kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

বিশেষ লেখা

মানুষকে সচেতন করার কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে

ইমদাদুল হক মিলন

৫ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানুষকে সচেতন করার কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে

করোনা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। গত বছর যখন এই মহামারি এসে ঢুকল বাংলাদেশে, তখন যেসব শব্দের সঙ্গে আমরা নতুনভাবে পরিচিত হলাম তার একটি ‘কোয়ারেন্টিন’ আরেকটি ‘লকডাউন’। শব্দ দুটির ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। দেশের নিরক্ষর মানুষও জানে, এমনকি শিশুরাও জানে শব্দ দুটির অর্থ কী। শুরুর দিকে করোনা আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে গিয়েছিল মানুষ। চিকিৎসকরাও বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ করোনার সঠিক চিকিৎসাটি জানা ছিল না। দেশের মানুষ দিশাহারা হলে সরকার বিব্রত হয়। আমাদের সরকারও বিব্রত হয়েছে। জনসমাগমে এবং কী কী কারণে করোনা ছড়ায় সেসব ক্ষেত্রে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। লকডাউন দিয়েছে। ভয়ে, আতঙ্কে দিশাহারা মানুষকে নানাভাবে সচেতন করার সরকারি পদক্ষেপগুলো আমরা দেখেছি। ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরতেই হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ঘন ঘন সাবানপানিতে হাত ধুতে হবে। গরম পানির ভাপ নিতে হবে। সমাজের শ্রদ্ধেয়জনরাও মানুষকে সচেতন করার কাজ করেছেন। আমাদের গণমাধ্যমগুলো ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে জনসচেতনতায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও নানা প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে বলা হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে ভয়, আতঙ্ক কাটতে শুরু করল মানুষের। মানুষ কিছুটা সচেতন হলো। আস্তেধীরে করোনাও নিয়ন্ত্রণে এলো অনেকখানি। আক্রান্তের হার কমল, মৃত্যুর সংখ্যা কমল। অন্যদিকে সারা পৃথিবীতে তখন ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ব্যাপক চেষ্টা চলছে। ১০-১১ মাসের মাথায় ভ্যাকসিন এসেও পড়ল। বাংলাদেশে প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন শুরু হলো। এর পরই আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, মানুষ একেবারেই গাছাড়া হয়ে গেল। যেন করোনা চলেই গেছে। করোনা এখন যেন আর কোনো ব্যাপারই না। এই গাছাড়া মনোভাব নতুন করে সর্বনাশ ডেকে আনল। গত ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল করোনা।

আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার আগের সব রেকর্ড ভাঙতে লাগল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, এর পরও মানুষ গাছাড়া, এর পরও মানুষ সচেতন হচ্ছেই না। জনসমাবেশ করছে, সামাজিক দূরত্ব মানা তো দূরের কথা মাস্কও পরছে না। গণপরিবহনে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়ম। রাস্তায় বেরোলে চোখে পড়ে ১০ শতাংশ মানুষের মুখেও মাস্ক নেই। নিরক্ষর মানুষ তো দূরের কথা, শিক্ষিতজনরাও মানছেন না এই নিয়ম। সি বিচে এমন ভিড় হচ্ছে, হোটেল-মোটেলে জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বসে আছেন বা শুয়ে আছেন ভ্রমণে যাওয়া মানুষ। সি বিচে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, আর নেই মুখে মাস্ক। সর্বত্রই একই অবস্থা। এই অসচেতনতা নতুন করে ডেকে আনল মহাবিপদ। আবার শুরু হলো লকডাউন। আর নতুন করে লকডাউন শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা ছাড়তে শুরু করল হাজার হাজার মানুষ। বাস-ট্রেন-লঞ্চে গাদাগাদি মানুষ। মুখে মাস্ক নেই ৯০ শতাংশ মানুষের, আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা তো দূরের কথা! ফলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন করোনা সংক্রমণ আরো তীব্র হবে।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় জনসচেতনতা। শুধু লকডাউন দিয়ে, মানুষকে গৃহবন্দি করে কাজ হবে না। মানুষ লকডাউন মানবেও না। করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বড় ব্যবসায়ীরা অতিকষ্টে সামাল দিয়েছেন, কিন্তু মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেকেই ধসে গেছেন। কোনো রকমে টিকে আছেন কেউ কেউ। করোনা স্তিমিত হয়ে আসছিল দেখে নতুন উদ্যমে শুরুও করেছিলেন ব্যবসা। একটু একটু করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। পহেলা বৈশাখে বেশ ভালো ব্যবসা করেন শাড়ি, পাঞ্জাবি ও শিশুদের পোশাক ব্যবসায়ীরা। আর দুই ঈদে তো অনেক বড় ব্যবসা হয় বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়। কাপড়ের ব্যবসায়ীরা সারা বছরের অনেকখানি ব্যবসা করে ফেলেন ঈদুল ফিতরের সময়। গরু-ছাগলের খামারিরা ভালো ব্যবসা করেন কোরবানি ঈদে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও করেন। গত বছর এই ব্যবসাগুলোর কোনোটিই হয়নি। এ বছরও সেদিকেই যাচ্ছে অবস্থা। তাহলে সমাজের নানা স্তরে যে ব্যবসায়ীরা আছেন সেই মানুষগুলোর কী হবে? পরিবার-পরিজন নিয়ে তাঁরা কোথায় দাঁড়াবেন? গত বছর নানা ধরনের প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। মানুষ কোনো রকমে টিকে গেছে। খাবারের অভাবে কোনো মানুষ মারা যায়নি। কিন্তু এবারের অবস্থা কী? পহেলা বৈশাখ বা সামনে দুটো ঈদ—এই তিনটি উৎসব ঘিরে যে ব্যবসায়ীরা সারা বছর অপেক্ষা করেন, তাঁদের কী হবে?

টেলিভিশন সংবাদে দেখলাম নতুন করে লকডাউনের কথা শুনে ফুটপাতের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলছেন, ‘এই অবস্থা হলে তো করোনায় মরতে হবে না আমাদের। আমরা না খেয়েই মরে যাব।’

এই একজন ব্যবসায়ীর কথা থেকে ওই শ্রেণির ব্যবসায়ীদের পুরো অবস্থাটা বোঝা যায়। এখন তাহলে করণীয় কী আমাদের? আমাদের করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে হবে। মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে হবে। আবার ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষকে বাঁচাতে হবে। এ জন্য জরুরি হচ্ছে সচেতনতা। সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। নিজেকে নিজে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু আমরা গত এক বছরের করোনাকালে বুঝে গেছি, শুধু মুখে বলে, গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে যথাযথ কাজটি হবে না। মানুষকে সচেতন করার জন্য কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। যেসব পদক্ষেপ পৃথিবীর অনেক দেশ নিয়েছে। আর নিয়েছে বলেই করোনা অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে তারা। সেই পদক্ষেপগুলো কী বা কেমন? আমি শুধু একটি পদক্ষেপের কথা বলি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বা বাহিনীকে কঠোর থেকে কঠোরতর হতে হবে। অসচেতন মানুষকে সচেতন করতে হবে যেকোনোভাবেই হোক। পৃথিবীর অন্য দেশগুলো মাস্ক না পরলেই তাকে ধরে বড় রকমের জরিমানা করে দেয়। আমাদের এখানেও জরিমানা করার কথা শুনি বা টেলিভিশনে দেখি। সেই জরিমানায় কাজের কাজ কিছুই হতে দেখি না। কারণ ১০০ থেকে ২০০ টাকা জরিমানা মানুষ গণ্যই করে না। এই পদক্ষেপটি কঠিন করা অত্যন্ত জরুরি। অসচেতন মানুষকে ধরা জরুরি। প্রয়োজনে জরিমানার অঙ্ক বাড়িয়ে এমন একটি অবস্থা তৈরি করা, যাতে মানুষ জরিমানার ভয়ে মাস্ক পরতে বাধ্য হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হয়। মানুষকে সচেতনতায় বাধ্য করার সব পদক্ষেপই নিতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে, মানুষকে নানা রকম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে কাজ হবে না। সব দিক ঠিক রেখে যতভাবে সম্ভব মানুষকে সচেতন করতে হবে। এটাই এখন প্রধান কাজ।

 

মন্তব্য