kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

কষ্ট ভুলে গ্রামের পথে জনস্রোত

► রাজধানীর প্রবেশমুখে ব্যাপক যানজট
► ফেরিঘাটে লম্বা লাইন

শরীফুল আলম সুমন   

১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কষ্ট ভুলে গ্রামের পথে জনস্রোত

বিদায় ঢাকা : রঙের শহরটাকে অনেক চেনা হলো। এবার ফেরার পালা। সরকারের কঠোর বিধি-নিষেধের কারণে বন্ধ দূরপাল্লার বাস-ট্রেন-নৌযান। অগত্যা আসবাবের সঙ্গে পুরো পরিবার নিয়ে ছোট্ট ট্রাকে সওয়ার হয়ে গ্রামের পথে যাত্রা। ছবি : মীর ফরিদ

চৈত্রের শেষ দিনে চেনা নিয়মে শরীর কাঁটা দেওয়া তেজি রোদ। বড় বড় দালান কিংবা গাছের একটু ছায়া পথিককে করছে খানিকটা শীতল। ছায়া ফুরালেই আবার রোদের দহন! দিনভর রোদ ছিল এমনই মেজাজি। করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের কঠোর বিধি-নিষেধের শেষ দিন ছিল গতকাল। আজ থেকে শুরু হচ্ছে সর্বাত্মক লকডাউন। ব্যাংকের কিছু শাখা ছাড়া বন্ধ থাকছে সরকারি-বেসরকারি সব অফিস। ফলে অনেকেরই ঢাকা ছাড়ার তাড়া। আগে থেকেই দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, লঞ্চ, উড়োজাহাজ সবই বন্ধ। তার পরও শত কষ্ট ভুলে পরিবার নিয়ে গ্রামে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছে মানুষ। ফলে তীব্র গরম আর যানবাহন সংকটে পড়ে পদে পদে ভোগান্তির ধাক্কা খেয়েছে গ্রামের পথের যাত্রীরা।

মানুষ যে যেভাবে পেরেছে ছুটেছে বাড়ির দিকে। ফলে মানুষ আর গাড়ির চাপে ভেঙে পড়েছিল সড়কের শৃঙ্খলা। সড়কে প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের সংখ্যাই ছিল বেশি। এ ছাড়া পিকআপ, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিকশায় মানুষ গ্রামের বাড়িতে ছোটে। গাড়ি না পেয়ে অনেকে হেঁটেছে বেশ খানিকটা পথও। ফলে রাজধানীর অন্যতম প্রবেশমুখ গাবতলীতে দীর্ঘ যানজট দেখা দেয়।

গতকাল এই প্রতিবেদক রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে সকাল সাড়ে ৭টায় ফরিদপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। ২০ মিনিটের মধ্যে কল্যাণপুর পৌঁছলেও এরপর শুরু হয় যানজট। গাবতলী থেকে আমিনবাজার ব্রিজ পর্যন্ত মাত্র আধাকিলোমিটার পথ পার হতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। আমিনবাজার ব্রিজ থেকে হেমায়েতপুর যেতে আরো আধাঘণ্টা সময় লাগে। এরপর পাটুরিয়া পর্যন্ত পৌঁছতে পথে পথে যানজট ঠেলে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছার পর শুরু হয় আরেক ভোগান্তি। ব্যক্তিগত গাড়িরই কয়েক কিলোমিটারের দীর্ঘ লাইন। প্রায় তিন ঘণ্টা লাইনে থাকার পর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এই প্রতিবেদক ফেরিতে উঠতে সক্ষম হন।

করোনায় এত বিধি-নিষেধের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিল না, এমনকি অনেককে মাস্ক পরতেও দেখা যায়নি।

গতকাল সকাল ৮টার দিকে রাজধানীর গাবতলীতে দেখা যায়, প্রচণ্ড যানজট। আর গাবতলীতে ঢোকার মুখ থেকেই ব্যাগ নিয়ে মানুষের অপেক্ষা। আমিনবাজার ব্রিজের আগ পর্যন্ত গিজগিজ করছিল মানুষ। গাবতলী থেকে গতকাল দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। ফলে অনেক মানুষ হেঁটেই গন্তব্যে ছুটছিল।

ঢাকা ছাড়া মানুষের অতিরিক্ত চাপের কারণে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও সিনএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো। গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা গেছে, একাধিক মাইক্রোবাস বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রীদের ডাকাডাকি করছে।

সিটি করপোরেশন এলাকা ছাড়া বাস চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও গতকাল তা মানতে দেখা যায়নি। আমিনবাজার ব্রিজ পার হয়ে সিটি সার্ভিসের বেশ কিছু বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। সাভার পরিবহন, বৈশাখী পরিবহনসহ বেশ কিছু বাস যাত্রী তুলেছে। আমিনবাজারে এই বাসগুলো ঘোরাতে গিয়েই মূলত গাবতলীতে যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে এ সময় পুলিশ সদস্য থাকলেও তাঁরা ছিলেন ‘দর্শক’। পাটুরিয়া ও আরিচা ঘাটে যাওয়ার সংযোগস্থলেও ছিল এলোপাতাড়ি গাড়ি। স্বল্পসংখ্যক পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছিল।

পাটুরিয়া ঘাটের এক দোকানি বলেন, ‘ছোট গাড়ি ঈদের সময়ের চেয়ে বেশি, কিন্তু ঈদের সময় অনেক পুলিশ থাকে। গাড়িগুলোকে লাইন মেনে চলতে হয়, কিন্তু এখন ইচ্ছামতো চলছে।’

লকডাউনে আট দিন অফিস বন্ধ থাকায় স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে গাড়ি ভাড়া করে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা যাচ্ছিলেন আবদুর রহমান। বিকেল ৩টার দিকে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে পাটুরিয়া ঘাটে দেখা হয় তাঁর। তিনি বলেন, ‘ভোর ৫টায় পুরান ঢাকা থেকে মাওয়া ফেরিঘাটের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। সেখানে দীর্ঘ যানজট পেয়ে পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছলাম। এখানে আরো বড় যানজট। কখন যে বাড়ি পৌঁছব, বলতে পারছি না।’

ঢাকায় রং মিস্ত্রির কাজ করতেন শাকিল। তিনি কয়েক দফা গাড়ি বদলিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টায় পাটুরিয়া পর্যন্ত এসেছেন। মানিকগঞ্জের শিবালয়ে আসার পর বাসগুলো ঘুরিয়ে দেওয়ায় কেউ কেউ হেঁটে, কেউ রিকশায় পাটুরিয়া ঘাটে আসেন। ফেরিগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শুধু নিম্নজীবী নয়, সব ধরনের মানুষই লকডাউনের কারণে বাড়ি ফিরছে।

‘একেবারে ঈদ করেই ফিরব’ : এদিকে আমাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি বলেন, ‘লকডাউনে ঢাকায় থেকে লাভ নেই। শুধু খরচ বাড়বে। তাই বাড়ি চলে যাচ্ছি। কাল (আজ) থেকে সব কিছু বন্ধ থাকবে। ঈদে তিন-চার দিন আগে বাড়িতে যাওয়া হয়, কিন্তু এবার লকডাউন আর করোনা পরিস্থিতির কারণে রোজার আগেই বাড়ি যাচ্ছি। রোজার পুরো মাস বাড়িতেই থাকব। একেবারে ঈদ করেই ফিরব।’ গতকাল মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে ঢাকার রাজাবাজারের বসবাসরত বরিশালগামী যাত্রী নাজির আলী বলছিলেন এভাবেই।

লকডাউন ঘিরে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে গতকালও ছিল ঘরমুখো যাত্রীদের ঢল। সকাল থেকেই পদ্মা পাড়ি দিতে হাজার হাজার যাত্রী ঢাকা থেকে বিভিন্ন যানবাহনে করে শিমুলিয়া ঘাটে এসে ভিড় জমায়। এতে বাড়তি পরিবহন ও যাত্রীর চাপ সামাল দিতে ফেরি কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়। তবে দুপুরের পরে এ চাপ কিছুটা কমে আসে।

লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাটে গতকাল ঘুরে দেখা যায়, শিমুলিয়া ঘাটে ঘরমুখো মানুষ গিজগিজ করছিল। গতকাল ভোর থেকে ঘাট এলাকায় উভয়মুখী যাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকে। গণপরিবহনসহ নৌপথে লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ থাকায় যাত্রীরা নদী পার হচ্ছিল ফেরিতে। ফেরিগুলোতে ছিল মানুষ আর মানুষ। অনেক যাত্রীকে ট্রলারে করে পদ্মা পাড়ি দিতে দেখা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি কাউকেই। পারাপারের অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সারি প্রায় আট কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে।

বিআইডাব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক সাফায়েত আহম্মেদ জানান, গেল দুই দিন ১৪টি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ থাকায় যাত্রীরা ফেরিতে হামলে পড়েছে। মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের টিআই সোহরাব জানান, গতকাল সকাল থেকে হাজারো গাড়ির চাপ থাকলেও দুপুরের পরে ঘাট এলাকায় পাঁচ শতাধিক গাড়ি পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। মাওয়া চৌরাস্তা থেকে মহাসড়কের পাশে অসংখ্য পণ্যবাহী ট্রাক পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে।

 



সাতদিনের সেরা