের বেতন-ভাতা কারখানা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিশোধ করে। তবে তাদের নিয়োজিত ঠিকাদার ম্যানপাওয়ারের কর্মকর্তারা বেতন-ভাতা দিতে সব সময় গড়িমসি করেন। শ্রমিকদের বেতনের বড় অংশ কমিশনভিত্তিক ওই ম্যানপাওয়ার কম্পানির কর্মকর্তারা কেটে রাখেন।

২০ কোটি টাকার ক্ষতি দাবি : সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে বিভিন্ন গাড়ি ও স্থাপনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনায় আনুমানিক ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে দাবি করেছেন কারখানাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ক্ষতিপূরণের ঘোষণা : চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান জানান, নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা করে।

পুলিশ যা বলছে : চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম রসিদুল হক বলেন, ‘চায়না কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের বাঁচাতে স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকদের দমনে পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছিল। স্থানীয় কিছু ব্যক্তির ইন্ধনে শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া শুক্রবার রাতেই সমাধান করা হয়েছিল। আমাদের কাছে ভিডিও ফুটেজ আছে, তা দেখে প্রকৃত দোষী ও ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করা হবে।’

এদিকে এর আগে ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় কারখানার জমি অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় কমপক্ষে ছয়জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।

ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি বিএনপির : বাঁশখালীর ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দাবি-দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভরত শ্রমিকদের বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে পাঁচটি প্রাণ ঝরিয়েছে পুলিশ। এর দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। গতকাল শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো দলের দপ্তরের চলতি দায়িত্বে থাকা সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে ফখরুল এ কথা বলেন। ফখরুল আরো বলেন, যে শ্রমিকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন, সেই শ্রমিকদের বুকে গুলি চালানো শুধু আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসকদের পক্ষেই সম্ভব।

ঢাবিতে বিক্ষোভ : পাঁচ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছে বাম ছাত্রসংগঠনগুলো। গতকাল বিকেলে দুই দফা বিক্ষোভ মিছিল শেষে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক সমাবেশ থেকে ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছে তারা।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি : বাঁশখালীর ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। বিবৃতিতে নেতারা আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলির ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানান। এ ছাড়া শ্রমিকদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ এবং তাঁদের সব পাওনা অবিলম্বে পরিশোধের আহ্বান জানানো হয়।

জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের নিন্দা : পাঁচ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামরুল আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আমিরুল হক আমিন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, নির্বিচারে শ্রমিকদের এভাবে খুন করা একরকম নির্মমতা। তাঁরা পুলিশের গুলিতে নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা, গ্রেপ্তার হয়রানি বন্ধ এবং ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি দাবি করেন।