kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

মৃত্যু শনাক্তের হঠাৎ ঊর্ধ্বগতিতে দুশ্চিন্তা

নিজস্ব প্রতিবেদকf   

১৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মৃত্যু শনাক্তের হঠাৎ ঊর্ধ্বগতিতে দুশ্চিন্তা

করোনা পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন। অনেক দিনের বিরতির পর হাসপাতালগুলোর সামনে সেই চেনা দৃশ্য। গতকাল মুগদা হাসপাতাল থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

চলতি বছরের শুরুর দিকে—৭ জানুয়ারি দেশে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার হিসাবে করোনায় মৃত্যু হয়েছিল ৩১ জনের। এরপর প্রতিদিন মৃত্যু ছিল কম। এমনকি গত মাসের শেষ ভাগে তিন দিন পাঁচজন করে মারা যায়। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে আবারও মৃত্যুর রেখা ওপরে উঠতে শুরু করেছে এবং দুই মাস আট দিন পরে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টার হিসাবে সর্বোচ্চ ২৬ জনের মৃত্যু ঘটেছে। একই সঙ্গে তিন মাস পরে দৈনিক শনাক্তও বেড়ে এক হাজার ৭৭৩ জনে উঠেছে। সর্বশেষ গত ১৫ ডিসেম্বর  শনাক্ত ছিল এক হাজার ৮৭৭ জন। মাঝের দিনগুলোতে শনাক্ত কম ছিল এবং গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক শনাক্ত ৩০০ জনেরও নিচে নেমে গিয়েছিল। দৈনিক শনাক্ত হারও যেখানে ২ শতাংশের ঘরে নেমে গিয়েছিল, তা আবার গতকাল প্রায় ১০ শতাংশের কাছে উঠে গেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সব মিলিয়ে দেশে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি আবারও ভয় জাগিয়ে তুলছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে প্রতিদিনই সতর্কতার কথা জানানো হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বিভিন্নভাবে। কোথাও কোথাও আবারও শুরু হয়েছে প্রশাসনের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিভিন্নমুখী তৎপরতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। এমনকি টিকা নিলেও এসব স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। নয়তো সামনে বড় বিপদের মুখে পড়তে হবে।

পরিস্থিতির মুখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানুষ যেন টিকা নিয়েই নিজেদের নিরাপদ ভাবতে শুরু করেছেন। সবাই কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে মাস্ক ছাড়াই চলাফেরা করা শুরু করেছে। স্বাভাবিক সময়ের মতো চলাফেরা, বেড়ানো, সামাজিক অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশে ভিড় করতে শুরু করেছে; যার পরিণতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে, মৃত্যু বাড়ছে। এখনো যদি মানুষ সতর্ক না হয়, যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলে, তবে সামনে কিন্তু বড় বিপদ অপেক্ষা করতে পারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, করোনারভাইরাসের পরীক্ষাও বাড়ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৫ জনের, যাদের মধ্যে এক হাজার ৭৭৩ জনের শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে করোনা শনাক্ত হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৯ হাজার ১৬৮ জনের। এর মধ্যে মারা গেছে আট হাজার ৫৭১ জন এবং সুস্থ হয়েছে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার ১২৭ জন। করোনা সংক্রমণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘মানুষ তো কিছুই মানছে না। আমরা প্রতিদিন সতর্কতার কথা বলি। গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে প্রচার হচ্ছে; মানুষকে সাবধান হতে বলা হচ্ছে, সংক্রমণ যে বেড়ে যাচ্ছে, মৃত্যু যে বাড়ছে তা দেখেও মানুষের উপলব্ধি হচ্ছে না—এটা খুবই বিপদের কথা।’

বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সভাপতি ও মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. আহমেদুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেকের ধারণা টিকা দেওয়ার কারণে বুঝি করোনা বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সবার জেনে রাখা দরকার—এটির কোনোই ভিত্তি নেই। কারণ এই টিকার মধ্যে করোনাভাইরাস নেই। এই টিকার মধ্যে প্রোটিন রয়েছে। ফলে সেটা দিয়ে করোনাভাইরাস ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এমনকি টিকা দেওয়ার পর পরীক্ষা করলেও করোনাভাইরাস পাওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘দেখা যাচ্ছে অনেক দিন ধরে অনেকে ঘরে সাবধানে থাকার পর টিকা নিতে যাওয়ার দিনে পর্যাপ্ত সাবধানতা অবলম্বন করেননি কিংবা টিকাকেন্দ্রেও অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। অনেক কেন্দ্রে ভিড় হয়েছে অস্বাভাবিক। ঠেলাঠেলি করেও অনেক জায়গায় টিকা নিয়েছেন অনেকে। ফলে এসব জায়গা থেকে যে কেউ যেকোনো সময় সংক্রমিত হতেই পারেন।’ 

রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন, তাঁদের ইতিহাস খুঁজে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগই গত কিছুদিনের মধ্যে কক্সবাজার কিংবা অন্য কোথাও না কোথাও জনসমাগমে অসতর্কভাবে, উপযুক্তভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ভ্রমণ করেছেন।’

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্রহণের কারণে কভিড-১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষায় ‘পজিটিভ’ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। চলমান কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমে ব্যবহৃত কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ গ্রহণের ন্যূনতম দুই সপ্তাহ পর থেকে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি হয়। তাই এই সময়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সুতরাং ভ্যাকসিন গ্রহণের আগে ও পরেও মাস্ক ব্যবহারসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত এবং ৪০ বছর ও তদূর্ধ্ব সবাইকে কভিড-১৯ টিকাদান কার্যক্রমে নিবন্ধন করা এবং নির্ভয়ে টিকা নেওয়া উচিত।