kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

আলোচনার নামে ঢাকায় এলেন জেনারেল ইয়াহিয়া

আজিজুল পারভেজ   

১৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আলোচনার নামে ঢাকায় এলেন জেনারেল ইয়াহিয়া

১৫ মার্চ, ১৯৭১। অসহযোগ আন্দোলনের পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের সমগ্র শাসনযন্ত্রই আওয়ামী লীগের নির্দেশে চলতে থাকে। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে সকল নির্দেশ জারি করা হতে থাকে। যথারীতি চলছে অসহযোগ আন্দোলন। অফিস-আদালতে পূর্ণ কর্মবিরতি চলছে। সরকারি ও বেসরকারি ভবনের শীর্ষে এবং যানবাহনে বাংলার নতুন পতাকার সঙ্গে কালো পতাকা ওড়ানো অব্যাহত থাকে। ঢাকায় সভা-সমাবেশ-মিছিল ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

‘দেশের অবস্থা যে গুরুতর আকার ধারণ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আকাশে আশঙ্কার কালো মেঘ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।’ এভাবেই দিনটির কথা ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে লিপিবদ্ধ করেছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

নতুন সামরিক বিধি জারির প্রতিবাদে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে জনসভা করে। ছাত্রনেতারা ১১৫ নম্বর সামরিক বিধি জারির তীব্র সমালোচনা করে সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি দাবি জানান। আ স ম আবদুর রব ঘোষণা করেন, ‘বাংলা আজ স্বাধীন। আমাদের উপর সামরিক বিধি জারি করার ক্ষমতা কারো নাই। বাংলার জনগণ একমাত্র বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই মেনে চলবে।’

সভায় ‘চার খলিফা’ই বক্তৃতা করেন।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘স্বাধীনতার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার ও চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হবে তার জন্যও জনগণকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘হরতাল অব্যাহত থাকবে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ও ৩৫ দফা নির্দেশাবলি মেনে চলতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার জন্য করাচি থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকায় এলেন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। সঙ্গে এলেন কয়েকজন জেনারেল। বিমানবন্দরে সামরিক গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান তাঁকে স্বাগত জানান। কোনো সাংবাদিক ও বাঙালিকে এ সময় বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো নতুন প্রস্তাব দিলেন। করাচিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুট্টো বলেন, ‘শুধুমাত্র সংখ্যাধিক্যের জন্য পাকিস্তানের শাসন পরিচালনা করা যাবে না। পিপলস পার্টিকে বাদ দিয়ে কোনো সরকার গঠন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তানে এবং পিপলস পার্টির পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাধিক্য রয়েছে। তাই কেন্দ্রের ক্ষমতা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই সংখ্যাগুরু পার্টির কাছে হস্তান্তর করা সমীচীন হবে।’

কিন্তু পাকিস্তানের অন্যান্য নেতা বলেন, ক্ষমতা লাভ করার জন্য আওয়ামী লীগই একমাত্র দল। মিয়া মমতাজ দৌলতানা বলেন, ‘একটি দেশের দুটি সংখ্যাগুরু পার্টির প্রশ্নই উঠতে পারে না। কেননা, পাকিস্তান হচ্ছে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ।’

করাচিতে এক জনসভায় কয়েকজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা বলেন, ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অনেক কথাই বলছেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন তাঁর পিপলস পার্টি এই অঞ্চলে শতকরা ৩৮ ভাগ ভোটও পাননি।

আসগর খান পেশোয়ার আইনজীবী সমিতির সভায় বলেন, ‘এই মুহূর্তে শেখ মুজিবুর রহমান দেশের দুই অংশকে একত্রে ধরে রেখেছেন। সংখ্যাগুরু দলের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক এবং এটাই হচ্ছে গণতন্ত্রসম্মত।’

সাংবাদিকদের কাছে পাকিস্তান ন্যাপ প্রধান খান ওয়ালি বলেন, ‘নির্বাচিত পার্লামেন্টের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। বাস্তব ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের আর অস্তিত্ব নেই। ১ জুলাই থেকে এখানে চারটি পৃথক প্রদেশ হয়েছে।’

করাচিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কাজী ফয়েজ মোহাম্মদ বলেন, ‘গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল একটি, অতএব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, অন্যের কাছে নয়।’

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সভা করেন। সভা শেষে মিছিল বের করা হয়। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে মহিলা পরিষদ মিছিল ও পথসভা করে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বেতার ও টিভি শিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্যরা ট্রাকে করে গণসংগীত, পথনাটক পরিবেশন করেন।

খুলনার হাদিস পার্কের জনসভায় বাংলা জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বলেন, বাংলার প্রতিটি মানুষ আজ বঙ্গবন্ধুর পেছনে একতাবদ্ধ। তিনি বলেন, রেডিও, টিভি, ইপিআর, পুলিশ বাহিনী, সেক্রেটারিয়েট প্রভৃতি আজ আওয়ামী লীগ প্রধানের আজ্ঞাবাহী।