kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

‘নিহত’রা ফিরে আসে, রহস্যভেদ হয় না

এস এম আজাদ   

১৯ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘নিহত’রা ফিরে আসে, রহস্যভেদ হয় না

প্রতীকী ছবি

২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের হালিশহর থানার পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা করে। ২৫ এপ্রিল জীবন চক্রবর্তী ও দুর্জয় আচার্য নামের দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ দাবি করে, খুন করার পর পুড়িয়ে ফেলা লাশটি কিশোর দিলীপ রায়ের। গাঁজা সেবন নিয়ে বিরোধের জেরে কয়েকজন মিলে দিলীপকে হত্যা করেছে। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয় গ্রেপ্তারকৃত জীবন। তবে ঘটনার পর ২ মে পুলিশ জীবিত দিলীপকে খুঁজে পায়। এতে মামলাটির তদন্ত ও জবানবন্দি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

হাহকোর্ট বেঞ্চ দুই আসামি, জীবিত ফেরা দিলীপ এবং তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি শোনেন। গত বছরের ২৩ অক্টোবর দুর্জয়ের জামিন আদেশ এবং চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে (সিএমএম) তদন্তের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটির ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, একজন খুন হয়েছে, যার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। রাখা হয়েছে ডিএনএ (ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিয়িক এসিড) নমুনাও। তবে খুন হওয়া ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার আগে আসামিদের জবানবন্দির ওপর নির্ভর করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডে খুন হওয়া ব্যক্তির পরিচয় লুকানোর পেছনে কোনো রহস্য আছে বলে ধারণা পুলিশের।

এভাবেই অনেক খুনের মামলায় নিহত ব্যক্তির লাশের অবস্থান, খুনের আলামত এবং লাশের পরিচয় শনাক্ত না করেই জবানবন্দি ও অভিযোগ-সাক্ষ্যের ভিত্তিতে খুনি শনাক্ত করা হচ্ছে। তদন্তের এমন দুর্বলতায় ‘সাজানো হত্যা মামলা’ আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে।

গত দেড় বছরে ছয়টি ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খুনের প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত এবং নিহত ব্যক্তিকে আসামি করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) ডিএনএ প্রফাইলিংয়ের ব্যাংক আছে। পুলিশ ব্যুারো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) ফরেনসিক পরীক্ষায় অজ্ঞাতপরিচয় লাশ শনাক্ত করা হচ্ছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় খুন হওয়া ব্যক্তি ও সন্দেহভাজন খুনির অবস্থানও যাচাই করা হচ্ছে।

এর পরও সাজানো হত্যার ঘটনা আদালতে যাচ্ছে শুধুই তদন্তের দুর্বলতার কারণে।

জানতে চাইলে সিআইডির ডিআইজি (ফরেনসিক) শাহাদাৎ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে প্রায় ৩৫ হাজারেরও বেশি ডিএনএ প্রফাইল জমা আছে। ডিএনএ প্রফাইলের মাধ্যমে সিআইডি অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে। হত্যার ঘটনার পর যেগুলোর আলামত সংরক্ষণ করা হয়, তা আমাদের কাছে আসে। আর যেসব ঘটনায় আলামত সংরক্ষণ করা হয় না, সেগুলোর তো তদন্ত করার সুযোগ নেই।’

সিআইডি সূত্র জানায়, জমা থাকা ৩৫ হাজার ডিএনএ প্রফাইলের ২৬ হাজারে মিল পাওয়ার কারণে সংঘটিত ঘটনার অপরাধী শনাক্ত করেছে সিআইডি। বাকিগুলোর করতে পারেনি। তথ্যভাণ্ডারে ডিজিটাল ফরেনসিকের জন্য ৯ শতাধিক মামলার আলামত ছাড়াও এক হাজার ৪০০টি চাঞ্চল্যকর মামলার প্রতিবেদন প্রক্রিয়াধীন। সিআইডির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যেসব হত্যার ঘটনায় লাশ শনাক্ত করা যায়, সেসব ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ডিএনএ প্রফাইলিংয়ের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা সম্ভব। গুমের অভিযোগ বা লাশ যখন পাওয়া যায় না, তখন খুন হওয়া ব্যক্তি ও সন্দেহভাজন খুনির অবস্থান যাচাই করা সম্ভব ফরেনসিক পরীক্ষায়। তাই খুন চিহ্নিত করতে শুধু জবানবন্দি ও অভিযোগই যথেষ্ট নয়।’

‘আজমল খুনে’ ধামাচাপা মজিবর হত্যাকাণ্ড

২০১৭ সালের মে মাসে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের পর মৃত ব্যক্তিকে আজমল হোসেন ওরফে ইমরান শনাক্ত করে রাজধানীর কদমতলী থানায় হত্যা মামলা করে পুলিশ। তিন বছর পর ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে আজমলকে জীবিত পাওয়ার তথ্য মেলে। ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা গ্রামের রতন মাঝির ছেলে আজমলকে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি এখন কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কদমতলীর ইগলু আইসক্রিম ফ্যাক্টরির সামনের মেসে কয়েকজনের সঙ্গে থাকতেন আজমল। লাশ উদ্ধারের পর রহস্যজনকভাবে শুধু তাঁর নাম শনাক্ত হয় (ঠিকানা, পরিচয় ছিল না)। মেস ও আশপাশের সন্দেহভাজন ১১ জনকে আসামি করে মামলা হয়। পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর তিনজন স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন! ৫ নম্বর আসামি মজিবর তিন বছর ধরে নিখোঁজ। এখন পুলিশ অনেকটাই নিশ্চিত যে মজিবরকে হত্যা করে পালিয়ে থাকা আজমল খুন হয়েছেন বলে প্রচার চালানো হয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশ লাশের পরিচয় তাত্ক্ষণিকভাবে যাচাই করার উদ্যোগ নেয়নি। ঘটনার সঙ্গে আগের তদন্ত কর্মকর্তারা জড়িত বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। প্রথম কর্মকর্তা কদমতলী থানার সাবেক এসআই প্রদীপ কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘নিহতের পরিচয় প্রথমে জানা যায়নি। আসামিরা জবানন্দিতে তার নাম বলেছে।’ তিনি ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি নেননি এবং ঘটনার তদন্ত সঠিক করেছেন বলেও দাবি করেন। বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তাধীন বিষয়, কিছু বলা যাবে না। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আসল খুন এবং খুনি বের করার চেষ্টা করছি।’

হালিশহরের লাশটি কার?

২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল হালিশহরের পুড়িয়ে ফেলা লাশটি দিলীপ রায়ের নয় বলে প্রমাণ মেলায় এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, লাশটি আসলে কার? মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. সাইফুল্লাহ বলেন, একটি সিমের প্যাকেটে পাওয়া মোবাইল ফোন নম্বরের সূত্র ধরে জীবন চক্রবর্তী ও দুর্জয় আচার্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে জীবন চক্রবর্তী জানিয়েছিল, গাঁজা খাওয়া ও ৫০ টাকার জন্য বিরোধকে কেন্দ্র করে দিলীপকে খুনের পর পুড়িয়ে দিয়েছে তারা। যাচাই করতে গিয়ে পুলিশই পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করে দিলীপকে। হালিশহর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন খুন হয়েছে। তার ডিএনএ নমুনা আমরা রেখেছি। এখানে আসামিরা নিহতের পরিচয় বা কোনো বিষয় লুকিয়েছে। এটা বের করার চেষ্টা চলছে। পরিচয় যাচাই করেই প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’

গুমের অভিযোগ, ফিরে আসছে ‘নিহত’

হত্যার পর লাশ গুম করা হয়েছে—এমন অভিযোগের মামলায় দীর্ঘদিন পর ‘নিহত ব্যক্তি’ ফিরে আসার ঘটনা ঘটছে। আসামির জবানবন্দির ভিত্তিতে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তৈরি হচ্ছে বিতর্ক। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, লাশ ও সমাহিত করার স্থান শনাক্ত করা যায়নি সেসব তদন্তে। গত বছরের ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় ১৫ বছরের এক কিশোরী। ৬ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ থানায় কিশোরীর বাবা উত্ত্যক্তকারী আবদুল্লাহ ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে গণধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে মামলা করেন। পুলিশ অটোরিকশাচালক রকিব, আব্দুল্লাহ ও খলিলকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা আদালতে জবানবন্দিতে বলেন, কিশোরীকে অপহরণ করে গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন। তবে ৫১ দিন পর ওই কিশোরী মায়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তাকে পুলিশ উদ্ধার করে। সে ইকবাল নামের এক ছেলেকে বিয়ে করে বন্দরে একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছিল। এই ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে অধিকতর শুনানির জন্য আগামী ১৩ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট।

নারায়ণগঞ্জেই আরেক ‘মৃত’ ফিরে এসেছেন গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর। গুমের ছয় বছর পর নারায়ণগঞ্জের আদালতে হাজির হন মামুন নামের ওই ব্যক্তি। ২০১৪ সালের ১০ মে চাঁদপুরের মতলবের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়া ছেলেকে না পেয়ে দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৯ মে মামলা করেন বাবা আবুল কালাম। মামুনকে হত্যার অভিযোগে গার্মেন্টকর্মী তাসলিমা, তাঁর বাবা, ভাইসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিআইডির দেওয়া চার্জশিটে বলা হয়, মামুনকে চেতনানাশক পানীয় পান করিয়ে অপহরণ করে অটোরিকশায় করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে কোথায় কী অবস্থায় রাখা হয়েছে সেটা জানা যায়নি।

একই রকম গুমের অভিযোগের ৯ বছর পর ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ফেরেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের জামাল উদ্দিন। তত দিনে কারাভোগসহ নিঃস্ব হওয়ার দশা হয় পাঁচ আসামির। ২০১৪ সালে রাজধানীর হাজারীবাগের আবু সাঈদ নামের এক কিশোর গুম হওয়ার অভিযোগের পর ২০১৯ সালের ৩০ আগস্ট তাকে জীবিত পাওয়া যায়। এই মামলায় ছয়জন গ্রেপ্তার এবং দুজন আদালতে জবানবন্দিও দেন। সাঈদকে অপহরণ করে হত্যার পর লাশ বরিশালগামী লঞ্চ থেকে নদীতে ফেলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন তাঁরা।

 



সাতদিনের সেরা