kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

হেফাজতের তাণ্ডব

‘শিশু বক্তা’ রফিকুল মাদানী গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘শিশু বক্তা’ রফিকুল মাদানী গ্রেপ্তার

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ-হরতালে নাশকতার অভিযোগে ওয়াজ মাহফিলের বক্তা ও হেফাজত নেতা মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানীকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে নেত্রকোনার পূর্বধলার ঘাগড়া ইউনিয়নের লেটিরকান্দা গ্রামের বাড়ির দরজা ভেঙে তাঁকে আটক করে র‌্যাব-১৪। গতকাল বুধবার তাঁর বিরুদ্ধে গাজীপুরের গাছা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। সম্প্রতি মতিঝিলে আটকের পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলেও সেই ঘটনায় পরবর্তী সময়ে মামলা হয়। সেই মামলায়ও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে। র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, রফিকুল ইসলাম মাদানীর মোবাইল ফোন তল্লাশি করে আপত্তিকর ভিডিও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে উসকানিমূলক ভিডিও ও মেসেজও পাওয়া গেছে। তাঁর বৈবাহিক জীবন নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

গতকালই রফিকুলের মুক্তির দাবিতে নেত্রকোনায় সাংবাদ সম্মেলন করেছেন জেলা হেফাজতে ইসলামের নেতারা। মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দিয়েছে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটিও।

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নাশকতার ঘটনায় গতকাল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১১। গত ২৮ মার্চ হরতালের সময় গাড়ি পুড়িয়ে নাশকতার ঘটনায় ইকবাল জড়িত বলে দাবি র‌্যাবের।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁর রিসোর্টকাণ্ডের ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে তিনটি মামলা হয়েছে। একটি মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে।

ধারাবাহিক নাশকতার ঘটনায় ১২ জেলায় হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৯৬টি মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া গেছে। বেশির ভাগ মামলায়ই হেফাজতের নেতাদের নাম না থাকলেও ঢাকার পল্টন থানায় দুই মামলায় অর্ধশত নেতার নাম রয়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী ও উসকানিমূলক কথাবার্তা এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে কটাক্ষ করার অভিযোগে রফিকুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, নাশকতার উসকানির অভিযোগে এবার রফিকুলকে ধরা হয়েছে। ইসলামী দলগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় রফিকুলের বয়স ২৭ বছর হলেও আকার-আকৃতির জন্য তাঁকে ‘শিশু বক্তা’ বলে ডাকে ভক্তরা। গত ২৫ মার্চ মতিঝিলে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরবিরোধী মিছিল ও ভাঙচুরের সময় তাঁকে আটক করেছিল পুলিশ। তবে কয়েক ঘণ্টা পর রফিকুলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। রফিকুল নেত্রকোনার পশ্চিম বিলাসপুর সাওতুল হেরা মাদরাসার পরিচালক। তিনি বিএনপি-জামায়াত জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের অঙ্গসংগঠন যুব জমিয়তের নেত্রকোনা জেলার সহসভাপতি। আটকের পর তাঁর মোবাইল ফোন তল্লাশি করে কিছু পর্ন ভিডিও পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত জীবনে রফিকুল বিবাহিত বলে জানালেও তাঁর সেই বিয়ের খবর পরিবার-প্রতিবেশীরা জানে না। আসমা বেগম নামের এক বেয়াইনকে বিয়ে করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেলেও এর কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে পারেননি। গতকাল গাজীপুরের গাছা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঢাকায় নাশকতার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায়ও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে। রফিকুলের মাদানী উপাধি ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘রফিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কিছু জিনিস পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদেও কিছু তথ্য মিলেছে। এসব ব্যাপারে তদন্ত চলছে।’

নেত্রকোনা ও পূর্বধলা প্রতিনিধি জানান, গতকাল বিকেলে নেত্রকোনা প্রেস ক্লাব ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা হেফাজতে ইসলামের নেতারা রফিকুলের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি করেন।

সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, নাশকতার অভিযোগে গ্রেপ্তার কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি বড়বাড়ী পশ্চিমপাড়া এলাকার মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে।

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁর রয়েল রিসোর্টে গত শনিবার নারীসহ মামুনুল হক অবরুদ্ধ হওয়ার পর ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে তিনটি মামলা হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে দুটি ও আহত এক সাংবাদিক একটি মামলা করেছেন। একটি মামলায় মামুনুল হককে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা ও রিসোর্ট ভাঙচুরের অভিযোগে সোনারগাঁ থানার এসআই ইয়াউর ৪১ জনের নাম উল্লেখ ও অচেনা ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মামুনুল হককে। একই থানার আরেক এসআই আরিফ হাওলাদার যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দ্বিতীয় মামলাটি করেন। হেফাজতকর্মীদের হামলায় আহত স্থানীয় এসএ টেলিভিশনের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান অন্য মামলাটি করেন। সোনারগাঁ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার তবিবুর রহমান বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।

এদিকে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ প্রায় অর্ধশত নেতাকে ঘিরে তদন্ত করছে পুলিশ। রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা দুটি মামলার আসামি তাঁরা। বিভিন্ন নাশকতার ঘটনায় তাঁদের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেই মামুনুলসহ অন্যদের গ্রেপ্তার করা হবে।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতায় বিক্ষোভ-হরতালে চালানো তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। গতকাল পর্যন্ত ওই জেলায় ৪৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় সন্দেহভাজন ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকায় ১০টি, নারায়ণগঞ্জে ১৩টি, চট্টগ্রামে সাতটিসহ ১২ জেলায় ৯৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, হেফাজতের কর্মসূচি চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু নাছের আহাম্মদের বাড়িতে হামলার ঘটনায় ৪৩ জনের নাম উল্লেখসহ ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। গতকাল আশুগঞ্জ থানায় করা ওই মামলায় বিএনপি, জামায়াত ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীর নাম রয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা