kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

কাল থেকে আট দিনের ‘লকডাউন’

বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে আরেক দফা লকডাউনের আদলে আট দিনের বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে সরকার। আগামীকাল বুধবার সকাল ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত অফিস, শপিং মল, ব্যাংক, পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয়ে এই বিধি-নিষেধ চলবে। এই দফায় সাধারণ ছুটি বা সর্বাত্মক লকডাউন আসতে পারে—মন্ত্রী পর্যায় থেকে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তবে এবার অপেক্ষাকৃত কিছুটা কঠোর ১৩ দফা বিধি-নিষেধ আরোপ করে গতকাল সোমবার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এই বিধি-নিষেধগুলো বাস্তবায়নই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গত বছর সংক্রমণের প্রথম ঢেউ মোকাবেলায় ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় দুই দফায় ২৯ মার্চ ও ৪ এপ্রিল কিছুটা নরম মাত্রার বিধি-নিষেধ জারি করা হলেও কার্যত তাতে সুফল আসেনি। এসব বিধি-নিষেধের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হয়েছে।

এবারের বিধি-নিষেধের মধ্যে বিশেষ ব্যতিক্রম হচ্ছে শিল্প-কলকারখানা চালু রাখার সিদ্ধান্ত। কিন্তু ‘শিল্প-কলকারখানা’ সংজ্ঞায়িত না করায় সব ধরনের শিল্পই এই শব্দের মধ্যে পড়ে। গার্মেন্ট, প্রেস, জুতা, চামড়াসহ বিভিন্ন ধরনের কারখানা ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আছে। এসব কারখানা যদি খোলা থাকে তাহলে অনেক মানুষকে ঘর থেকে বের হতে হবে। অন্যদিকে শুধু একটি খাত খোলা রাখার সুযোগ দেওয়াও সংবিধানসম্মত নয় বলে মনে করেছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, সংবিধানে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের কোনো গোষ্ঠী যদি পিছিয়ে থাকে, তাহলে তাদের এগিয়ে আনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। কিন্তু অর্থনৈতিক খাতের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা খাতকেই সরকার শুধু সুবিধা দিচ্ছে।

সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, সংক্রমণের যে অবস্থা তাতে ঢাকার মধ্যে সম্পূর্ণরূপে লকডাউন থাকা উচিত। সরকার কলকারখানা খোলার সুযোগ রেখেছে। সব কারখানা তো আর ঢাকার মধ্যে নেই। কলকারখানার ধরনও অনেক, এগুলো খোলা থাকলে মানুষের চলাচলও থাকবে। তিনি বলেন, সরকার একটি খাতকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে কলকারখানা খোলা রাখছে, এটা সংবিধানবিরোধী। দেশের বেশির ভাগ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। লকডাউনে তারা নিজেদের ক্ষতি মানতে পারলে একটি খাত কেন বিশেষ সুযোগ পাবে?

পুলিশের মুভমেন্ট পাস চালুর বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সাবেক এই সচিব বলেন, লকডাউনসংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়—যেকোনো এক জায়গা থেকেই আসা উচিত। যে যার যার জায়গা থেকে নিজেদের মতো আদেশ জারি করলে বিভ্রান্তি দেখা দেবে।

নতুন করে এই আট দিনের বিধি-নিষেধ জারি করা হলেও এর সময়সীমা আরো বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিধি-নিষেধের নির্দেশনা বাস্তবায়নে জেলা ও মাঠ প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত টহল জোরদার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মহামারি প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগে কাজ হবে না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের বিশাল ভূমিকা রাখতে হবে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকার গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ডা. ইকবাল আর্সলান কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্দেশনা শুধু কাগজে-কলমে থাকলে ভাইরাস সংক্রমণ কমানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রশাসনের কঠোর নজদারি যেমন রাখতে হবে, তেমনি সারা দেশের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে নিয়ম মানাতে হবে। না হয় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়।

নির্দেশনায় যা আছে

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব রেজাউল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে ১৩টি নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস/আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন। তবে বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থলবন্দর এবং এ সংশ্লিষ্ট অফিসগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আদালতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে। সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, রেল, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে। তবে পণ্য পরিবহন, উৎপাদনব্যবস্থা ও জরুরি সেবার ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে না। শিল্প-কারখানা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। তবে শ্রমিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা ও জরুরি পরিষেবা, যেমন—কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দর (স্থলবন্দর, নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাকসেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিস, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে।

নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসাসেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। তবে টিকা কার্ড দেখিয়ে টিকা নেওয়ার জন্য যাতায়াত করা যাবে। খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শুধু খাবার বিক্রি/সরবরাহ (কিনে নিয়ে যাওয়া/অনলাইন) করা যাবে। শপিং মলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ থাকবে। কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাবেচা করা যাবে। বাজার কর্তৃপক্ষ/স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে। বোরো ধান কাটার জরুরি প্রয়োজনে কৃষি শ্রমিক পরিবহনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন সমন্বয় করবে।

এবারের প্রজ্ঞাপনে নতুন একটি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তাঁর পক্ষে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেবেন।

ব্যাংক বন্ধ থাকবে

১৪ থেকে ২১ এপ্রিল সব ব্যাংক বন্ধ থাকবে। এ সময় ব্যাংক শাখার পাশাপাশি আর্থিক সেবা দেওয়া ব্যাংকের সব উপশাখা, বুথ ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং সেবাও বন্ধ থাকবে। তবে সার্বক্ষণিক খোলা থাকবে এটিএম, ইন্টারনেট ব্যাংকিংসহ অনলাইন সব সেবা। বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। তবে এই সময় সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর এলাকার ব্যাংক শাখা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের জন্য খোলা রাখা যাবে। পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনে বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করা শাখা (এডি) নির্দিষ্ট দিনের জন্য খোলা রাখা যাবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংক খোলা রাখার ব্যাপারে নির্দেশনা দেবে না। আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত সারা দেশে সব ব্যাংক খোলা থাকবে।

শ্রমিকদের আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা না করলে জরিমানা

সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ—সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অবশ্যই নিজস্ব পরিবহন দিয়ে আনা-নেওয়া করতে হবে। সম্ভব হলে কারখানার মধ্যে আবাসন ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। শিল্পসচিব কে এম আলী আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লকডাউনে’র মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজস্ব পরিবহনে আনা-নেওয়া না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হবে। নিয়ম না মানলে এসব প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন করতে দেওয়া হবে না।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সরকারি কারখানায় সারা দেশে ৩২ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে সব সরকারি কারখানায় চিঠি পাঠিয়ে শ্রমিকদের আনা-নেওয়াসহ অন্যান্য বিষয়ে গতকাল নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘লকডাউনে’ সরকারি কারখানার তিনজন শ্রমিকের পরিবর্তে দুজন শ্রমিককে দিয়ে কাজ করাতে হবে। বদলি শ্রমিক বাদ দিতে হবে। কারখানা থেকে দূরে থাকা শ্রমিকদের কারখানার মধ্যে অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের খাবার, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় চাহিদা সরবরাহ করতে হবে। আশপাশের শ্রমিকদের আনা-নেওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে।

মসজিদে ২০ জনের বেশি মুসল্লি নয়

গত বছরের মতো এবারও পবিত্র রমজানে তারাবির নামাজে খতিব, ইমাম, হাফেজ, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ সর্বোচ্চ ২০ জন মুসল্লি অংশ নিতে পারবেন। এ ছাড়া মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ক্ষেত্রেও এই সংখ্যার বেশি মুসল্লি অংশ নিতে পারবেন না। আগামীকাল থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত উল্লিখিত দুটি বিষয় বহাল থাকবে বলে গতকাল এই নির্দেশনা দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বলছে, সব নামাজে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে মুসল্লিরা অংশ নেবেন। মুসল্লিদের পবিত্র রমজানে তিলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে মহান আল্লাহর রহমত ও বিপদমুক্তির জন্য দোয়া করার অনুরোধও জানানো হয়েছে।

এদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিধি-নিষেধের আদেশ জারির পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, লকডাউন চলাকালে পণ্যবাহী পরিবহন যাতে কোনোভাবেই যাত্রীবাহী পরিবহনে রূপ না নিতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে মাঠ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।