kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

কাঁচামাল জ্বালানি তেল জাহাজভাড়ার কারণে বাড়ছে সিমেন্টের দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কাঁচামাল জ্বালানি তেল জাহাজভাড়ার কারণে বাড়ছে সিমেন্টের দাম

করোনা-পরবর্তী ব্যাপক চাহিদায় আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে জাহাজসংকট ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে বাড়ছে সিমেন্টের দাম। গত ১৫ দিনে কয়েক দফায় দেশের বাজারে ব্র্যান্ডভেদে বস্তাপ্রতি সিমেন্টর দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে সিমেন্টের দাম আরো বাড়বে। এদিকে দফায় দফায় দাম বাড়তে থাকায় সিমেন্টের সরবরাহ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। উভয়সংকটে পড়েছেন নির্মাণ খাতের উদ্যোক্তারা। খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং সিমেন্টের প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পেয়ে কাজ বন্ধ রাখার কথা ভাবছেন অনেকে। এ কারণে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এই খাতের শ্রমিকরাও।

গতকাল সোমবার রাজধানীর বাড্ডা, মালিবাগ, রামপুরা, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, খুচরায় বসুন্ধরা, হোলসিম, বেঙ্গল, শাহ, স্ক্যান, সেভেন হর্সসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিমেন্টের দাম গত ১৫ দিনে কয়েক দফায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে খুচরা পর্যায়ে। আগে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকায় বিক্রি হওয়া সিমেন্টের বস্তা এখন ৪৩০ থেকে ৫৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রামপুরা বাজারের মকবুল এন্টারপ্রাইজের মালিক মকবুল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিমেন্টের দাম দফায় দফায় বাড়ছে। দিন পনেরো আগেও বসুন্ধরা, বেঙ্গল ও সেভেন হর্সসহ কয়েকটি কম্পানির সিমেন্ট গড়ে ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছি। এখন ৪৩০ টাকার কমে কোনোটাই পারছি না। আজ যে দামে বিক্রি করছি, কাল সে দামে না-ও পেতে পারেন। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। যেসব সাইটে আমরা সিমেন্ট সরবরাহ করতাম, তাদের অনেকেই কাজ বন্ধ রাখার চিন্তা করছে। আবার অনেকে আগের তুলনায় কাজ করছে ধীরে।’

কমলাপুর এলাকার মাতব্বর এন্টারপ্রাইজের বিক্রেতা আরমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দাম বাড়তে থাকায় সিমেন্টের সরবরাহও কমেছে। আমার এক পুরনো ক্লায়েন্ট ২০০ বস্তার অর্ডার দিয়েছিলেন, দিতে পেরেছি ১০০ বস্তা। আমরা খুবই শঙ্কায় রয়েছি। সিমেন্টের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে বুঝতে পারছি না। বস্তাপ্রতি ৮০০ টাকায় উঠতে পারে—এমন কথা শোনা যাচ্ছে।’

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সব ধরনের পণ্যেই উভয়সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে করোনা-পরবর্তী আমদানি-রপ্তানির চাহিদা বেড়েছে। এতে কাঁচামালের সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। জাহাজের জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। এতে জাহাজের ভাড়া বেড়ে গত দুই মাসে দ্বিগুণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লিংকারসহ কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বেড়েছে সিমেন্টের দাম। কম্পানিগুলো তাদের সিমেন্টের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে।

সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার। আন্তর্জাতিক বাজারে এই কাঁচামালের দাম গত ১৫ দিনে আরো পাঁচ থেকে ছয় ডলার বেড়েছে টনপ্রতি। বর্তমানে জাহাজভাড়াসহ ক্লিংকারের দাম দাঁড়িয়েছে ৫৯ থেকে ৬১ ডলার, যা মার্চের শুরুতে বেড়ে হয়েছিল ৫৪ থেকে ৫৬ ডলার। এর আগে এক মাসে ক্লিংকারের দাম বেড়েছিল ৯ ডলার। এ ছাড়া অন্যান্য কাঁচামালের দামও বাড়তি রয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতেও প্রতি টনে চার ডলার বেড়ে ক্লিংকারের দাম ৪৬ ডলারে ওঠে ।

আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)। এর সভাপতি ও ক্রাউন সিমেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সিমেন্ট উৎপাদনের সব কাঁচামাল বিদেশ বা আমদানিনির্ভর, সুতারাং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যে তারতম্য হলে তার প্রভাব আমাদের দেশে পড়ে। গত দুই মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় কারণ, পরিবহন বা জাহাজভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত ডিসেম্বর, ২০২০ প্রতি মেট্রিক টন পরিবহন ব্যয় ছিল ১১ ডলার, যা বর্তমান সময়ে চলছে ২৩ ডলার। এই অবস্থা ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আমরা এখনই কোনো অনুমান করতে পারছি না।’

বাংলাদেশ সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতি (বিসিএমএ) কোনো রেগুলেটরি বডি নয়, তাই তারা কোনো দর বেঁধে দিতে পারে না। আর বেঁধে দিলেও সদস্যরা সেটা মেনে নিতে বাধ্য নয়। বর্তমানে ৩৭টি দেশি-বিদেশি কম্পানি সিমেন্ট উৎপাদন করছে। বাংলাদেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় চার কোটি টন, যার বিপরীতে প্রায় ৮.৪ কোটি টন উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি করে ফায়দা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে বাজারে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে তা সমভাবে নয়, কেউ বেশি করছে, কেউ কম করছে, কেউ এখনো করেনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সিমেন্টের আমদানি শুল্ক ছাড়াও ৩ শতাংশ এআইটি এবং ৩ শতাংশ সরবরাহ কর আদায় করে থাকে, যা সমন্বয়যোগ্য নয়। এগুলো ভোক্তাকে বহন করতে হয়। যদি এই কর সমন্বয় করা যেত, তাহলে সিমেন্টের মূল্য সাধারণের ক্রয়সক্ষমতার মধ্যে থাকত বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিসিএমএ এ ব্যাপারে এনবিআরের সঙ্গে দুই বছর ধরে আলোচনা এবং আবেদন-নিবেদন করে যাচ্ছে।

জানা যায়, সিমেন্টশিল্পে পাঁচ ধরনের কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়। সব কয়টি আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে ৬২ থেকে ৯০ শতাংশই হলো ক্লিংকার। গত অর্থবছরেও দেশে এক কোটি ৮৭ লাখ টন ক্লিংকার আমদানি হয়েছে। গত ছয় বছরে সিমেন্ট বিক্রিতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০১৬ সালে। ২০১৫ সালের তুলনায় সে বছর ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। এরপর ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে সিমেন্ট বিক্রি বেড়েছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। সে বছর দেশে তিন কোটি ১৩ লাখ টন সিমেন্ট বিক্রি হয়। অর্থাৎ এক বছরে বাড়তি ৪৩ লাখ টন সিমেন্ট বিক্রি হয়েছিল। ২০২০ সাল বাদ দিলে বছরে গড়ে ৮ থেকে ১০ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে এই খাতে।